ঢাকা, রবিবার,৩০ এপ্রিল ২০১৭

রাজনীতি

তিন মাসে প্রাণ গেছে ১০ জনের

আওয়ামী লীগে গৃহদাহ 

মনিরুল ইসলাম রোহান

২১ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:২৮


প্রিন্ট

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে চলছে গৃহদাহ। দলের তৃণমূলে কোনো কিছুতেই থামছে না সঙ্ঘাত, মারামারি, সংঘর্ষ ও খুনাখুনি। কখনো এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে, কখনো ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে আবার কখনো দলীয় পদ-পদবির লোভে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীকে খুন করতে পিছপা হচ্ছে না প্রতিপক্ষ। আবার ঠিকাদারি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসার স্বার্থে কখনো কখনো ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন নেতাকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চলতি এপ্রিল মাসেই নিহত হয়েছেন তিনজন নেতাকর্মী। আর গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত আট বছরে সাড়ে তিন শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মাধ্যমে এসব তথ্য জানা গেছে। এ দিকে গত বুধবার অনুষ্ঠিত সম্পাদকমণ্ডলীর এক বৈঠকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকদের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিস কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ হয়েছে ৩৫টি। ওই সংঘর্ষে ৬ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫৭৬ জন। আওয়ামী লীগ-যুবলীগের মধ্যে এক সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও ২২ জন নেতা আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে তিনটি। এতে আহত হয়েছেন ৩১ জন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত তিন মাসে সারা দেশে চারটি সংঘর্ষে দুই নেতাকর্মীকে হারিয়েছে ছাত্রলীগ। গত ২০১৬ সালে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে দেশে ১৭৭ জনের প্রাণহানি হয়। এর মধ্যে শুধু মতাসীন আওয়ামী লীগেরই ৮৩ জন। আর ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে প্রাণহানি হয়েছে ১৫৩ জনের। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মধ্যে সঙ্ঘাতে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। ২০১৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৭। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বুধবার নরসিংদীর রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাঁশবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক এবং সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শারফিন নামে একজন নিহত হন। ১৮ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লার মুরাদনগরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য আলী আশরাফ এবং আলাউদ্দিন আনিস গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আওয়ামী লীগ কর্মী ফারুক ও সাইদুর নিহত হন। একই দিনে ফরিদপুরের সালথায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। ১৬ এপ্রিল শরীয়তপুরের নড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। এ ছাড়াও ১০টি ঘরবাড়ি ও পাঁচটি দোকান ভাঙচুর হয়। এর আগে গত বছর ২০ জুলাই শরীয়তপুরের নড়িয়ার জবসা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান শওকত আলীর সমর্থকেরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন হাওলাদারকে কুপিয়ে হত্যা করে। গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে রক্তয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরো ২০ জন। এর আগের দিন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিরোধের জের ধরে বড়মাছুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাইয়ুম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপরে নেতাকর্মীরা। এর আগে গত ১২ জানুয়ারি রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে সিট ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এর আগে ১০ জানুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজ সিকদার এবং সাবেক চেয়ারম্যান শফিউদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে হোসেন খাঁ নিহত হন। বরগুনা জেলায়ও চলছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রেশারেশি। এর জের ধরে বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাসানুর রহমানের বিরুদ্ধে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ এনে রাজধানীতে ১১ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে পাথরঘাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক মহিলাবিষয়ক সম্পাদক বিলকিস আরা রানী। এ সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। গত ৩ জানুয়ারি বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা চালায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এর আগের দিন কক্সবাজারের চকরিয়ায় ইয়াবার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুইগ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইটের আঘাতে আহত হন এক প্রবীণ শিক্ষক। নতুন বছরের শুরুতেই গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ। মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেড এ মাহমুদকে ল্য করে প্রতিপক্ষের লোকজন গুলি করলে তা ল্যভ্রষ্ট হয়ে এক পথচারী নারী নিহত হন। এ ঘটনায় জেড এ মাহমুদ অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসায়ের বিরোধিতা করায় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে ৩১ জুলাই খুলনায় ছাত্রলীগ নেতা সৈকতকে খুন করে প্রতিপরে নেতাকর্মীরা। বুধবার সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে দলের তৃণমূলের এই অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তৃণমূলের এসব কোন্দল নিরসনে সাংগঠনিক সম্পাদকদের তাগিদ দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকেরা বিভিন্ন জেলার সাংগঠনিক অবস্থা ও সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট দিয়েছেন। রিপোর্টে তারা সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু পরার্মশও দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনের কিছু কিছু জেলা ও উপজেলায় সাংগঠনিক সমস্যা রয়েছে। সেই সব জেলার নেতাদের ডেকে সমস্যা সমাধান করা হবে। সমস্যাপূর্ণ জেলাগুলোর মধ্যে চারটি জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের আগামী ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৭ এপ্রিল ঢাকায় ডাকা হয়েছে। তাদের সাথে বৈঠক করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হবে।
আওয়ামী লীগের মধ্যে মারামারি, সংঘর্ষ ও খুনাখুনি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এটা আসলে আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় কোন্দল নয়। দল যেহেতু ক্ষমতায় সেহেতু দলকে ব্যবহার করে কিছু লোক সুবিধা নিতে চায়, নিচ্ছে। আর সুযোগ সন্ধানীরা সুবিধা নিতে গিয়েই এসব ঘটনা ঘটছে। এতে দলীয় কোনো আদর্শ নেই, রাজনীতি নেই। সুযোগসন্ধানীদের কাজ এটা। তিনি বলেন, যারা এগুলো করছে তারা হলো দলীয় সুবিধাভোগী ও সুবিধা ভোগপ্রত্যাশী। কেউ ভোগ করছে। আবার ভোগপ্রত্যাশীরা ভাগ বসাতে গিয়ে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে এখন এক ধরনের সুবিধাবাদিতা কাজ করছে। সিনিয়রদের পাশাপাশি জুনিয়রেরাও আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, আর্থিক সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর ভাগ বসাতে চায়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। নেতাকর্মীরা ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়েও অনেক ক্ষেত্রে সংঘর্ষ, মারামারি করছে। প্রকৃতপক্ষে ধীরে ধীরে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে যাচ্ছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫