ঢাকা, রবিবার,৩০ এপ্রিল ২০১৭

শেষের পাতা

স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভে পর্যটকদের হাতছানি

হুমায়ুন কবির জুশান উখিয়া (কক্সবাজার)

২১ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:৪২


প্রিন্ট
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক :নয়া দিগন্ত

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক :নয়া দিগন্ত

একপাশে উঁচু পাহাড়ে সবুজের হাতছানি। অপরপাশে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আঁছড়ে পড়ছে বালিয়াড়ির বুকে। এই দুইয়ের বুকচিরে মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গেছে পথ। পথের পাশে নানা প্রজাতির গুল্মলতা, ঝাউয়ের সারি মাতিয়ে তুলে মন। স্বপ্নের মতো এই চিত্র বাস্তবে দেখা দেয় সমুদ্র সৈকতের কোলঘেঁষে নির্মাণাধীন কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে।
কক্সবাজার জেলা শহরের কলাতলী থেকে সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলার সাবরাংয়ে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়ন (ইসিবি)। বর্তমানে নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব পর্যটনের দুয়ার খুলতে চলেছে সড়কটি। এটি পুরোদমে চালু হলে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়ার েেত্র পর্যটকদের সময়ের অনেক সাশ্রয় হবে। তিন ঘণ্টার পথ পৌঁছে যাবেন মাত্র এক ঘণ্টায়।
কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রানাপ্রিয় বড়ুয়া বলেন, ‘তিন ধাপে সড়কটি নির্মাণ করছে সেনাবাহিনীর ১৬ প্রকৌশল নির্মাণ ব্যটালিয়ন (ইসিবি)। পুরো কাজ শেষ হলে সড়কটি রণাবেণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী মে মাসের শুরুতে সড়কটি উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি।’
সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: ইয়াসির আরাফাত বর্তমানে জেলা শহরের একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিকতা করেন। কক্সবাজার সরকারি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে তিনি প্রায় প্রতিদিনই নিজ বাড়ি থেকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক হয়ে কক্সবাজারে যাতায়াত করতেন। সেই অতীত দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক হয়ে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পৌঁছতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। অথচ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কক্সবাজার শহরে যাতায়াত করা যায়। যাত্রাপথে সড়কটির প্রাকৃতিক পরিবেশ মন জুড়িয়ে দেয়। অন্যরকম এক ভালোলাগার শিহরণ জাগে মনে।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে ৪৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। তখন প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। কক্সবাজার শহরের কলাতলী পয়েন্ট থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্মাণকাজও শুরু করে। সড়ক ও জনপথ বিভাগে নিযুক্ত ঠিকাদার কলাতলী মোড় থেকে পাইওনিয়ার হ্যাঁচারি পর্যন্ত নির্মিত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক সাগরের প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের ধাক্কায় সাগরেই বিলীন হয়ে যায়। পরে এই সড়কের নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় সেনাবাহিনীর প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়নকে। বর্তমানে সড়কটির দৈর্ঘ্য বেড়ে ৪৮ কিলোমিটার থেকে ৮০ কিলোমিটার করা হয়েছে। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনী। তিন ধাপে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার, দ্বিতীয় ধাপে ইনানী থেকে শীলখালী ২৪ কিলোমিটার ও তৃতীয় ধাপে শীলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ধাপের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে জুন মাসের মধ্যে। সড়কটি নির্মাণে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৫৬ কোটি টাকা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে আরো জানা গেছে, মেরিন ড্র্রাইভ সড়কটির দুইপাশে থাকবে ওয়াকওয়ে। পর্যটকদের সুবিধার্থে থাকবে সড়কজুড়ে ফেক্সিবল পেভমেন্ট, শেড, গাড়িপার্কিং ও চেঞ্জিং রুমের ব্যবস্থা। ৮০ কিলোমিটার সড়কে তিনটি বড় আরসিসি সেতু, ৪২টি কালভার্ট, তিন হাজার মিটার সসার ড্রেন ও ৫০ হাজার মিটার সিসি ব্লক ও জিও টেক্সটাইল। সেনাবাহিনী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে তা রণাবেণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করবে।
কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক এই অঞ্চলে বিশ্ব পর্যটনের দুয়ার খুলে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সড়কটি। পথ চলতে চলতে পাহাড় ও সমুদ্রের অপরূপ মেলবন্ধন দেখে মোহিত হচ্ছেন পর্যটকেরা। সবুজ পাহাড়ের ঝরনা, পথের পাশে ঝাউবন, জেলেদের মাছ ধরা, পাখির ঝাঁক দেখতে দেখতে পর্যটকেরা ঘুরতে যেতে পারছেন ইনানীর পাথুরে সৈকতে।’
তিনি বলেন, ‘এই সড়ক ঘিরে ইতোমধ্যে উখিয়া-টেকনাফের মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলাতে শুরু করেছে। হু হু করে বাড়ছে সড়কের আশপাশের জমির দাম। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও জমি কিনছেন। গড়ে তুলছেন বহুতল স্থাপনা। এক কথায় সড়কটি ঘিরে অফুরন্ত পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি বলেন, ‘কক্সবাজারবাসীর স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ সড়কটি প্রথমে জেলা শহর থেকে উখিয়া উপজেলার ইনানী পর্যন্ত নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। নবম জাতীয় সংসদের প্রস্তাব দেয়া হয়, সড়কটি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সম্প্রসারণের জন্য। এর পরিপেেিত এটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এখন সড়কটি শুধু কক্সবাজার বা গোটা দেশের নয় বরং বিশ্বের অন্যতম দর্শণীয় ও নান্দনিক একটি সড়কে পরিণত হয়েছে। সড়কটি উখিয়া-টেকনাফের মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দেবে। পিছিয়ে থাকা এই জনপদ সমৃদ্ধ হবে অর্থনৈতিকভাবে। পুরো দেশের পর্যটনের বিকাশের েেত্র এই সড়ক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫