ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

বাংলার দিগন্ত

কুড়িগ্রামে ধানের নেক ব্লাস্ট রোগ : আতঙ্কিত কৃষক

দেওয়ানগঞ্জে আক্রান্ত শত শত একর বোরো

রেজাউল করিম রেজা কুড়িগ্রাম ও খাদেমুল ইসলাম (দেওয়ানগঞ্জ) জামালপুর

২১ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:৫০


প্রিন্ট
কুড়িগ্রামে নেক ব্লাস্ট আক্রান্ত বোরোক্ষেত। ছবিটি উলিপুর উপজেলার পাঁচপীর এলাকা থেকে তোলা :নয়া দিগন্ত

কুড়িগ্রামে নেক ব্লাস্ট আক্রান্ত বোরোক্ষেত। ছবিটি উলিপুর উপজেলার পাঁচপীর এলাকা থেকে তোলা :নয়া দিগন্ত

কুড়িগ্রামে বোরোক্ষেতে নেক ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন জেলার চার লক্ষাধিক কৃষক। কৃষি বিভাগের পরামর্শে সংক্রমিত জমিতে কীটনাশক স্প্রে করেও রক্ষা পাচ্ছেন না কৃষকেরা। প্রথমে জমির কোনো এক জায়গায় নেক ব্লাস্ট (গলা পচা) রোগ দেখা দিলে পরে তা মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে পুরো জমিতে।
অন্য দিকে যেসব বোরোক্ষেতে এখনো নেক ব্লাস্ট দেখা দেয়নি, সেসব জমিতে নেক ব্লাস্ট রোগ ছড়ানোর আশঙ্কায় নিয়মিত স্প্রে করেও আতঙ্কে রয়েছেন জমির মালিকেরা। নেক ব্লাস্টের আক্রমণের ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।
জেলার ৯ উপজেলায় ধানক্ষেতে নেক ব্লাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে কৃষকদের।
কৃষি বিভাগের লিফলেট ও পরামর্শ মোতাবেক বোরোক্ষেতে ট্রাইসাইকোজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে ওষুধের কার্যকারিতা এবং কৃষি বিভাগের প্রেসক্রিপশনের ওষুধ এই রোগের জন্য প্রযোজ্য কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে চলতি বোরো মওসুমে কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় এক লাখ ১০ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। ধানের ফলন ভালো হলেও হঠাৎ আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় দ্রুত সময়ে ছড়িয়ে পড়ছে নেক ব্লাস্ট। এ রোগ প্রতিরোধে কৃষকের মাঝে লিফলেট বিতরণসহ নানা পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। আক্রান্ত জমিতে প্রতিশেধক হিসেবে ট্রাইসাইকোজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক এবং ভালো জমিতে প্রতিরোধক হিসেবে কারবেনডাজিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করছেন কৃষকেরা। কিন্তু সংক্রমিত জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। স্প্রে করার পরও এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো জমিসহ পাশের জমিতে। এ অবস্থায় কৃষকের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ধান চিটা হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
কৃষি বিভাগ জানায়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ রোগ দেখা দিয়েছে। রোগ প্রতিরোধে লিফলেট বিতরণসহ নিয়মিত এবং সঠিক মাত্রায় ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর এলাকার রিকশাচালক আবদুল হামিদের স্ত্রী জুলেখা বেগম বলেন, আমি ৪৮ শতক জমি বর্গা নিয়ে বোরো চাষ করেছি। হঠাৎ দেখি ধানের শীষ সাদা হয়ে যাচ্ছে। পরে কৃষি বিভাগের লোক এসে ওষুধ লিখে দিলে সে মোতাবেক স্প্রে করি। কিন্তু পরের দিন এসে দেখি সব শীষ সাদা হয়ে গেছে। এখন আর বাঁচার উপায় নেই।
একই গ্রামের আবুল হোসেন, আবুল কাশেম, আবদুল মজিদ, কাইয়ুম আলী অভিযোগ করেনÑ কৃষি বিভাগের পরামর্শ মোতাবেক তাদের উপস্থিতিতেই জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও কাজ হচ্ছে না। একরের পর একর জমির ধান চিটা হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান তারা।
উলিপুর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নকুল কুমার বলেন, আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় নেক ব্লাস্ট দেখা দিয়েছে। আমরা কৃষকদের ট্রুপার, দিপা, সালফাইটার দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। আর যেসব জমি এখনো সংক্রমিত হয়নি বা কেবল দেখা দিয়েছে সেসব জমিতে প্রতিরোধক হিসেবে কাসোবিন, নাটিভো এগুলো স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি।
জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কৃষক শফিউল আলম জানান, নেক ব্লাস্টের ভয়ে তিনি জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছেন। কিন্তু এক দিন পর জমিতে গিয়ে দেখি দুই একর জমির ধান সব সাদা হয়ে গেছে।
ফসল বাঁচাতে তেল-সারসহ প্রয়োজনীয় খরচ মিটানোর পরও বেশি দামে কীটনাশক কিনে জমিতে প্রয়োগ করেও শেষ রক্ষা করতে পারছেন না তারা। এ অবস্থায় চড়া দামের কীটনাশক স্প্রে করেও আতঙ্ক কাটছে না আক্রান্ত না হওয়া জমির কৃষকের।
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মকবুল হোসেন বলেন, আমাদের কৃষি বিভাগের দেয়া প্রেসক্রিপশনের বাইরে কিছু ব্যবসায়ী ব্লাস্ট রোগের ওষুধ ছাড়া সাধারণ ধান পচা রোগের ওষুধ বিক্রি করছেন। যেসব কৃষক কীটনাশক ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতারিত হয়ে প্রেসক্রিপশনের বাইরে ওষুধ কিনে স্প্রে করছেন, সেসব জমিতে নেক ব্লাস্ট দমন সম্ভব হচ্ছে না। এ রোগ বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি আর যেন কোনো কৃষকের ক্ষতি না হয়।
দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে শত শত একর বোরো ধানক্ষেত। এবার দেওয়ানগঞ্জে আট ইউনিয়নে ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হেক্টর জমি নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানালেও এর সংখ্যা কয়েকগুণ হবে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। তিনি জানান, এ সমস্যা শুধু দেওয়ানগঞ্জে নয়, দেশব্যাপী। আবহাওয়াজনিত কারণে এ রোগ দেখা দিয়েছে। ধানগাছ যথারীতি বড় হয়েছে, ধান বের হলেও সব চিটা। মাঠের পর মাঠ সাদা আকারে চিটাযুক্ত ধানক্ষেত চোখে পড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা ওইসব ধানগাছ কেটে বাজারে গোখাদ্য হিসেবে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করছে। এক বিঘা জমিতে আবাদে হাল, বীজতলা, তোলা, রোপণ, পরিচর্যা, পারিশ্রমিক, সার, বিষ, বীজ, সেচসহ খরচ পড়ে ১৫ হাজার টাকা। নেক ব্লাস্ট রোগ বোরোচাষিদের চরম বিপদে ফেলে দিয়েছে। বেশি সমস্যা হয়েছে গরিব বর্গা চাষিদের। আবাদ মার খেলেও চুক্তিবদ্ধ বিঘাপ্রতি ছয় মণ ধান জমির মালিকদের দিতে হবে। উপজেলার পৌরসভাসহ আট ইউনিয়নের অনেক জায়গা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। ভবসুর গ্রামের কৃষক খোকা, কবির, শামীম, আতাউর, ছোটগেন্দা, রশিদ, খালেক, চরকালিকাপুরের ভ্যানচালক জলিলসহ শত শত কৃষক তাদের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। তারা আরো জানান, কৃষি বিভাগ থেকে তাদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে না। এ ব্যাপারে কৃষি কর্মকর্তা জানান, আক্রান্ত এলাকার ধানক্ষেতে নাটিকো স্প্রে করার পরামর্শসহ লিফলেট বিতরণ এবং অন্যান্য কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫