ঢাকা, শনিবার,২৪ জুন ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীর কিছু কথা ও কর্মের ভাবসম্প্রসারণ!

গোলাম মাওলা রনি

২০ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৩১


গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি

প্রিন্ট

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু কর্ম ও কথামালা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। সরকারের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং জনমতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার মনোবৃত্তির কারণে তারা ওসব আলোচনা-সমালোচনাকে একদম থোড়াই কেয়ার করছেন। অন্য দিকে, সাধারণ মানুষের চিরায়ত ভয়ভীতি, লাজ-লজ্জা এবং ঝক্কি-ঝামেলা থেকে বেঁচে থাকার মানসিকতার কারণে তারা যেমন রাজপথে নামছেন না, তেমনি সরকারবিরোধীরাও সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের টুঁটি নিজেরাই চেপে ধরে আছেন অহেতুক মামলা-মোকদ্দমা, গুম-খুন অথবা নাজেহালমূলক দমন-পীড়নের ভয়ে। ফলে প্রকৃত ঘটনা কিংবা ঘটনার কার্যকারণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে না। এতে করে বহুমুখী গুজব যেমন ছড়িয়ে পড়ছে, তেমনি লোকচক্ষুর অন্তরালে সরকার, বিরোধী দল এবং আমজনতার মাঝে তৈরি হয়ে যাচ্ছে বিশাল বিশাল সব ভুল বোঝাবুঝি ও বেদনার ক্ষত।
প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে গিয়ে কেন প্রেস কনফারেন্সের একপর্যায়ে পুরোপুরি হিন্দিতে কিছুক্ষণ বক্তব্য রাখলেন অথবা দেশে ফিরে গণভবনে আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে কেন দিল্লি সফরের সময় সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক এবং চুক্তিগুলোর সমালোচনা না করে সেগুলোর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করার পরামর্শ দিলেন? অন্য দিকে, বহুল আলোচিত-সমালোচিত হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক এবং নাটকীয়ভাবে কওমি মাদরাসাগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নেয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের পেছনে কী অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা। বিরোধী দল তো বটেইÑ এমনকি শাসক দলের মধ্যেও শুরু হয়েছে নিদারুণ অস্থিরতা এবং অপ্রীতিকর বাগি¦তণ্ডা। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের রূঢ় সমালোচনা করেছেন। এ অবস্থায় বিষয়টি আরো জটিল আকার ধারণা করেছে।
সাম্প্রতিককালের আরেকটি বোমা ফাটানো বিতর্কের নাম, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রিক দেবীর মূর্তি। দেশের ইসলামপন্থী দলগুলো বেশ কিছু দিন ধরে মূর্তিটি অপসারণের ব্যাপারে সর্বাত্মক আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। অন্যদিকে, মূর্তির পক্ষে অবস্থানকারী লোকজন নিজেদেরকে প্রগতির ধারক ও বাহক ঘোষণা দিয়ে আদাজল খেয়ে দশমুখে দেশের আলেম-ওলামা এবং ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কটাক্ষ করে নানান উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। হেফাজতে ইসলাম সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি অপসারণের জন্য মহাসমাবেশ করার হুমকি দিয়েছিল। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যখন খোলামেলা ভাষায় মূর্তিটি সম্পর্কে নিজের মতামত ব্যক্ত করলেন তখন ইসলামপন্থী দলগুলো যতটা না খুশি হলেন, তার চেয়েও বেশি মাত্রায় বিরূপ হলেন সরকারি দলের সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী প্রগতির কথিত ধারক ও বাহকেরা।
উল্লিখিত তিনটি বিষয় নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নির্মোহভাবে চিন্তাভাবনা করে আসছি। আমি নিরপেক্ষভাবে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করেছিÑ কেন প্রধানমন্ত্রী এমনটি করলেন বা তেমনটি বললেন। প্রধানমন্ত্রীর আসনে যদি আমি থাকতাম তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কি তার চেয়ে ভালো কিছু বলতে বা করতে পারতাম? অথবা প্রধানমন্ত্রীর উত্তপ্ত আসনে বসে বর্তমান জামানার রূঢ় বাস্তবতা মেনে নিয়ে নিজেকে সব দিক থেকে নিরাপদ রেখে, তিনি যা বলেছেন এবং করেছেন সেগুলোর চেয়ে উত্তম কোনো বিকল্প তার কাছে ছিল কি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ-পদবি, স্থান-কাল-পাত্র এবং সময়ের নির্মম বাস্তবতা নিয়েও নিরপেক্ষভাবে চিন্তাভাবনা করেছি। এসব ব্যাপারে আমার মতামত ব্যক্ত করার আগে বর্তমান যুগের নির্মম বাস্তবতা এবং প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কিছু বলা আবশ্যক।
এ কথা সবাই জানেন, বিগত সংসদ নির্বাচনটি কিভাবে হয়েছে এবং কিভাবে এ সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং টিকে আছে। কিন্তু এ কথা কেউ জানার চেষ্টা করেন না, বিগত নির্বাচনটি নিয়ে শাসকদল এবং তাদের শরিকেরা মনে মনে আসলে কী ভাবেন? অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা যে চেষ্টা-তদ্বির করছেন এবং তাদের সেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে দেশী-বিদেশী চক্র যে অহেতুক ও অনৈতিক চাপ দিয়ে যাচ্ছে তাতে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কি ন্যূনতম মর্মবেদনা, অনুতাপ বা অস্বস্তি সৃষ্টি হচ্ছে? অথবা সরকারপ্রধানের ব্যক্তিত্ব, নীতি-নৈতিকতা, আভিজাত্যবোধ এবং শিক্ষাদীক্ষার সাথে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দেশী-বিদেশী তাপ-চাপ মানানসই কি না! তার সব কিছু কি তাঁবেদার শাসকের মতো? নাকি বঙ্গবন্ধুর মতো দৃঢ়তা, সাহস ও মনোবলের সঙ্গে আত্মবিশ্বাস এবং জনগণের প্রগাঢ় ভালোবাসার নিদারুণ টান তাকে প্রভাবিত করে?
আমার কাছে মনে হয়েছেÑ ভারতের বর্তমান ‘দাদাগিরি’ প্রধানমন্ত্রীর একদম পছন্দ হয় না। ভারতকে সুকৌশলে বশে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জায়গাটি তিনি ইতোমধ্যে করে ফেলেছেন। কিন্তু ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য দরকার, তা আমাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য এবং বর্তমান পরিস্থিতির কারণে করে উঠতে পারছেন না। দৃশ্যমানভাবে তিনি বিএনপির সঙ্গে একটি চলনসই সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছেন। নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। বেগম জিয়ার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু নেতার সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। কিন্তু প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য দূতিয়ালি করতে পারেন এমন সাহসী আর গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে তিনি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক কিছু পেরে উঠছেন না।
বর্তমানে নির্মম বাস্তবতা হলোÑ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা তাদের শরিক দলে এমন কোনো গ্রহণযোগ্য, সাহসী, চরিত্রবান এবং ক্যারিসম্যাটিক নেতা নেই যিনি প্রধানমন্ত্রীর জন্য, বিএনপি অফিসে গিয়ে নিঃসঙ্কোচে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। অন্য দিকে বিএনপিতেও এমন কোনো নেতা নেই যিনি আওয়ামী লীগ অফিসে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করার কথা চিন্তা করেন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির এই দৈন্যকে পুঁজি করে ভারত যে উভয় দলের সঙ্গে খেলছে তা এখন রীতিমতো ওপেনসিক্রেট। প্রধানমন্ত্রীকে যতটুকু চিনি বা তাকে দীর্ঘ দিন একান্ত কাছে থেকে যেভাবে দেখেছি তাতে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে এবং দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নীতিবহির্ভূত ‘খেলাধুলা’ তিনি একদম বরদাশত করতে পারেন না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, তিনি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও একাকী অনেক কিছু করতে পারছেন না। ফলে লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রধানমন্ত্রীর অন্তর কতটা অসহায়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই অনুমান করতে পারেন।
ভারত সফরের কিছু দিন আগে বেশ ঘটা করে চীনের কাছ থেকে ক্রয়কৃত সাবমেরিন উদ্বোধন করার মধ্যে আমি ভিন্ন কিছু খুঁজে পাই। তারপর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ এবং পরে সারা দেশে হঠাৎ করে জঙ্গি আক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্যে যদি সমন্বয় না করা হয় তবে প্রকৃত ঘটনার মূল্যায়ন অসম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর অনাহূত বিরোধ, পারস্পরিক বিবাদ, অশ্রদ্ধা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র বাসনা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কিভাবে দুর্বল বানিয়ে ফেলতে পারে তা বর্তমানের ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মূল্যায়ন করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এবার দিল্লি প্রেস কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দিতে প্রদত্ত বক্তব্য সম্পর্কে কিছু বলা যাক। তিনি হিন্দিতে বক্তব্য দিয়ে যে খোঁচাটুকু ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দিতে পেরেছেন তা বাংলা অথবা ইংরেজিতে বলে একেবারেই অসম্ভব ছিল। এবার তার সেই বক্তব্যের কিয়দংশের ভাবসম্প্রসারণ করা যাক। তিনি প্রথমেই বলেছেন, পানি মাঙ্গা। তিনি তার পিতার মতো বলেননিÑ মুঝে পানি চাহিয়ে; আপকো পানি দেনা হোগা। প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ দিন ভারতে ছিলেন। কাজেই দেশের বর্তমান শীর্ষ রাজনীতিবিদদের মধ্যে তার চেয়ে ভালো হিন্দি সমঝদার এবং বলনেওয়ালা যে কেউ নেই, তা প্রায় নিশ্চিত। তিনি খুব ভালো করেই মাঙ্গা এবং চাহিয়ে শব্দের অর্থগত পার্থক্য বোঝেন এবং জানেন। আমার মতেÑ তিনি ইচ্ছে করেই চাহিয়ে শব্দ পরিহার করে মাঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
কোনো অসহায় মানুষ যখন করুণ আর্তি নিয়ে শর্তহীনভাবে কারো কাছে বিনয়ের সঙ্গে কোনো কিছু কামনা করে তখন সেখানে মাঙ্গা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। দয়া, দাক্ষিণ্য, করুণা, ভদ্রতা, নম্রতা, ন্যায়বিচার এবং ভিক্ষার মতো আর্তি প্রকাশ করতে গিয়ে ‘মাঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অন্য দিকে, নিজের আইনগত ন্যায্য অধিকার আদায় করার জন্য মানুষ যখন সবল-সক্ষম এবং প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধ-সংগ্রাম করার পর্যায়ে থাকে, তখন চাহিয়ে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যার কাছে কোনো কিছু মাঙ্গা হয় বা মাগে, তার একটি মানবিক দায়িত্ব সৃষ্টি হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট অভাবীর অভাবটি পূরণ করে দেয়া। সাধারণত কোনো গৃহকর্তা বা কর্ত্রী ক্ষমতাবানের কাছে অভ্যাগত মেহমান কোনো কিছু পাওয়ার জন্য মাঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেন। কর্তা যদি আবেদনটি মঞ্জুর না করেন অথবা অভ্যাগতের আর্তি ফিরিয়ে দেন তবে সর্বমহলে তিনি ঘৃণিত মন্দ মানুষ বলে চিহ্নিত হয়ে যান। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর মানবিক আবেদন যারা অমানবিকতা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী যে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তার দায় তারা কোনো দিন মেটাতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের পরের অংশে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দু’টি বাক্য ব্যবহার করেছেন। একটি হলো বিজলি মিলা আর অন্যটি হলো ক্যুছ তো মিলা! এখানে বিজলির বহুমাত্রিক অর্থ রয়েছে। অনেকে এর অর্থÑ বিদ্যুৎ বলে থাকেন। কিন্তু বিজলির আসল অর্থ হলো বজ্রপাত এবং আসমানী আগুন যা একটি খোদায়ী গজব। এবার প্রধানমন্ত্রীর হিন্দি বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ করুন। আমি পানি প্রার্থনা করেছিলামÑ তারা আমাকে পানির পরিবর্তে আসমানী আগুন দিয়েছেন, যাকে আপনারা বজ্রপাতও বলতে পারেন। পানির পরিবর্তে আগুন প্রাপ্তি। এই বা কম কিসে! কারো বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে আনার পর তৃষ্ণার্ত অতিথিকে যদি পানির পরিবর্তে আগুন দিয়ে আপ্যায়িত করা হয় তবে মেহমানের যেরূপ অনুভূতি হয়, আজকের দিনে আমার অনুভূতিও একই রকম।
কিছু সরকার সমর্থক, দালাল প্রকৃতির তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য না বুঝে বিষয়টিকে হালকা করার জন্য বলে চলেছেন, তিনি কৌতুকচ্ছলে হিন্দিতে কথাগুলো বলেছেন। এই ধরনের বুদ্ধিজীবীদের কারণে বঙ্গবন্ধু ডুবেছিলেন এবং আগামীতে যদি প্রধানমন্ত্রীর কিছু হয় তবে এদের বালখিল্য আচরণের কারণেই হবে। টেলিভিশনে যারা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছেন ও দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ লক্ষ করেছেন। তিনি মোটেই আনন্দিত অবস্থায় কৌতুক করার মুডে ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিব্রত, বেদনাহত এবং অপমানিত। দেশে ফেরার পর তিনি বিমানবন্দরে সংবর্ধনা না নেয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা তার গভীর দেশপ্রেম এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধের প্রমাণ বহন করে। গত সাত বছরে পুরো জাতি দেখেছে, বিদেশ থেকে সামান্য কিছু অর্জিত হলেই তার দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। কিন্তু এইবার ভারত থেকে ফেরার পর সংবর্ধনা বাতিলের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যের সঙ্গে বেমানান। প্রধানমন্ত্রী তার একক সিদ্ধান্তে এটি করেছেন আগামী প্রজন্মের কাছে একটি দৃষ্টান্তমূলক দলিল সংরক্ষণের জন্য, যার কথা তিনি মুখ ফুটে বলেননিÑ বলতে পারেননি।
দিল্লি থেকে ফিরে তড়িঘড়ি করে হেফাজতের সঙ্গে বৈঠক এবং তাদের দাবি মেনে নেয়ার মধ্যে বেশ কিছু অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে। যে যা-ই বলুক না কেনোÑ এই বৈঠকটি গণতান্ত্রিক সমঝোতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। সরকার এবং হেফাজত উভয়েই পরস্পরের দ্বারা এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সঙ্ঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির নেই। শাপলা চত্বরে হেফাজতের মহাসমাবেশকে ঘিরে রাজধানীতে যে সন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও হয়েছিল এবং এ ঘটনা সরকারকে যেভাবে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছিল তাতে তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ নিয়ম মতে সরকার কর্তৃক শেষদিন পর্যন্ত হেফাজত ধ্বংসে ব্যস্ত থাকার কথা। অন্য দিকে, সরকার কর্তৃক বিগত দিনে হেফাজত যে হত্যা, গুম, জেল-জুলুম, মামলা, হামলা ইত্যাদির শিকার হয়েছিল তাতে সরকারের সঙ্গে তাদের আপস কিংবা সরকারকে বিশ্বাস করার যে নজির তারা স্থাপন করেছে তা-ও তৃতীয় বিশ্বে দেখা যায় না।
সরকার হেফাজতের বিষয়টি যে মানসিকতা নিয়ে নিষ্পত্তি করেছে তার কিয়দংশও যদি অন্যান্য রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে প্রয়োগ করে তবে বর্তমানের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি অনেকটা হালকা হয়ে যাবে। সরকার ও হেফাজতের তড়িঘড়ি সম্মিলনের পেছনে আরো একটি তাৎপর্য থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তার দিল্লি সফরের সময় ভারতের লোক দেখানো আতিথেয়তা এবং তাকে বঞ্চিত করার প্রবণতার মধ্যে হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে, কংগ্রেস সরকারের মতো বর্তমান বিজেপি তার প্রতি আন্তরিক নয়। তারা তলে তলে বাংলাদেশ নিয়ে হয়তো এমন কিছু খেলা খেলতে চাইছে যা প্রধানমন্ত্রীর মনোপুত হবে না। অথবা বিগত তিনটি বছর ধরে ভারতের দাদারা গোপনে-প্রকাশ্যে এমনসব কথাবার্তা বলছেন, আচার-আচরণ করছেন অথবা এমন ভাব দেখাচ্ছেন, তাতে মনে হয়েছে ভারতের দয়ায় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং বহাল আছে, যা একজন স্বাধীনচেতা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মেনে নেয়া বা বরদাশত করা সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি হয়তো আগামীতে একটি তুমুল প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন এবং বিরূপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে রাজনৈতিক মিত্র সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
কওমি মাদরাসাগুলোর সনদকে স্বীকৃতি দেয়া নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই সেক্টরে অধ্যয়নরত প্রায় ২০ লাখ বিদ্যার্থীর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা সর্বান্তকরণে সমর্থন করি। মাদরাসার ছাত্ররা শিক্ষাসনদ নিয়ে ডাক্তার হিসেবে রোগীদের চিকিৎসা করবেন না বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সড়ক, বাড়ি কিংবা পুল-কালভার্ট বানাবেন না, তারা তাদের নিজস্ব সেক্টরে কাজ করবেন এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রগুলোতে নিয়োগ লাভের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন। এতে করে চাকরির বাজারে নতুন এক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। আমরা মনে করি, মাদরাসার ছেলেরা যদি বিসিএসের মতো পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে, তবে আগামীতে জাতি তাদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে উন্নত ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাবে। প্রধানমন্ত্রী খুব ভালো করেই জানেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে কওমি মাদরাসাগুলোর নিজস্ব শিক্ষাপদ্ধতি এবং শিক্ষার মান ভেজালমুক্ত। মাদরাসা ছাত্রদের বিনয়, ভদ্রতা, আনুগত্য, স্মরণশক্তি, সততা এবং শিক্ষার মানের সঙ্গে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার কোনো তুলনাই চলে না। এ বিষয়ে আগামীতে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের বিবরণ দিয়ে আজকের নিবন্ধ শেষ করব। মূর্তিটি স্থাপনের পর সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিচারাঙ্গনের যারা এই মূর্তি স্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন তারা হয়তো বিষয়টির প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবেননি। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারাও মারাত্মক বিব্রত অবস্থায় পড়ে যান। এ অবস্থায় মূর্তিটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুটো মন্তব্য পুরো পরিস্থিতিকে সহনীয় হতে এবং মীমাংসার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেছেন, মূর্তিটি আমার ভালো লাগেনি। আর এটির নির্মাণকাজও ভালো হয়নি। গ্রিক নারীমূর্তি শাড়ি পরবে কেন? তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমাধান বের করার যে আশ্বাস দিয়েছেন তাতে উভয়পক্ষই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫