ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

বিবিধ

মহাকবি ইকবাল

শহিদুল ইসলাম

২০ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১২


প্রিন্ট

বিংশ শতকে ইকবাল কাব্যের চাবুক মেরে মানুষকে জাগিয়ে জীবন প্রণালিকে সৌষ্টব দান করেছিলেন। তিনি ৯ নভেম্বর ১৮৭৭ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় পাঞ্জাবের শিয়ালকোর্টে জন্মগ্রহণ করেন। ইকবাল একজন কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ। তিনি পাকিস্থানের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে পরিচিত। ১৯০৫ সালে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং জার্মানির মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯০৮ সালে পিএইচডি লাভ করেন। তিনি মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, আলীগড় প্রভৃতি জায়গায় যে ছয়টি ভাষণ দেন তার সঙ্কলন হিসেবে ১৯৩০ সালে “ঞযব জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ ড়ভ জবষরমরড়ঁং ঞযড়ঁমযঃ রহ ওংষধস” নামে বইটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে গ্রন্থের শেষে ওং জবষরমরড়হ চড়ংংরনষব! শীর্ষক প্রবন্ধ সংযোগ করে ঙীভড়ৎফ টহরাবৎংরঃু চৎবংং প্রকাশ করে। ইংরেজি ছাড়াও ইকবালে রচনাবলি ফার্সি ও উর্দু ভাষায় প্রকাশিত হয়। ইকবাল যাদের চিন্তা দিয়ে প্রভাবিত হন তারা হলেন- সৈয়দ মীর হাসান, রুমি, গ্যেটে, নিটশে, হেনরি বার্গসো ও টি ডব্লিউ অ্যারনন্ড প্রমুখ।
কর্মজীবনে তিনি প্রথমে ওরিয়েন্টাল কলেজে রিডার পদে এবং পরে লাহোর সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ব্যারিস্টারি পাস করেন এবং লাহোর হাইকোর্টে আইনের পেশার কাজ চালিয়ে যান।
ইকবালের কাজ ও রচনাবলি দিয়ে প্রভাবিত হয় মুসলিম বিশ্ব। তার দার্শনিক চিন্তা সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্তরআত্মায় ঝড় সৃষ্টি করেছে। পাশ্চাত্যের সাম্যজ্যবাদ যান্ত্রিকতাবাদ, ভোগবাদ, উগ্র বস্তুবাদ শান্তি দিতে পারে না। আবার প্রাচ্যের পরম ভাববাদ, মরমীবাদ ও জগৎ বিমুখ চিন্তা-চেতনা মানুষকে পার্থিব জীবনে শান্তি দিতে পারে না। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সমন্বয় করতে চেয়েছেন। তিনি বিষয় ও বিষয়ীকে স্বীকার করেছেন। আমি আছি বলে বস্তু দেখছি, আবার বস্তু আছে বলে আমি দেখছি। এ দুটিকেই তিনি সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি জ্ঞানতত্ত্বে বুদ্ধিবাদ এবং অভিজ্ঞতা বাদের স্বীকার করে সজ্ঞাবাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধির মাধ্যমে যে জ্ঞান পাওয়া যায় সেটা খণ্ড খণ্ড জ্ঞান। আমরা যদি অখণ্ড জ্ঞানের সন্ধান চাই তাহলে আমাদের স্বজ্ঞাবাদী মানসিকতায় উদ্দীপ্ত হতে হবে। জগৎ মায়া ছায়া নয়। জগতের অস্তিত্ত্ব আছে। তিনি পূর্ণাঙ্গ মানুষ ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য ইহকাল ও পরকালকে স্বীকার করেছেন। অতীতের ইতিহাস ঐতিহ্য ও কৃষ্টি কালচার ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক। জগৎ গতিশীল এবং পরিবর্তনশীল। এই গতি ও পরিবর্তনের মাধ্যমে নব নব সৃষ্টি করে চলেছে নিশ্চল এবং স্থবির জীবন, জীবন নয় বরং তার মৃত্যু অবধারিত। ইকবাল এই পরিবর্তন কে মেনে নিয়েছেন।
জগৎ যান্ত্রিক নয় বরং উদ্দেশ্যবাদী। বস্তুবাদীরা যে পরম বুদ্ধিমান সত্তাকে অস্বীকার করে জগৎকে নিছক যন্ত্রের মাধ্যমে কল্পনা করেছেন তিনি তার সমালোচনা করেন। পরম বুদ্ধিমান সত্তা জগৎকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে চলেছে। এটা স্বাধীন ও সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। ইকবালের খুদিদর্শন তার দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয়। তিনি আত্মা, অহং ও খুদিকে দেখেছেন স্বজ্ঞার মাধ্যমে এবং পরম খুদিকে তিনি উপলব্ধি করেছেন। আত্মিক উৎকর্ষতার ফলে মরমী অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
বস্তুকে দেশ কালের মাধ্যমে জানা যায়। কিন্তু পরম খুদিকে অন্তরানুভূতির মাধ্যমে জানা যায়। তিনি হেগেলের দ্বান্দ্বিক ভাববাদকে গ্রহণ করেননি। বুদ্ধি, প্রজ্ঞা এবং স্বজ্ঞার মাধ্যমে বিকশিত হয় মানুষের চেতনা এবং বৈজ্ঞানিক ও জাগতিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষ পরিণত হয় পূর্ণ মানুষে এবং মিলিত হয় পরম সত্তার সাথে।
তিনি মুসলিম সমাজকে ধর্মান্ধতা ও গোড়ামি পরিহার করে বিশ্ব-আত্মার সাথে একত্রিত ও ধন্য হতে বলেছেন। সজীব ও সজাগ ব্যক্তিত্বকে তিনি সব সময় শ্রদ্ধা করেছেন। তিনি বলেন, একজন সক্রিয় নাস্তিক নিষ্ক্রিয় আস্তিক অপেক্ষা ভালো। তিনি পাশ্চাত্য থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তার মতো বড় উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাতে সচরাচর নেই। পাশ্চাত্যের সুখ-ভোগ-চাকচিক্য তার দুই চোখে কেন দেখা দেয়নি? এ ব্যাপারে ইকবাল বলেন- ‘পাশ্চাত্যের সুখ-ভোগ-চাকচিক্য আমার চোখে কেন বড় হয়ে দেখা দেবে? যে চোখে মক্কা মদিনার ধুলাবালু সুরমা স্বরূপ লাগানো ছিল।’
তিনি অর্থনৈতিক-সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
আল্লামা স্যার ড. ইকবাল ১৯৩৮ সালের ২১ শে এপ্রিল ভোর ৫টা ১২ মিনিটে জগতের কোলাহল থেকে পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। লাহরের শাহী মসজিদের পাশে তাকে সামাহিত করা হয়। ইকবালের যোগ্য পুত্র বিচারপতি ড. জাবিদ ইকবাল ‘যিন্দা রোদ’ নামে তার জীবনীগ্রন্থ উর্দু ভাষায় ১৯৭৯ সালে প্রকাশ করেন। ইকবাল বিংশ শতকে মুসলিম পুনর্জাগরণে যে অবদান রেখে গেছেন এবং যে দর্শন ও আদর্শ প্রচার করেছেন বিশ্ববাসী তাকে আজীবন শ্রদ্ধা জানিয়ে যাবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫