ঢাকা, শুক্রবার,২৮ জুলাই ২০১৭

বিবিধ

বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদির

বোরহান উদ্দিন আহমদ

২০ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:০৮


প্রিন্ট

কবি সাযযাদ কাদির প্রকৃত অর্থেই একজন বহুমাত্রিক লেখক। কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, সমালোচনা সাহিত্য শিশুতোষ গ্রন্থ ও অনুবাদ গ্রন্থ রচয়িতা তিনি। তার রচিত গ্রন্থের মান নিঃসন্দেহে উচ্চমানের।
এই বহুমাত্রিক লেখক কবি সাযযাদ কাদিরের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯৪৭ সাল থেকে। প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো এবং তার ওপর গবেষণামূলক ও সমালোচনাধর্মী প্রবন্ধগুলো পাঠ করেছি। এই প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়েছিল এককালের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন দৈনিকে সাহিত্যের পাতায়। আমার বুয়েটের সতীর্থ বন্ধু আমেরিকা প্রবাসী কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে ক্রমে তার সাথে আমার পরিচয় ঘটে। সিরাজের বাড়ি সাযযাদ কাদিরের মতো টাঙ্গাইল জেলায়। তারা টাঙ্গাইল শহরে একসাথে থেকেছেন। অমায়িক কবি সাযযাদ কাদিরের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। কবি লেখক সাযযাদ কাদিরের লেখার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠি এবং বইমেলায় তার সদ্য প্রকাশিত বইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে থাকি। বইগুলো পড়ে এক বিপুল আনন্দের জগৎ আমার চোখের সামনে খুলে যায়।
আমি নন-ফিকশন লেখা বিশেষ পছন্দ করি বলে তার লেখা নন-ফিকশনধর্মী বই সবার আগে পড়ি। বইগুলো পড়ে তার গবেষণা ও লেখার গভীরতা, বিচিত্র মজাদার তথ্যের সমাবেশে এবং সর্বোপরি তার লেখার প্রসাদ গুণে আমি বিপুলভাবে আকৃষ্ট হই এবং আমার কাছে সেগুলো অসাধারণ মনে হয়। ‘রাজরূপসী’, ‘নারীঘটিত’, ‘রমণী মন’, ‘হারেমের কাহিনী জীবন ও যৌনতা’ ও পৃথিবীর প্রিয়প্রণয়ী এই বইগুলোর প্রত্যেকটি বাংলাদেশের এই জাতীয় নন-ফিকশন গবেষণাধর্মী বইয়ের মধ্যে সম্ভবত সর্বাগ্রে উল্লেখের দাবি রাখে। সত্য ঘটনাও যে এত চিত্তাকর্ষক হতে পারে সেটা লেখক সাযযাদ কাদিরের এসব বই না পড়লে জানা যেতো না।
কবি লেখক সাযযাদ কাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্ম জীবনের শুরুতে তিনি কিছুকাল কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। বহুদিন পর্যন্ত তিনি মানবজমিন পত্রিকার সহকারী ম্পাদক ও সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পালন করেছেন। তিনি কলাম লেখক হিসেবেও জনপ্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতার সাথে সাথে তিনি নিরলসভাবে তার সাহিত্য সাধনা চালিয়ে গেছেন।
জানামতে লেখক হিসেবে কবি সাযযাদ কাদিরের প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রকাশ কবি হিসেবে। তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবিদের একজন। অন্যতম প্রবীণ কবি। ষাটের দশকের প্রথম দিকে কবি হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। তার প্রকাশিত কবিতার বইগুলো হচ্ছেÑ যথেচ্ছ ধ্রুপদ, রৌদ্রে প্রতিধ্বনি, দূরতমার কাছে, দরজার কাছে নদী, আমার প্রিয়, এই যে আমি, জানে না কেউ, বিশ্ববিহীন বিজনে, বৃষ্টিবিলীন, আমার ভুলবাসা, মনিমালা সিরিজ, কবিতা সমগ্র ও কবিতা সংগ্রহ। প্রেম, প্রকৃতি ও দর্শনের সুন্দর প্রকাশে তার কবিতাসমূহ এক আনন্দময় বেদনাময় মুগ্ধতার অনুভূতির জগতে আমাদের নিয়ে যায়। তার কবিতা আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। তার ছন্দ আমাদের আনন্দিত করে। ২০১৭ সালের অমর একুশের বইমেলায় প্রকাশিত তার সর্বশেষ কাব্য ভুলবাসাতেও এই প্রবীণ কবি তার প্রতিভায় সমুজ্জ্বল। সাহিত্যের সব শাখায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করলেও তিনি মূলত কবি, কোনো সন্দেহ নেই।
কবি সাযযাদ কাদির ছোট গল্প রচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তার গল্পগ্রন্থগুলো হচ্ছে চন্দনে মৃগপদচিহ্ন, অপর বেলায়, রসরগর ও গল্প সংগ্রহ। তার লেখা গল্পগুলোতে রয়েছে বাস্তবতার অনুপম চিত্রন, মানব মনের বিচিত্র প্রকাশ ও সমাজ সচেতনতা। তার গল্পসমূহ তাকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট গল্পকারের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপন্যাসিক হিসেবে সাযযাদ কাদির তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। সংখ্যায় কম হলেও তার লেখা উপন্যাসের গুণগত মান অনেক উঁচুস্তরের। তার উপন্যাসগুলো হচ্ছে অন্তর্জাল, খেই অনেক বছর পরে, জলপাহাড়, চার চমৎকার ও আঁচ। তার উপন্যাসসমূহের ঘটনা বৈচিত্র, বাস্তবতার প্রতিফলন, চরিত্র চিত্রন, সমকালীন সমাজের দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত আমাদের বিপুল ভাবে আকর্ষণ করে।
তার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধের অসাধারণ বইগুলো সম্বন্ধে প্রবন্ধের শুরুতে কিছুটা আলোকপাত করেছি। তার এই জাতীয় অন্যান্য বইগুলো হচ্ছে ভাষাতত্ত্ব পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ : মানুষটি, রবীন্দ্রনাথ : শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন শ্রীনিকেতন বিশ্বভারতী (২০১৭ বটেশ্বর বর্নন), সাহিত্য ও জীবনে রবীন্দ্র-নজরুল, বাংলা আমার বাংলা, সহচিন্তন, বিচলিত বিবেচনা, চুপ গণতন্ত্র চলছে..., ম্যাঙ্গো পিপল উবাচ, সহস্রক, জানা অজানা বাংলা। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রবন্ধকারদের মধ্যে প্রবন্ধকার সাযযাদ কাদির প্রথম সারির অন্যতম। গ্রন্থগুলো তাকে ভাষাতত্ত্ব ও রবীন্দ্র-নজরুল গবেষক হিসেবে বিশিষ্টতা দান করেছে। তার গবেষণার বিপুল বিস্তার অসাধারণ। কলামলেখক হিসেবেও তিনি অত্যন্ত সফল।
অনূদিত গ্রন্থ লাভ স্টোরি ও রসচৈনিকের মাধ্যমে সাযযাদ কাদির অনুবাদক হিসেবে তার শক্তিমত্তার পরিচয় রেখেছেন। শিশুদের রূপকথা থেকে শুরু করে বহুসংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে লেখক সাযযাদ কাদির শিশুদের মন জয় করেছেন। তেনালি রামন গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি গোপাল ভাঁড়ের মতো ভারতবর্ষের আরেক কিংবদন্তি কৌতুক স্রষ্টাকে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে পরিচিত করেছেন। বিশ্বসেরা সাহিত্য হোমারের ইলিয়াডের সারানুবাদ তার এক বিশিষ্ট সাহিত্যকর্ম।
সম্পাদনায়ও বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদির তার দক্ষতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। এর মধ্যে দুষ্প্রাপ্য প্রবন্ধ করতেন সম্ভবত বাংলাদেশের উজ্জ্বলতম সম্পাদনাকর্মের অন্যতম। এর মাধ্যমে বহু দু®প্রাপ্য প্রবন্ধ তিনি আবিষ্কার করেছেন। প্রবন্ধ সংগ্রহ : বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রবন্ধ সংগ্রহ : বেগম রোকেয়া, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা, এই সময়ের কবিতা ২০১৪, এই সময়ের কবিতা ২০১৫ (বাংলা ভাষা সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চ্চা কেন্দ্র) তার সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
সাযযাদ কাদির একজন নির্লোভ ও ত্যাগী কবি ছিলেন। নীতির প্রতি তিনি অবিচল ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক লেজুড় বৃত্তিকে ঘৃণা করতেন। ফলে আর্থিক অস্বচ্ছলতা ছিলো তার নিত্যসঙ্গী। এই প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। এই লেখক ১৯৪৭ সালের ১৪ এপিল জন্মগ্রহণ করেছেন। ১৪ এপ্রিল ২০১৭ তার সত্তর বছর পূর্ণ হওয়ার আট দিন আগে গত ৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে এই বহুমাত্রিক লেখক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন চিরদিনের জন্য মৃত্যুর দুই এক দিন আগেও সমান সৃষ্টিশীল ছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন নিতান্ত অমায়িক ও নিরহঙ্কারী। তার মধুর ব্যবহারে তিনি সহজে মানুষের মন জয় করেছেন। জন্মদিনে এই প্রবীণ কবি লেখক গবেষক সমালোচক তথা বহুমাত্রিক লেখককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য সবাই যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন তার আকস্মিক মৃত্যু বিশাল একটা ট্র্যাজেডি। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও জান্নাত নসিবের জন্য পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি। তার জন্য আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করছি। এই বহুমাত্রিক লেখক কবি সাযযাদ কাদির তার সৃষ্টির মধ্যে বেঁচে থাকবেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫