ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

মিরাজের শিক্ষা ও বাস্তবতা

ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান

২০ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৩৪


প্রিন্ট

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনের শ্রেষ্ঠ মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর মধ্যে মিরাজ অন্যতম। মিরাজ শুধু মুহাম্মদ সা:-এর জীবনেই নয়, গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর ঘটনা। মানব শিক্ষায় ভরপুর মিরাজের মাধ্যমে মহানবী সা:-কে এই পার্থিব জীবনে মানব ইতিহাসের সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে। যে সম্মান এর আগে ও পরে অন্য কাউকেই দেয়া হয়নি। পরিতাপের বিষয়, মিরাজের মাধ্যমে মহানবী সা: যে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তাঁর প্রিয় উম্মতের জন্য রেখে গেছেন তা থেকে দূরে সরে গেছে বলেই আজ তারা সর্বত্র নির্যাতিত।

মিরাজের প্রেক্ষাপট
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর দীর্ঘ ১২টি বছর কুরাইশদের বাধা-বিপত্তির মোকাবেলায় মহান আল্লাহর বিধান প্রচার প্রসার ও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছলেন- যখন চার দিকে অসত্যের ধারক-বাহকগণ হিংস্রতার চরম আঘাত হানতে প্রস্তুত, সাহায্যকারী মানুষের মধ্য হতে প্রাণপ্রিয় সঙ্গিনী হজরত খাদিজা রা: ও চাচা আবু তালিব লোকান্তরিত, অসত্যের কোপানলে মক্কাভূমি উত্তপ্ত, মা হালিমার রা: স্নেহ ভূমি তায়িফ হতে নিদারুণ আশাহত হয়ে ফিরে এসে মানসিক দিক দিয়ে চরম বিপর্যস্ত- এমনি এক সঙ্কটকালে অনতিবিলম্বে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের বুকে আগত সব মানুষের ওপর মহান আল্লাহর বিধানাবলি কার্যকর করার বাস্তবধর্মী ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে সর্বোপরি সময় ও কালের ঊর্ধ্বে উঠে সব সৃষ্ট বস্তু ও তার প্রতিক্রিয়াকে উপলব্ধি, সৃষ্টি জগতের গোপন রহস্য অবলোকন ও মনোবল দৃঢ় করার নিমিত্ত মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মহানবী সা: মদিনায় হিজরতের এক বছর পূর্বে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের রজব মাসে রাতের কোনো এক সময় সশরীরে মিরাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন।
পবিত্র কুরআনে মিরাজকে ‘ইসরা’ বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসার দিকে, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য’ (সূরা বনি ইস্রাঈল : ১)।

শবে মিরাজের শিক্ষা
মহানবী সা: মিরাজ থেকে ফিরে আসার পরপরই কল্যাণময় ইসলামি সমাজের রূপরেখাসংবলিত ১৪ দফা মূলনীতিসহকারে সূরা বনি ইস্রাঈলের ২২ থেকে ৩৮ আয়াত অবতীর্ণ করা হয়েছে, যা নিম্নরূপ-
ষ ‘আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না। করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়বে’ (আয়াত : ২২)।
ষ ‘পিতা-মাতার সাথে সুন্দর ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উহ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো’ (আয়াত : ২৩)।
ষ ‘তোমরা যদি সৎ হয়ে থাকো তবে তিনি (আল্লাহ) তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল’ (আয়াত : ২৫)।
ষ ‘আত্মীয়স্বজন এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদেরকে তাদের প্রাপ্য প্রদান করবে’ (আয়াত : ২৬)।
ষ ‘কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তো তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ’ (আয়াত : ২৬-২৭)।
ষ আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশায় অভাবীদের সাথে সহজ ও কোমলভাবে কথা বলবে। (আয়াত : ২৮)
ষ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেহিসাবি হয়ো না, আবার কৃপণতাও প্রদর্শন করো না। আল্লাহ যাকে চান রিজিক বাড়িয়ে দেন, যাকে চান কমিয়ে দেন। (আয়াত : ২৯-৩০)
ষ অভাবের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। নিশ্চয় এটি মহাপাপ। (আয়াত : ৩১)
ষ জিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় এটি নিকৃষ্ট ও গর্হিত কাজ। (আয়াত : ৩২)
ষ আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন তাকে হত্যা করো না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি এই অধিকার দিয়েছি (চাইলে রক্তের বিনিময় চাইতে পারে), তবে হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে। (আয়াত : ৩৩)
ষ ইয়াতিম বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুপায় ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না এবং প্রতিশ্রুতি পালন করো, নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (আয়াত : ৩৪)
ষ মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দিবে এবং ওজন করবে সঠিক পাল্লায়। এটিই উত্তম পন্থা। (আয়াত : ৩৫)
ষ যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ, অন্তরের প্রত্যেকটি সম্পর্কেই কৈফিয়ত তলব করা হবে। (আয়াত : ৩৬)
ষ ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না। এগুলোর মন্দ দিকগুলো তোমার প্রভুর কাছে খুবই ঘৃণ্য। (আয়াত : ৩৭-৩৮)

শিক্ষা ও বাস্তবতা
বিশ্ব মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা হিসেবে রূপ দেয়ার জন্য মহানবী মুহাম্মদ সা: মহান আল্লাহর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেয়েছিলেন এই পবিত্র রাতে। এ জন্য রাতটি প্রত্যেক মুসলমানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পরিতাপের বিষয় মুসলিম বিশ্ব আজ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ভুলে গিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছে বলেই নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে।
মিরাজের মাধ্যমেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়েছে। মহানবী সা: তাই নামাজকে মিরাজের সাথে তুলনা করেছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মুসলমানদের অনেকেই আজ বিনা কারণে নামাজ ছেড়ে দিচ্ছে। এমনকি মুসলিম নামধারী অনেকেই আজ নামাজ আদায় তো দূরের কথা বরং অন্যকে নামাজ আদায়ে বাধা প্রদান করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মহানবী সা: মিরাজের রাতে শুধুমাত্র দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করারই শিক্ষা পাননি, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালনার মূলনীতিও শিক্ষা লাভ করেছিলেন, যা বাস্তবায়নে মহানবী সা: একটি আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই আজ অবৈধভাবে গুম, হত্যা, ধর্ষণ-ব্যভিচার, ইয়াতিমদের মাল আত্মসাৎ, মাপে কারচুপি ইত্যাদি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে স্বীয় ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছি। আজ আমাদের উচিত হবে মিরাজের শিক্ষার আলোকে নিজেদের গড়ে তোলা।
মিরাজের পুরো ঘটনাটিই মূলত বিজ্ঞানভিত্তিক। মিরাজের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজ্ঞানচর্চা তথা জ্ঞান অর্জনের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। মুসলমানদের উচিত যথার্থ জ্ঞানার্জন করে গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।

আমাদের করণীয়
হ হজরত আবু বকর রা:-এর মতো ঈমানদার হওয়া। কেননা মক্কার কাফেররা যখন মহানবী সা:-এর কাছ থেকে মিরাজের বর্ণনা শুনে হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রƒপ করছিল তখন আবু বকর রা: কোনো প্রকার প্রশ্ন ছাড়াই মহানবী সা:-এর কথা বিশ্বাস করেন।
হ সালাতের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া। সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ কায়েম কর। নিঃসন্দেহে নামাজ অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সূরা আনকাবুত : ৪৫)। যারা সঠিকভাবে নামাজ আদায় করে না তাদের পরিণতি সম্পর্কে মহানবী সা: বলেছেন, ‘তার কিয়ামত হবে কারণ, ফিরাউন, হামান ও উবাই ইবনে খালাফের সাথে’ (বায়হাকি)।
হ বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার জন্য সচেষ্ট থাকা। কারণ মাসজিদুল আকসা সমস্ত মুসলিমদের সম্পদ। এ সম্পদের সাথেই জড়িয়ে আছে মুসলিম উম্মাহর সম্মান ও প্রতিপত্তি।
হ মিরাজের রাত্রিতে পরিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার শেষ দুটি আয়াতও মহানবীকে সা: প্রদান করা হয়েছে। সে দু’টি আয়াত পাঠ করা এবং বাস্তবজীবনে সেগুলোর প্রচার ও প্রসার করা প্রয়োজন।

মিরাজ মহানবী সা:-এর প্রিয় উম্মতের জন্য সুসংবাদ বয়ে এনেছে। মিরাজে প্রাপ্ত উপহার নামাজ, মুমিন জীবনে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। মহানবী সা:-এর স্বচক্ষে দেখা মিরাজের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কুরআনের পথে, ইসলামের পথে চলাই হোক আজকের দৃপ্ত অঙ্গীকার। আসুন রজবের এই মাসে মহানবী সা:-এর মিরাজ থেকে আনীত উপহারসামগ্রী আমাদের বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ লাভ করি।
লেখক : গবেষক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫