ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

কাবা ঘরের ইতিবৃত্ত

শাহজাহান আলী খাঁন

২০ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫৩


প্রিন্ট

আমরা জানি পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিকে চার দিক শুধু পানি দ্বারা ঢাকা ছিল। আর মাঝখানটায় ভূমি ছিল যা বর্তমানে কাবাঘর স্থাপিত হয়ে আছে। হজরত আদম আ: এবং মা হাওয়া প্রথম এই কাবা ঘর তাওয়াফ করেন। পরবর্তীকালে আমরা জানি যে, হজরত ইবরাহিম আ: এবং হজরত ইসমাঈল আ: কাবা ঘর নির্মাণ করেন। এর পর থেকে পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কার করা যুগে যুগে হয়ে আসছে।

নামকরণ
কাবা ঘরের নামকরণ নিয়ে নানা রকম কথা আছে। তার মধ্যে ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আরবি অক্ষর কাফ আইন ও বা- এই তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে কাব বা মুকাআব, যার অর্থ চার কোণবিশিষ্ট। যেহেতু কাবা গৃহ চার কোণবিশিষ্ট, সেহেতু এর নামকরণ এখানে এভাবেই এসেছে। অন্য আর একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী আরবিতে সুউচ্চ গৃহকে কাবা বলা হয়। কাবা ঘর সাধারণ ঘড়ের চেয়ে উঁচু বলে এর এই নামকরণ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল মায়েদাহের দুই জায়গায় আল্লাহ্ তায়ালা এই পবিত্র গৃহকে কা’বা নামে সম্বোধন করেছেন। পবিত্র এই গৃহকে আরো চারটি নামে ডাকা হয়। এগুলো হচ্ছে- আল বাইত, বাইতুল আতিক, মসজিদুল হারাম, বাইতুল মুহাররাম।

সংস্কার
আল্লাহ্ তায়ালা হজরত ইবরাহিম আ:কে কাবা গৃহ নির্মাণের স্থান দেখিয়ে দেন। তখন তার বয়স ছিল ১৩৩ বছর আর হজরত ইসমাঈল আ: এর বয়স ছিল ৪৭ বছর। পবিত্র কুরআনে বলা হয়, ‘যখন আমি ইবরাহিমকে বায়তুল্লাহ’র স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরিক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাজে দণ্ডায়মানদের জন্য এবং রুকু সেজদাকারীদের জন্য’। [ ২২: ২৬ ] তখন আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী পিতাপুত্র মিলে কাবা ঘর নির্মাণ করেন।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে কাবা শরিফের যে অবস্থা ছিল ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম ও আজরাকি তা বর্ণনা করেছেন এভাবে যে- ‘ ইহা একটি প্রস্তর নির্মিত চতুষ্কোণাকার ছাদহীন একটি ইমারত। এই ইমারতের উত্তর-পূর্ব দিকের পরিমিতি ছিল ৩২ হাত, উত্তর-পশ্চিমে ২২ হাত, দক্ষিণ-পশ্চিমে ৩১ হাত এবং দক্ষিণ-পূর্বের ২০ হাত। দেয়ালের উচ্চতা ছিল ৯ হাতের কাছাকাছি। জমজম কূপের অভ্যন্তরে ছিল। ইমারতের চার কোণে চারটি প্রস্তর খণ্ড ছিল। কাবা ঘরের চতুর্দিকে মক্কাবাসীদের অনেক বাসগৃহ ছিল।’
৬০৮ সালে কাবা গৃহের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ায় কোরায়েশরা একে ভেঙে পুনর্নির্মাণ করেন। এই পুনর্নির্মাণে তারা লোহিত সাগরে বিধ্বস্ত একটি আবিসিনীয় জাহাজের মাল মসলা ও এর আরোহী বাকুম নামে একজন সুতার ও রাজমিস্ত্রিকে কাজে লাগান। তখন দেয়ালের উচ্চতা ১৮ হাত করা হয়েছিল। এবং উত্তর-পশ্চিম দেয়ালে একটি সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভ্যন্তরে তিনটি করে দুই সারিতে মোট ছয়টি স্তম্ভ ছাদের ভার বহনের জন্য বসানো হয়েছিল। ছাদে দেয়ালে স্তম্ভে নবী ফেরেশতা ও গাছগাছড়ার চিত্র ছিল। নবীগণের মধ্যে হজরত ইবরাহিম ও হজরত ঈসার কথা আজরাকি উল্লেখ করেছেন। হযরত ঈশার সাথে তার মা মরিয়মের ছবিও অঙ্কিত ছিল। পুনর্নির্মাণের পর কাবা গৃহের ওপর বস্ত্রের আবরণ দেয়া হয়।
৬৩৮ সালে খলিফা ওমর ফারুক রা: কাবা গৃহের চতুর্দিকের আবাসিক গৃহাদি ভেঙে চতুর্দিকে একটি উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করেন। এবং এই খোলা জায়গার চার দিকে বেষ্টনীরও ব্যবস্থা করেন। এবং প্রাচীরের গাত্রে প্রদীপের ব্যবস্থা করেন। কালো পাথরটি পূর্বে দেয়ালের পাশে ছিল। হজরত ওমর রা: বর্তমান জায়গায় কালো পাথরটি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিকগণ হজরত ওমর রা:কে কাবা ঘরের প্রথম সংস্কারক হিসেবে বিবেচনা করেন।
৬৪৬ সালে খেলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ২৬ হিজরিতে খলিফা হজরত ওসমান রা: চতুর্দিকের আরো বাড়িঘর ভেঙ্গে কাবার আয়তন আরো সম্প্রসারণ করেন এবং দ্বিতীয় দফা সংস্কার করেন। তিনিই প্রথম মসজিদুল হারামের বারান্দা নির্মাণ করেন। মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর খিলাফতের সঙ্কট দেখা দিলে মক্কায় ইবনে জুবায়ের ৬৮০ সালে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ইয়াজিদ ৬৮৩ সালে মক্কা অবরোধ করেন। অবরোধকালে তার ছোড়া গোলায় কাবাগৃহে আগুন ধরে যায় এবং ইহা ভস্মীভূত হয়। এর কয়েকদিন পরেই ইয়াজিদের মৃত্যু হলে ইবনে জুুবায়ের ৬৮৪ সালে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণে হাত দেন। আজরাকি ও ইয়াকুবির তথ্যানুসারে জানা যায় যে এই নির্মাণে আরো অনেক প্রস্তর ব্যবহার করা হয় কিন্তু কোনো কাঠ ব্যবহ্যর করা হয়নি। নতুন ইমারতের প্রশস্ততা ২ হাত, উচ্চতা ২৭ হাত এবং প্রস্তর স্তরের সংখা ২৭ হাত করা হয়েছিল। কালো পাথরটি আগুনে পুড়ে তিন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি ইহাকে রৌপ্যদ্বারা ফ্রেমের মাধ্যমে আটকিয়ে তা পুনঃস্থাপন করেন। এই নির্মাণে জুবায়ের ১১ হাত উঁচু দুইটি দরজাও লাগিয়েছিলেন প্রথমটি পূর্ব দিক থেকে প্রবেশের জন্য এবং অন্যটি পশ্চিম দিকে বের হওয়ার জন্য। বালাজুরি ও ইবনে খালদুনের মতে এই দরজা দু’টি স্বর্ণদ্বারা নির্মিত ছিল। ছাদে আরোহণের জন্য উত্তর কোণে তিনি একটি মই স্থাপনও করেন।
মাসউদির তথ্যানুসারে কাবা গৃহকে সজ্জিত করার জন্য ইয়েমেনস্থিত সানার একটি গির্জা থেকে তিনটি রঙিন মর্মর স্তম্ভ এবং গ্লাস মোজাইক আনা হয়েছিল। এই সজ্জিত কাজে পারসিক কারিগর নিয়োগ করা হয়েছিল বলে ‘কিতাব আল আগানি’তে উল্লেখ আছে। সানার এই গির্জাটি আবিসিনীয় শাসনকর্তা আবরাহা তৈরি করেছিল। জুবায়ের কাবা পুনর্নির্মাণের কাজ ৬৮৫ সালের মাঝামাঝি শেষ করে রেশমি কাপড়ে আচ্ছাদিত করেছিলেন, যা হোক সর্বপ্রথম নির্মাণ থেকে সর্বশেষ সময় পর্যন্ত মোট বারবার কাবা ঘরের সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজের কথা আমরা জানি। সে তথ্যানুযায়ী এভাবে সাজানো যায় যেমন- প্রথমবার পৃথিবী সৃষ্টির পর ফেরেশতাগণ কর্তৃক কাবা ঘর নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয়বার, হজরত আদম আ: কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। তৃতীয়বার : হজরত শীষ আ: কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। চতুর্থবার, হজরত ইবরাহিম আ: কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। পঞ্চমবার : আমালিকা সম্প্রদায় কর্তৃক পুননির্মাণ করা হয়। ষষ্ঠবার : জুরহাম সম্প্রদায় কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। সপ্তমবার : কুসাই বিন কিলাব কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। অষ্টমবার : মোজার সম্প্রদায় কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। নবমবার : কুরাইশগণ কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। মহানবী হজরত মুহম্মদ সা:-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে। তিনি এর নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন। হাজরে আসওয়াদ বর্তমান স্থানে স্থাপন করেছিলেন। ১০ম বার : ৬৪ হিজরিতে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা: নবীজি সা:-এর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ করেন। ১১তম বার : ৭৪ হিজরিতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১২তম বার : ১০৪০ হিজরিতে ওসমানিয়া খলিফা চতুর্থ মুরাদ কর্তৃক পুনর্নির্মাণ করা হয়। এটাই আজ পর্যন্ত কাবা ঘরের সর্বশেষ সংস্কারকাজ। এরপর ছোটখাটো সংস্কার কাজে হাত দেয়া হয়েছে বটে, তবে বড় কোনো কাজ করা হয়নি।
তথ্যসূত্র : আরব স্থাপত্য; এ বি এম হোসেন ও বিভিন্ন ইসলামি সাহিত্য
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫