ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

ফ্লাইওভার না মৃত্যুফাঁদ?

মো: তোফাজ্জল বিন আমীন

১৯ এপ্রিল ২০১৭,বুধবার, ১৯:৫৮


প্রিন্ট

ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয় মূলত যানজট নিরসন তথা নাগরিকদের দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি জীবনমানের উন্নতি তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। কিন্তু রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলো আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ করতে পারছে, তাই দেখার বিষয়। দ্রুত নগরায়নের ফলে দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ কত কী নির্মিত হচ্ছে নির্মাণশ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে। অথচ নির্মাণ শিল্পের সাথে জড়িত দেশের লাখো শ্রমিকের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত। ১২ মার্চ রাত আড়াইটায় রাজধানীর মালিবাগ রেলগেটে উড়াল সড়কের গার্ডার পড়ে একজনের মৃত্যু এবং দু’জনের অঙ্গহানির ঘটনা এক রক্তাক্ত হুঁশিয়ারি বার্তা ১৬ কোটি মানুষকে জানিয়ে গেল। এ ঘটনাটি যদি দিনের বেলায় ঘটত, তাহলে ৯৮ টন ওজনের ওই গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে কত মানুষের জীবন যে চলে যেত না ফেরার দেশে, তা আল্লাহ মালুম।
আমাদের দেশে ফ্লাইওভারের নির্মাণকালে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম তা কিন্তু নয়! এর আগেও মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপরে কর্মরত এক শ্রমিক চাপাপড়ে মৃত্যুবরণ করেন। গত বছরের ২৯ জুন একই ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে আহত হন এক রিবশাচালক। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাঁচ মাসে মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারে ২৬ জন আহত হয়েছেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের তিনটি গার্ডার ভেঙে ১৩ জন সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সে সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও অনভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের হাজারো মানুষ ফুঁসে ওঠেছিল। কিন্তু মগবাজার মালিবাগ ফ্লাইওভার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি। একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি যদি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয় তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। ফ্লাইওভার নির্মাণ করার সময় পর্যাপ্ত জালের ব্যবস্থা ও উপযুক্ত সাপোর্টিংয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তেমনটি পরিলক্ষিত হয়নি।
শুধু নির্মাধীন সময়ে নয়, ফ্লাইওভারে যানবাহন চলাচলকালেও নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। ৪ মার্চ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের সাতরাস্তা হলি ফ্যামিলি অংশে সাতরাস্তা প্রান্তে নামতে গিয়ে কাশিমপুর কারগারের প্রিজনভ্যান উল্টে ২৪ জন আসামি আহত হন। এর আগে গাজীপুর থেকে গুলিস্তানগামী একটি বাস একই ফ্লাইওভারে উল্টে যাত্রী আহত হয়েছে। ফ্লাইওভার নির্মাণে ত্রুটির কারণে এসব দুর্ঘটনা অহরহ ঘটছে। এ ছাড়া ফ্লাইওভারে যাত্রী ওঠানামার জন্য কোনো স্টপেজ না থাকলেও মাঝপথে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করার কারণে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। শুধু ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনা ঘটছে তা কিন্তু নয়। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণাধীন নানা ধরনের অবকাঠামোতে বহু শ্রমিক নিরাপত্তাজনিত পরিবেশ না থাকায় কাজ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। পেটের তাগিদে অনিরাপদ পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাখো শ্রমজীবী মানুষ নিরলস কাজ করে থাকেন বলেই আজকের নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছে। ২০১১ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর কাকরাইলে আইরিশ নূরজাহান টাওয়ার নামে একটি নির্মাণধীন ১৭ তলা ভবনের লিফটের তার ছিঁড়ে চার নির্মাণ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিকট অতীতে রাজধানীর র‌্যাংগস ভবন ভাঙার কাজে নিয়োজিত অনেক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা হয়তো আমরা ভুলে গেছি।
আমরা ফ্লাইওভার চাই। তার অর্থ এই নয় যে, বছরের পর বছর চরম নির্যাতন সহ্য করতে হবে। আমরা এ-ও জানি, যেকোনো উন্নয়নকাজে সাময়িক কিছু কষ্ট সহ্য করতে হয়। কিন্তু সে কষ্টেরও তো একটা সীমা থাকা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার প্রকল্প গত ছয় বছর ধরে জনদুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা, জনগণের টাকার অপচয় ও মৃত্যুর বিভীষিকার প্রতীক হয়ে ওঠেছে। সরকারের সংশ্লিষ্টরা প্রকল্পের অনুমোদনের পর ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষে কোরাস গাইতে ব্যস্ত। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং জননিরাপত্তায় যেন তাদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই। মগবাজার ফ্লাইওভার প্রকল্প এলাকায় ইতঃপূর্বে একাধিকবার নির্মাণশ্রমিক ও পথচারী মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিতের ন্যূনতম ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। আমরা মনে করি, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাওয়া নির্মাণ শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিধান একটি শক্তিশালী নির্মাণ আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫