ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

মতামত

নতুন পথে তুরস্ক

আসিফ হাসান

১৯ এপ্রিল ২০১৭,বুধবার, ১৭:২৮ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৭,বুধবার, ১৭:৪৯


প্রিন্ট

যেমনটি আশা করা হয়েছিল, সেভাবেই সবকিছু হয়েছে। এমনকি যেমন ব্যবধানে ফলাফল নির্ধারিত হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল, সেভাবেই হয়েছে। রোববার রজব তাইয়েব এরদোগানের সংবিধান সংশোধনী বিল গণভোটে জয়ী হয়েছে। এর মাধ্যমে তুরস্ক হতে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট-শাসিত দেশ। অনেকটা ফ্রান্সের মতোই হবে দেশটি। প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকায় দ্রুত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। তাছাড়া তিনি আরো বেশ কয়েক বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। আরো এক যুগই তিনি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবেন বলে কেউ কেউ মনে করছে।
এরদোগানের আমলে এক যুগ-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল তুরস্ক। কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’ হয়তো ছিল না, কিন্তু বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারীও সে ছিল না। ইউরোপের কথাতেও তাকে চলতে হতো, সে চলতোই। এক এরদোগান সেই পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল আরেক ধাপ এগুনোর। সেটাই প্রতীকীভাবে ফুটে ওঠেছে এই গণভোটের মাধ্যমে।
এই নির্বাচনটির ব্যাপারে তুর্কিদের বিপুল আগ্রহ ছিল। ৮৫ শতাংশ ভোটারের ভোটদানেই বোঝা যায়, ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ নিজ নিজ পক্ষে ভোট দিতে ভোটারদের নানাভাবে উদ্দীপ্ত করেছে। এরদোগান পেয়েছেন ৫১.৪ শতাংশ ভোট। এরদোগান বেশি ভোট পেয়েছেন কৃষ্ণ সাগরীয় উপকূল এবং আনাতোলিয়া এলাকায়।
তবে এরদোগানকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হবে। তিনি অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। বিরোধী দলগুলো নানা অনিয়মের অভিযোগ এনেছে। তাছাড়া প্রধান তিনটি শহর ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা ও ইজমিরে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। ইস্তাম্বুলে ‘না’ ভোট পড়েছে ৫১.৪ শতাংশ, আঙ্কারায় ৫১.২ শতাংশ এবং ইজমিরে ৬৪.৮ শতাংশ। বিশেষ করে যে ইস্তাম্বুলের রাজনীতি থেকে এরদোগানের উত্থান, সেখানেই ‘না’ ভোটের জয়যুক্ত হওয়াটা গুরুত্বের দাবিদার। মজার ব্যাপার হলো- প্রবাসীরা কিন্তু ব্যাপকভাবে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। বেলজিয়ামে বসবাসরত প্রায় ৭৭ শতাংশ তুর্কি, নেদারল্যান্ডের ৭৩ শতাংশ, ফ্রান্সের ৬৫ শতাংশ এবং জার্মানির ৬৩ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন।
এরদোগান কেন এমন পদক্ষেপ নিতে গেলেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ছাড়া আর কোনো কিছু করার ছিল না। বিশেষ করে গত অভ্যুত্থানের পর তাকে দ্রুত কিছু কাজ করার দরকার হয়ে পড়েছিল। এরদোগান ২০০৩ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় তুরস্কের শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন। কিন্তু পুরোপুরি আনা সম্ভব হয়নি। আর আছে শক্তিশালী আমলাতন্ত্র। অনেক সংস্কার কার্যক্রম লাল ফিতায় আটকে যায়। এই দু’টি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এমন কিছু একটা করার দরকার ছিল।
ফলাফল প্রকাশের পর এরদোগান একে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এ পদক্ষেপ ভবিষ্যতে জাতিকে সুরক্ষা প্রদান করবে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার চালু করার পক্ষে রোববারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ২০০ বছরের বিরোধের অবসান ঘটেছে।
ইস্তাম্বুলের হুবার প্রাসাদ থেকে দেয়া গণভোট-পরবর্তী ভাষণে এরদোগান বলেন, এটি দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার এক বিরাট প্রতীক হয়ে থাকবে। এটি কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়। আজ ছিল পরিবর্তনের দিন, যাতে দেশের প্রশাসনিক পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
অনেকে বলছেন, এরদোগান এখন স্বৈরাচার হয়ে গেছেন। সেটাই যদি হয়, তবে তো বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এবং আরো অনেক দেশ স্বৈরাচারী। কারণ এসব দেশেও প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত। প্রেসিডেন্ট-শাসিত দেশ অগণতান্ত্রিক এমন কোনো কথা তো কোথাও বলা নেই।
আসলে ইউরোপ বা ইউরোপের মিডিয়া একটি শক্তিশালী তুরস্ক দেখার পক্ষপাতী ছিল না। আগের মতোই নতজানু তুরস্ক দেখে তারা অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু সেই দিন আর নেই। তুরস্ক এখন তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলে। যে ধরনের নেতা তুর্কিরা মনে মনে আশা করেছিল, এরদোগানের মধ্যে তারা সেটাই পেয়েছে। এ কারণেই শত অপপ্রচারের মধ্যেও এরদোগান জনপ্রিয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে জার্মানি, সুইডেন, অস্ট্রিয়া সরাসরি এবারের গণভোটে এরদোগানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু এরদোগানকে তারা থামাতে পারেনি। বরং ওইসব এলাকায় বসবাসরত তুর্কিরা এরদোগানের পক্ষেই বেশি ভোট দিয়েছে।

কী ক্ষমতা পাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ায় প্রায় ৭০টি আইনে পরিবর্তন আসতে পারে। এসবের কয়েকটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে-

♠ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিলুপ্ত করে দেয়া হবে। প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট (নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যার উল্লেখ নেই) নিয়োগ দেবেন।

♠ পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করতে পারবেন প্রেসিডেন্ট।

♠ মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন।

♠ বাজেটের খসড়া প্রণয়ন করবেন প্রেসিডেন্ট, যা এখন করে থাকে পার্লামেন্ট।

♠ সাংবিধানিক আদালত প্রেসিডেন্টের বিচার করতে পারবে। ওই আদালতের ১২ জন সদস্য নিয়োগ দেবেন প্রেসিডেন্ট। বাকি তিনজনকে নিয়োগ দেবে পার্লামেন্ট।

♠ পাঁচ বছর করে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন প্রেসিডেন্ট। তবে দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে যদি পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট।

♠ ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে সংশোধনীগুলো বাস্তবায়ন শুরু হবে। সেই সময় একই দিনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

.

আর কী কী করতে চান এরদোগান
এরদোগান আরো দু’টি ব্যাপারে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব করেছেন। একটি হলো- মৃত্যুদণ্ডের বিধান ফিরিয়ে আনা। অপরটি হলো- তুরস্ক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেবে কি না।
অভ্যুত্থানের পর থেকেই মৃত্যুদণ্ডের দাবি জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সাথে যারা জড়িত ছিল, তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবি ওঠেছে।
আর তুরস্ক অনেক দিন ধরেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। মৃত্যুদণ্ড বিলোপসহ অনেক উদ্যোগই তারা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ইউরোপ তুরস্কের জন্য দরজা খোলেনি। এখন তুরস্কই চাচ্ছে, তারা ওই পথ আর মাড়াবে না। সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এরদোগান এ নিয়ে গণভোট আয়োজন করতে চাইছেন।
ইতোমধ্যে তুরস্কের বৈদেশিক সম্পর্কে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। পাশ্চাত্য শিবির ত্যাগ করে ইতোমধ্যেই সে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। এটা পাশ্চাত্যের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। বৈশ্বিক সমীকরণই বদলে গেছে এতে।
বর্তমানে যে বিশ্বব্যবস্থা রয়েছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, ইতোমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে। সেটা বড় আকারে হয়নি। কিন্তু ছোট ছোট যুদ্ধের আকারে হয়ে গেছে। আর তাতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের শক্তি ক্ষয়ে গেছে। এখন অন্য শক্তির অভ্যুদয়ের সময়। সেই সময়কে ধরার কাজে এগিয়ে এসেছেন এরদোগান।
তার নেতৃত্বে তুর্কিরা এখন হয়তো নতুন দিকে নিয়ে যাবে বিশ্বকেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫