ঢাকা, শনিবার,২৯ এপ্রিল ২০১৭

মতামত

নেপাল-চীন সামরিক মহড়া

ভারতের রক্তচাপ বাড়ছে

আলফাজ আনাম

১৯ এপ্রিল ২০১৭,বুধবার, ১৬:৪৪ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৭,বুধবার, ১৭:০৯


প্রিন্ট
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নেপাল এখন চীনের সহায়তায় শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হয়েছে

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নেপাল এখন চীনের সহায়তায় শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হয়েছে

নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যাদেবী ভান্ডারী যখন নয়া দিল্লি সফরে একই সময়ে কাঠমান্ডুতে চলছে নেপাল-চীন সামরিক মহড়া। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশটি ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে এসে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতির সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। চীনের সাথে নেপালের সম্পর্ক এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশটির উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রধান অংশীদারে পরিণত হয়েছে বিশে^র এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন। এক সময় ভারতের প্রভাব বলয়ে থাকা নেপালের এই ভারসাম্যমূলক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত সম্পর্কের গতি প্রকৃতিও খানিকটা বদলে দিয়েছে। গত ২৩ থেকে ২৫ মার্চ তিন দিনের সফরে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাংওয়ানকুন নেপাল যান। এর আগে তিনি শ্রীলঙ্কাও সফর করেন। ১৯৫৫ সালে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর এই প্রথম চীনের কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপাল সফর করেন। চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের পর থেকে নেপাল নিয়ে ভারত বাড়তি উৎকণ্ঠায় ভুগছে। এরপর ভারতের সেনা প্রধানও নেপাল সফর করেন। কিন্তু এর মধ্যে চীনের সেনাবাহিনীর সাথে নেপালের সেনাবাহিনীর যৌথ মহড়ার ঘোষণা আসে। চলতি মাসের ১৬-২৫ তারিখ পর্যন্ত সাগরমাথা ফেন্ডশিপ- ২০১৭ নামে এই যৌথ মহড়া চলছে। মাউন্ট এভারেস্টের নেপালি নাম সাগরমাথা। নেপালের সেনাবাহিনীর সাথে চীনের পিপলস আর্মির এটাই প্রথম যৌথ মহড়া। এর আগে শুধু ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবহিনীর সাথে নেপাল সেনাবাহিনীর যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দুই দেশের এই সামরিক সর্ম্পক শুধুমাত্র যৌথ মহড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাঠমান্ডু সফরে দেশটির সেনাবাহিনীর উন্নয়নে ৩২ মিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্যর ঘোষণা দেন। এই অর্থের একটি অংশ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে মোতায়েন নেপাল সেনাবাহিনীর আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার কাজে ব্যয় হবে। নেপালের সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করার লক্ষ নিয়ে যে, চীন এই সাহায্যর হাত বাড়াচ্ছে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
নেপালের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দুই দেশের সেনাবাহিনীর দক্ষতা বাড়ানো, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পেশাগত জ্ঞানের পরিধি বাড়ানো হবে এই মহড়ার লক্ষ। এ ছাড়া প্রশিক্ষণে দুর্যোগ ব্যস্থাপনার মতো বিষয়গুলো থাকছে। এর আগে নেপালে ভূমিকম্পের সময় চীনের পক্ষ থেকে ব্যাপক সহায়তা দেয়া হয়েছিল।
চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাঠমান্ডু সফরের সময় প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি চীনের সাথে সহযোগিতার যে ভিত্তি রচনা করেন বর্তমান নেতৃত্ব তা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকার বদল হলেও নেপালের চীন নীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসছে না। যদিও বর্তমান মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমাল দহাল দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমে ভারত সফর করেন। এখন তিনি চীন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে নেপালের সাথে রাজনৈতিক , কূটনৈতিক, নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সফর বিনিময় বেড়ে গেছে। নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্য ছাড়াও পুলিশ বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ বিনিময়ের চুক্তি হয়েছে। চীনের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে নেপালি ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। সরকার ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে চীনের সম্পর্ক বাড়ছে। নেপাল শুধু এক চীন নীতিতে সমর্থনের কথা জানায়নি, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট যোগ দেয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেপালের সাথে চীনের রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর ফলে নেপালের পণ্য আমদানি রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরতা অনেকটা কমে আসবে। এ ছাড়া চলতি বছরে নেপালে প্রতিশ্রুত চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
নেপালের সাধারণ মানুষ এখন ভারতের চেয়ে চীনের ওপর বেশি আস্থাশীল। ভারতের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে নেপালের আভ্যন্তরীন বিষয়ে ভারতের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নেপালের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। বিশেষ করে মাধেসিদের জন্য পার্লামেন্টে নির্দিষ্ট আসন দেয়ার জন্য নেপালের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে ভারত অঘোষিত অবরোধ আরোপ করেছিল। এরপর নেপালের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব চীনের সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করে। নেপালের মানুষ ভারতের ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যে, দেশটিতে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে একজন নেপালি নাগরিক নিহত হওয়ার দেশজুড়ে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে ভারত যখন চাপের মুখে পড়েছে তখন চীন অত্যন্ত উদারভাবে প্রতিবেশী দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির বদলে স্বাধীন নীতি গ্রহণ করেছে। নেপালে এখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। গত ১০ বছরে ৯ জন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও পররাষ্ট্রনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে তা থেকে দেশটি যে আর সরে আসছে না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এর কারণ চীনের কাছ থেকে নেপাল যে সহযোগিতা পাচ্ছে তা দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। নেপালের ওপর দাদাগিরিতে ভারত সফল হলেও এ ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়ার সক্ষমতা দেশটির নেই। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশটি এখন চীনের সহায়তায় শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হয়েছে। এতে ভারতের রক্তচাপ বাড়লেও নেপালকে এ অবস্থান থেকে আর ফিরে আনা সম্ভব হবে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫