ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

সড়ক দুর্ঘটনায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ নিহত!

হারুন-আর-রশিদ

১৮ এপ্রিল ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:৩০


হারুন-আর-রশিদ

হারুন-আর-রশিদ

প্রিন্ট

ইদানীং পত্রিকার পাতা ভরে থাকে অস্বাভাবিক মৃত্যুমিছিলের সংবাদ। শুধু বাংলাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা গড়ে প্রতিদিন শতাধিক। মানবসন্তানকে আজ পশু জবাইয়ের মতো করে খুন করা হচ্ছে। ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নম্বর বাবুরাইল এলাকায় বাসার মধ্যে একই পরিবারের পাঁচজনকে নিষ্ঠুর কায়দায় গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। ১৭ জানুয়ারি আরেকটি লিড নিউজ ছিল আরো হৃদয়বিদারক। ঘাতক বেপরোয়া বাসের নিচে দু’টি কোমল প্রাণ। সকালে রাজধানীর মৎস্যভবনের সামনে, বিকেলে কাছেই শাহবাগ মোড়ে সাহিবা ও খাদিজা প্রাণ হারায় নিষ্ঠুর বাসের চাপায়। নিরাপদ সড়কের জন্য মিটিং-মিছিল হয়, কিন্তু সড়ক নিরাপদ হয় না। ‘মূল্যহীন’ জীবন রক্তে গড়াগড়ি যায়, আমরা শুধু তাকিয়ে দেখি, এখন আর বুক কাঁপে না। এ ঘটনা প্রতিদিনের। বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল দুই কিশোরী, কিন্তু তাদের স্বপ্ন বাসের চাপায় ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এ রকম বহু মানুষের স্বপ্ন ৪৫ বছরে মুক্ত দেশে বিলীন হয়ে গেছে। কোনো মানুষ যদি ক্ষতির হিসাব করে, দেখতে পাবে প্রাণের চেয়ে বড় ক্ষতি বিশ্বে নেই। কারণ যে জীবন অকালে চলে যায়, সেটা আর ফিরে আসে না।
১০-০১-২০১৬ জাতীয় দৈনিকগুলোর লিড নিউজ ছিল, বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দুর্ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীর ছেলেসহ নিহত সাতজন। ১৬-০১-২০১৬ পত্রিকা লিখেছে, সড়ক মেরামতের কাজ করার সময় দ্রুতগামী ট্রাকের চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন শ্রমিক। ১৫ জানুয়ারি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার মিনহাজপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ পত্রিকায় উঠেছে চার জেলা পাবনা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত এবং আহত হয়েছে ১৫ জন। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পত্রিকায় আরেকটি সংবাদ ছিল লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরে মাত্র ১১ কিলোমিটার সড়কে ১৩ হাজার গর্ত, গাড়ি চলে হেলেদুলে, যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা। বিগত বছরগুলোতে মিনিবাসে নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটেছে নানাভাবে। ১০ জানুয়ারি গাজীপুরে একটি বেপরোয়া ট্রাক সড়কের পার্শ্ববর্তী দোকানে ঢুকে পড়ে। এতে পাঁচজন নিহত ও ১০ জন গুরুতর আহত হন। সড়ক যেন মানুষের মারণফাঁদে রূপ নিয়েছে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে বহু আলোচনা ও লেখালেখি হচ্ছে, কিন্তু প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
৯-০১-২০১৬ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারা বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর অঙ্গীকার থাকলেও তা বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেক হ্রাসে জাতিসঙ্ঘে অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। সরকার বহু প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিয়েছে, কিন্তু কোথাও কোনো অগ্রগতি নেই। সড়কমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিল অকার্যকর। সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে ছয় হাজার ৫৮১টি। মারা গেছেন আট হাজার ৬৪২ জন। এর মধ্যে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এক হাজার ৮০; ৩০৫ জন শিক্ষক, ১৩৩ জন সাংবাদিক, ১০৯ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৬৭৭ জন নারী, ১০৬ জন প্রকৌশলী, ৫৩৫ জন পরিবহন শ্রমিক, ৪১৯ জন চালক এবং চার হাজার ২৭৮ জন অন্যান্য। ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় দিনে গড়ে ২৪ জন মারা গেছে। ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছে ২১ হাজার ৮৫৫ জন। ২০১৪ সালের চিত্রও ছিল একই। এ সময় দুর্ঘটনা ঘটে পাঁচ হাজার ৯২৮টি। নিহত আট হাজার ৫৮৯ জন। আহত ১৭ হাজার ৫২৪ জন। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলেছে, এসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত সংবাদ থেকে সংগ্রহ করেছেন তারা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৫ সালে বলেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এটিই প্রমাণিত হয়- দেশের সড়ক পরিবহন প্রশাসন পুরোপুরি নখদন্তহীন হয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইন প্রয়োগে কেন গড়িমসি হচ্ছে, সে জন্য সংসদীয় কমিটির উচিত হবে উপদেষ্টা কাউন্সিলের কাছে কৈফিয়ত তলব করা। প্রয়োজনে আগের কমিটি ভেঙে দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা। পুলিশবাহিনীর হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় দিনে গড়ে ছয়জন। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এখনো কোনো সংস্থা দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠনটি। ১৭ জানুয়ারি ২০১৬ টিভি চ্যানেল আটজন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বলে জানায়। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু সাধারণ মানুষই নয়; বড়মাপের সাংবাদিক, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী-সরকারি কর্মকর্তাসহ বহু কবি-সাহিত্যিকও মারা গেছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হওয়াও সারা জীবনের কান্না হিসেবে একটি পরিবারের কাছে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো- সড়কের বেহাল অবস্থা। ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ পত্রিকা ‘সড়কের বেহাল দশা’র ক্যাপশনে বিপজ্জনক গর্তের ছবি দু’টি লিড নিউজ আকারে ছাপিয়েছে। একটি প্রাইভেট কার শান্তিনগর ডাকঘরের সামনের সড়কের গর্তে ১৫ জানুয়ারি সকালে আটকে যায়। চালক ও মালিক বহু চেষ্টার পরও ওঠাতে পারছিলেন না। পাঁচজন পথচারীর সহায়তায়, প্রায় আধা ঘণ্টা চেষ্টার পর গাড়ি ওঠানো সম্ভব হলেও একটু এগিয়ে গিয়ে আবারো যে গাড়িটি গর্তে পড়ে যাবে না- তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মালিবাগ মোড় থেকে শান্তিনগর মোড় পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ এ রকমই ভাঙা। একটু পরপর বিশাল গর্ত। মনে হয় হাঁ করে তাকিয়ে আছে গ্রাস করার জন্য। খিলগাঁওয়ে শিশু জেহাদ ও আরেকজন শিশু খেলতে গিয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ও পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপে পড়ে প্রাণ হারায়। মনুষ্যসৃষ্ট এসব কর্মকাণ্ডে বহু মানুষ আহত ও নিহত হচ্ছেন। রাজধানীর সড়কের ব্যাপক অংশই টেকসই পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হয় না। কারণ সরকারি টাকা লুটপাটের একটা উত্তম পথ হলো সড়ক ও সেতু নির্মাণের অব্যবস্থাপনা।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় সাধারণ মানুষ হতাহত হলে মিডিয়ায় নেতানেত্রীদের বাগযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অন্যান্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে তারা নীরব। লোক দেখানো অভিনয় চলছে মানুষের জীবন নিয়ে। নিহতের পরিবারের ক্ষতি কোনোভাবেই অর্থ দিয়ে লাঘব করা যায় না।
সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে যদি ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, তাহলে ৪৫ বছরে বাংলাদেশে চার লাখ ৪০ হাজার মানুষকে শুধু সড়কপথেই জীবন দিতে হয়েছে। জলপথে কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, সেই হিসাব ধরলে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। চিরপঙ্গুত্বে পরিণত হয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা যদি এর সাথে যোগ করা হয়, তাহলে স্থল ও জলপথে নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা অর্ধকোটির মতো হবে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জরিপে বাংলাদেশের দুর্ঘটনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এর চেয়ে কম নয় বলে পরিসংখ্যানবিদেরা জানিয়েছেন। ২০১৭ সালে তিন মাসে সড়কপথে প্রাণ হারায় প্রায় দুই হাজার মানুষ। এ নিয়ে কমিটির পর কমিটি হচ্ছে, সুপারিশ আসছে, কিন্তু বাস্তবায়ন দেখছি না। দুর্ঘটনা কেন ঘটছে, দোষী কে, সে পরিবহন মালিক হোক, চালক হোক, কর্মকর্তা হোকÑ তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। যাত্রীদের হতে হবে সচেতন। গাড়ির লাইসেন্স দেয়ার সময় নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। গাড়ির মধ্যে তিন ধরনের গাড়ি রয়েছে- হালকা, মাঝারি ও ভারী। লাইসেন্স দেয়ার সময় চালককে বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়ে উপযুক্ততা যাচাই-বাছাই করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। শিশু কিভাবে ট্রাকের ড্রাইভার হয়? বিষয়টি সম্পূর্ণ অনৈতিক। চলাচলের নিয়মকানুন পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও পথচারীকে যথার্থভাবে মেনে চলতে হবে। ট্রাফিক আইন যেভাবে চলছে, তা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবর্তন করতে হবে। শিশু ও বয়স্ক মানুষের পক্ষে ওভারব্রিজ ব্যবহার সম্ভব নয়। সে জন্য সিঙ্গাপুরে জেব্রা ক্রসিং আছে, যেখানে অটোপদ্ধতিতে গাড়ি থেমে যায় পথচারী পারাপারের জন্য, এ দৃশ্য সিঙ্গাপুরে নিজে দেখেছি। সেখানে আন্ডার ও ওভারব্রিজ নেই। সব মানুষই জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হয়। ঢাকায় তিন ডজনের বেশি ওভারব্রিজ আছেÑ এর মধ্যে ওভারব্রিজ কমই সচল। কোটি কোটি টাকা এসব ব্রিজ নির্মাণ খাতে ব্যয় হয়েছে। এটা রাষ্ট্রের অপচয় যেন না হয়। রাজনৈতিক দলের বিজ্ঞাপন হিসেবেই এসব ব্রিজ ইদানীং ব্যবহার হচ্ছে। আইন থাকা সত্ত্বেও চালকেরা গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন; দুর্ঘটনা ঘটার এটাও একটা বড় কারণ। প্রয়োজন ড্রাইভারদেরও হেডফোন ব্যবহার করা। একটানা ১২ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সড়কের যে অবস্থা, তাতে ৮০ মাইল স্পিডে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। মক্কা থেকে মদিনায় সড়কপথে ড্রাইভারকে দেখেছি ৮০ থেকে ১০০ মাইল গতিতে গাড়ি চালাতে। মক্কা-মদিনার সেই সড়কপথ আর ঢাকা-কক্সবাজারের সড়কপথ মোটেও এক নয়। মক্কা-মদিনার রাস্তা কারপেটিং করা, প্রশস্ত প্রায় দুই শ’ হাত। যে রাস্তায় গাড়ি যায়, সেই রাস্তায় গাড়ি আসার সুযোগ নেই। গাড়ি আসা-যাওয়ার জায়গার মাঝখানে বিশাল ফাঁক।
২০১১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অধ্যাপক ড. মো: আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি করে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর অধীনে কয়েকটি সভা হয়। সভায় স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি ৫০টিরও বেশি সুপারিশ করা হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা কমানো যায়নি। শুধু গাড়ির সংখ্যাই বেড়েছে। বেড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। সচেতনতার অভাব, গাড়িচালকের অদক্ষতা, অসাবধানতা ও আইন লঙ্ঘন করার প্রবণতা সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। সড়কে মৃত্যুর মিছিল রোধ করার একমাত্র পথ সড়ক আইনকে যুগোপযোগী ও কার্যকর করা।
harunrashidar@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫