ঢাকা, শুক্রবার,২৮ জুলাই ২০১৭

স্বাস্থ্য

পেটে ইনফেকশন

ডা: আহমদ ফারুক

১৮ এপ্রিল ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৮:৪৮


প্রিন্ট

মল ফ্যাকাশে রঙের। ফেনা ফেনা, দুর্গন্ধযুক্ত অথচ রক্ত বা শ্লেষ্মা নেই। গোশত বা চর্বি খেলে বাড়ে, হজম হয় না। পেটে গ্যাস থাকে সব সময়। খাওয়ার ইচ্ছা নেই। ঢেঁকুর ওঠে প্রায়ই। দিনে দুই থেকে তিনবার পায়খানায় যেতে হচ্ছে। দেহের ওজন কমে যাচ্ছে। দুর্বলতা নিত্যসঙ্গী। পাতলা পায়খানা দীর্ঘস্থায়ী অথবা থেমে থেমেও হতে পারে। এসব কথা আন্ত্রিক পরজীবী জিয়ারডিয়ার। জিয়ারডিয়া প্রোটেজোয়া শ্রেণীর পরজীবী। সংক্রমণ ঘটায় ক্ষুদ্রান্ত্রের ওপরের অংশে। ক্ষুদ্রান্ত্রের উপঝিল্লি ভেদ করে অন্তঃস্থলে প্রবেশ করে চুপচাপ বসে থাকে। যখন ক্ষুদ্রান্ত্রে এ পরজীবীর সংখ্যা খুব বেশি হয়ে যায় তখন তারা সংক্রমণ ঘটায়। ফলে চর্বি জাতীয় জিনিস বিশ্লেষণে ব্যাঘাত ঘটে। পেটে অস্বস্তি, পেট ফাঁপা ও মাঝে মধ্যে তরল পায়খানা দেখা দেয়। এমনকি জিয়ারডিয়া পিত্তথলির প্রদাহ পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
জিয়ারডিয়ার সংক্রমণ ঘটে মলের মাধ্যমে। ঘনবসতি, নোংরা এলাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধ পানির অভাব এ রোগটি ছড়াতে সাহায্য করে। দুর্বল ও অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে এর সংক্রমণ বেশি হয়। বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জের এক বছরের নিচের শিশুরাও এর দ্বারা আক্রান্ত হয়। পায়খানা পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগটি নির্ণয় করা যায়। বিশুদ্ধ পানি পান, সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এ রোগের প্রতিষেধক।
সচরাচর আরেকটি পেটের অসুখ সৃষ্টিকারী পরজীবী হলো এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা। আমাশয় বা অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রির উৎপত্তি এ পরজীবী দ্বারা। আক্রান্ত ব্যক্তি বারবার মলত্যাগ করতে থাকে। পাতলা মলের সাথে শ্লেষ্মা যায়। মলের সাথে রক্ত যেতেও পারে, নাও যেতে পারে। পেটে মোচড়ানো ব্যথা থাকতে পারে। সাধারণত জ্বর থাকে না। খাবার পরই মলত্যাগের ইচ্ছা দূষিত পানি পান বা খাবার খেলে কিংবা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যরক্ষার শৈথিল্যে দূষিত হাত মুখে লাগলে বা দূষিত হাতে কোনো কিছু খেলে বা দূষিত হাত দিয়ে কোনো খাবার গ্রহণ করলে এ পরজীবীর সংক্রমণ ঘটে থাকে। এ জন্য ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে খুব কড়া নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে হাত দিয়ে কোনো কিছু খাবার আগে হাত খুব ভালোভাবে ধুয়ে নেয়া উচিত।
আমাশয়ের আরেকটি ধরন হচ্ছে রক্তামাশয় বা ব্যসিলারি ডিসেন্ট্রি। শিগেলা নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে এ ধরনের আমাশয় হয়ে থাকে। রক্ত ও আমযুক্ত পায়খানা, জ্বর, দুর্বলতা ইত্যাদি লক্ষণ দেখে চেনা যায় ব্যসিলারি ডিসেন্ট্রি। শিগেলা জীবাণু মানুষের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে বৃহদান্ত্রে বাসা বেঁধে রক্তামাশয়ের সৃষ্টি করে। প্রথম প্রথম রোগীর খুব ঘন ঘন পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হয়। পায়খানার সাথে বেশ তাজা রক্তা ও আম বের হতে থাকে। রোগী সাধারণত পায়খানার বেগ সামলাতে পারে না এবং ঘন ঘন পায়খানায় যেতে থাকে। রোগীর পেট ব্যথা ও পায়খানা করার সময় যন্ত্রণা থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, মানে জ্বর দেখা দেয়। রোগীর বমিও হতে পারে।
প্রায় সপ্তাহ চারেক সময় ধরে পায়খানার এ অস্বাভাবিকতা চলতে পারে। মানুষের মুখের মাধ্যমে এ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এ রোগ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নখ ছোট রাখা, খাবার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, ফুটানো পানি পান করা, সালাদ ও কাঁচা ফলমূল, প্লেট ও গ্লাস ইত্যাদি বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধোয়া প্রভৃতি ব্যবস্থা নিলে রক্তামাশায় প্রতিরোধ করা সম্ভব। রোগ নির্ণয়ে মলের বিশেষ কালচার করতে হয়।
সাধারণ পেটের অসুখ হয় ভাইরাস থেকে। পেটের অসুখের সাথে বিভিন্ন ভাইরাসজড়িত, যেমন- রোটা ভাইরাস, অ্যাডেনোভাইরাস, ক্যালসিভাইরাস, করোনাভাইরাস ও অ্যাসট্রোভাইরাস। তবে রোটাভাইরাস সংক্রমণই সচরাচর বেশি দেখা যায়।
ব্যাকটেরিয়া সালমোনেলার কারণে ঘটে পাকাশয়ের ফ্লু বা গ্যাসট্রোএনটারাইটিস। সংক্রমণ প্রধানত হয় নিমান্ত্রে ও মালান্ত্রে। মৃদু সংক্রমণে পাতলা পায়খানা হয়। সংক্রমণে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, বমি হয় ও জ্বর থাকতে পারে।
শিশুদের ডায়রিয়ার জন্য দায়ী ‘এশেরিশিয়া কোলি’। দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এ জীবাণু খুবই বিপজ্জনক। এ ব্যাকটেরিয়া কখনো কখনো বড়দেরও সংক্রমণ ঘটায়।
সংক্রমিত পেটের অসুখ প্রতিরোধের প্রধান উপায় হচ্ছে ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা এবং বিশুদ্ধ পানি পান। সব চেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে খাবার আগে হাত ধোয়ার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫