ঐতিহ্যের জামদানি

শওকত আলী রতন

 

এ অঞ্চলের বস্ত্রশিল্পের সুখ্যাতি সেই প্রাচীনকাল থেকে। মসলিনের মতো জামদানিও বাংলার ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব। বাঙালি নারীর শাড়ির সম্ভারে একটাও জামদানি থাকবে না তা কি হয়। তাই তো সব সময় বিশেষ করে উৎসবের সময় জামদানি শাড়ির প্রতি আগ্রহ ও চাহিদা বেশি দেখা যায়।
জামদানির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিজস্ব বয়নশৈলী এবং এর নকশা। নকশার ওপর নির্ভর করে জামদানি শাড়ির মান ও মূল্য। কম নকশা করা শাড়িগুলোর দাম তুলনামূলক কম হয়। অন্য দিকে জমকালো নকশা করা শাড়িগুলোর দামও হয় বেশি। এই নকশা জামদানি শাড়ির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রবীণ ও নবীন কারিগর থেকে ১০০টির ওপরে জমিনের নকশা ও ৬০টির মতো পাড়ের নকশার নাম জানা যায়। জামদানির নকশাগুলোকে প্রধানত ৩টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়- বুটিক নকশা, তেরছি নকশা ও জালি নকশার বিভক্ত।
বুটিক নকশার মধ্যে রয়েছে- জুঁইফুল, নয়নতারা, কনকতারা, গজমতি, আশরাফি, নয়নসুখ, সন্দেশ, প্রজাপতি, শঙ্খমতি এমনি অসংখ্য নাম। তেরছি নকশার মধ্যে রয়েছে- রাইমা, কলমিলতা, সাবুদানা, ডালিম, আদারদানা, হানাই এমনি অনেক বাহারি নাম। জালি বাইন, মাকড়শার জাল, নয়নবাহার ইত্যাদি নাম রয়েছে জালি নকশার মধ্যে।

জামদানির পাড়ের নকশার মধ্যে রয়েছে পানকি, কান্দি, কলসা, পোনা, গোলাপচর, টাঙ্গাইলস, ময়ূর, পেখম, সাজনী, কাজললতা ইত্যাদি। নমুনাভেদে জামদানির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম যেমন- পান্না হাজার, তোড়াদার, বুটিদার, বেলোয়ারি, হাজার তারা ময়ূরী, নয়নবাহার ইত্যাদি।
নাম দেখেই বোঝা যায় কতটা সমৃদ্ধ আমাদের জামদানি শাড়ি। প্রাচীনকালে জামদানি মূলত অভিজাত শ্রেণীর লোদের ব্যবহার করতে দেখা যেত। এ সময়ে সবশ্রেণীর ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে জমকালো কাজের জামদানির পাশাপাশি হালকা নকশার জামদানি বাজারে প্রচুর দেখা যায়। মূলত সাশ্রয়ী দামে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানোর জন্যই এসব শাড়ি করা হয়। জামদানিতে প্রধানত কার্পাস তুলা থেকে তৈরী সুতা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইদানীং জামদানি তৈরিতে সিল্ক সুতার ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে গুণগত মানের দিক দিয়ে জামদানির জন্য কার্পাস তুলার সুতার বিকল্প নেই।
জামদানি তৈরিতে ব্যবহৃত সুতা রাঙানেরার জন্য আগে এক শ্রেণীর দক্ষ কারিগর ছিলেন, যারা বিভিন্ন ভেষজ রঙের মিশ্রণে এ রঙগুলো তৈরি করতেন। এখন অবশ্য আমদানি করা রঙ ব্যবহার হচ্ছে। একসময় জামদানি তৈরিতে ৮০ থেকে ২০০ কাউন্টের উন্নত মানের সুতা ব্যবহার হতো। এখন ৫০ থেকে ৬০ কাউন্টের সুতা বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতার সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে জামদানি শাড়ির গুণগত মান। সেই সূক্ষ্মতা আবার নির্ভর করে সুতা তৈরির তুলা ও কাটার দক্ষতার ওপর।
জামদানিতে মূলত সুতি ও জরির সুতা ব্যবহার করা হয় এর নকশা ফুটিয়ে তুলতে। রঙের ব্যবহারেও রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি। কন্ট্রাস্ট ও সিঙ্গেল কালার সুতা বেশি ব্যবহার করতে দেখা যায় নকশা ফুটিয়ে তুলতে। তবে কখনো মাল্টিকালারের সুতাও ব্যবহার করা হয় জামদানি শাড়িতে নকশা ফুটিয়ে তুলতে।
আজকাল সুতি শাড়ির জমিনেও জামদানির নকশা ফুটিয়ে তুলে জামদানির ডিজাইন করা হয়।
একসময় জামদানি বলতে কেবল শাড়িকে বুঝালেও ইদানীং এই নকশার ব্যবহার অন্য সামগ্রীতেও হচ্ছে। পাঞ্জাবি, মেয়েদের পোশাক, স্কার্ট, ব্লাউজ, সালোয়ার কামিজ, ওড়না, পর্দা, কুশন কভারসহ অনেক সামগ্রীতে এখন জামদানির নকশা ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.