ঢাকা, মঙ্গলবার,২৫ এপ্রিল ২০১৭

নারী

আমি চাই বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে শব্দটি আর না থাকুক : শারমিন আক্তার

১৬ এপ্রিল ২০১৭,রবিবার, ১৮:০১


প্রিন্ট

ঝালকাঠির মেয়ে শারমিন আক্তার। নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে পরিচয় দিয়েছে সাহস আর বুদ্ধিমত্তার। এ জন্য পেয়েছেন‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ ২০১৭’ বা আইডব্লিউসি পুরস্কার। প্রশংসিত হয়েছে সারা বিশ্বে। এসব নিয়ে লিখেছেন মো: আবদুস সালিম

শারমিন আক্তার। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সত্যনগর গ্রামের দুরন্ত ও সাহসী মেয়ে। শারমিন সত্যিই সাহস ও বুদ্ধিমত্তার কাজই করেছেন। তিনি এখন শুধু নিজ গ্রাম নয়, সারা দেশও নয়, রীতিমতো বিশ্বের দরবারে অতি পরিচিত মেয়ে। সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সফলও হয়েছেন। তবে সফল হতে অনেক কষ্ট হয়েছে বলা যায়। সম্প্রতি শারমিন নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ ২০১৭’ বা আইডব্লিউসি পুরস্কার পান। শারমিন পুরস্কারটি গ্রহণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের হাত থেকে ২৯ মার্চ ২০১৭ তারিখে।
শারমিন বলেন, ‘আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে, এই ছোট বয়সে এত বড় একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাব। আমার এ সংক্রান্ত ঘটনা এখন সবাই জানছে। তাতে হয়তো দেশে শুধু নয়, বিশ্বের অনান্য দেশেও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে। আমার দেখাদেখি এ ব্যাপারে মেয়েরাই আগে এগিয়ে আসবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি চাই, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে শব্দটিও আর না থাকুক। ঘুচে যাক এ সংক্রান্ত যত সমস্যা। একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হচ্ছে- কোনো মেয়ে যেন নিজেকে অসহায় মনে না করেন। এ জন্য নিজের প্রতি যেমন বিশ্বাস রাখতে হবে, তেমনি সাহসও জোগাতে হবে। এসব গুণ থাকলে বলা যায়- শুধু বাল্যবিয়ে নয়, পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক আরো অনেক ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করা সহজ হবে।

শারমিনকে বাল্যবিয়ে দিতে সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তার মা গোলেনূর বেগম। তার বাবা সৌদিপ্রবাসী কবির হোসেন। শারমিন মনে করেন, বাবা দেশে থাকলে হয়তো এ নিয়ে এত বেশি মাথা ঘামাতে বা পরিশ্রম করতে হতো না। বাল্যবিয়ে যে ভালো না তা শুধু আমার বাবা না, অনেক মানুষেরই ভালো জানা আছে। শারমিনের বাল্যবিয়ের ঘটনার জের থানাপুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। শারমিন মনে করেন, অন্যায় বা অপরাধকে কখনোই প্রশ্রয় দেয়া যায় না। এক অপরাধ থেকে বহু অপরাধের সৃষ্টি বা জন্ম হয়। এ জন্য জন্মদাত্রী মাকেও ছাড় দেয়া যায় না। ২০১৫ সালে শারমিন যখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী, তখনই তার মা মেয়ের বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগে। ওই সময়ে তার বয়স ছিল প্রায় ১৪ বছর। তখন তার মা তাকে জানান, একটি ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে। এখন থেকে তার সাথে থাকতে হবে। এ প্রশ্নের উত্তরে শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমার তো বিয়ের বয়সই হয়নি। বিয়ের আয়োজন দেখলাম না। বিয়ে কবুল করিনি, সইও করিনি এ সংক্রান্ত কোনো কাগজ বা দলিলে। আর তা যদি হয় তাহলে আমি কী করে বিয়ের বয়স না হওয়া সত্ত্বেও একজনের স্ত্রী হব?
তিন বছর আগে এ নিয়ে যা ঘটেছে তখনো তিনি বুঝতে পারতেন মা অন্যায় করছে। অন্যায়ের শাস্তি অন্যায়কারীকে পেতে হয়। আর সে কারণে শারমিন তা থেকে দূরে থাকতে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে এক বান্ধবীর কাছে যান। তার কাছে এসব ঘটনা খুলে বলেন। তাদের সিদ্ধান্ত মতে থানায় মামলা করা হয় মা ও এক যুবকের নামে। যে যুবক শারমিনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন।

এ ব্যাপারে শারমিনের পক্ষে অনেকে এগিয়েও আসেন। তাতে তাদের সাথে লড়াই করার শক্তি বাড়তে থাকে। শারমিন বলেন, ‘সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। আমাকে বাল্যবিয়ে দিতে মা যা যা করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সমাজে যা কিছুই গ্রহণযোগ্য না তা করতেও আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। এসব অপকর্মের বিরোধিতা করলে মা কিছুতেই তাতে কর্ণপাত করেনি।’
ওই সময়ে শারমিন এতটাই ছোট ছিলেন, তিনি ভালো করে বুঝতেও পারেননি- বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে কত বড় সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। তখন কি তিনি বুঝতে পেরেছেন, এত অল্প বয়সে এত বড় পুরস্কার, স্বীকৃতি আর পরিচিতি পাব? তিনি বলেন, এ পুরস্কার শুধু আমার জন্য নয়, এ পুরস্কার সব মেয়ের জন্য। শারমিনের কথা ও কাজে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডি এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছেন, তাকে শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এমনকি ইচ্ছা করলে আমেরিকায়ও থাকতে পারবেন। তবে শারমিন বাংলাদেশে থেকেই আরো লেখাপড়া করতে চান। হতে চান আইনজীবী।

তিনি চান আইজীবী হয়ে সব মেয়েদের দুঃখ-কষ্টের পাশে থাকতে। বিশেষ করে বাল্যবিয়ে ঠেকানোর কাজ করা হবে। বাল্যবিয়ে যে কত বড় অপরাধ তা তিনি (শারমনি) বুঝতে পেরেছেন।
শারমিনকে সম্প্রতি নিয়ে যাওয়া হয় আমেরিকার একটি বিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি বর্ণনা করেন নিজের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। ওই বিদ্যালয়ের মেয়েরাও শারমিনকে যথেষ্ট পছন্দ করেছেন। শারমিন বলেন, ‘অনেকে নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তবে তা হবে হেরে যাওয়ার মতো কোনো কিছু বা ঘটনা। অর্থাৎ আমাদের হেরে গেলে চলবে না মোটেই। যদিও কাজের ক্ষেত্রে জয়-পরাজয় থাকে।
শারমনিকে এখন দেখাশোনা করেন তার দাদী দেলোয়ারা বেগম। যেখানেই যান সাথে থাকেন দাদী। তার দাদী বলেন, ‘মা হয়ে মেয়ের এত বড় সর্বনাশ করতে পারল? নাতনী শারমিন এর প্রতিবাদ করেছে বেশ সাহসের সাথে। নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল প্রচুর বাধার মধ্যেও। এখন ওকে নিয়ে গর্ব করে সবাই। আমারও অনেক ভালো লাগছে।
আইডব্লিউসি ৬০টি দেশের ১০০ জনের বেশি সাহসী নারীকে সম্মাননা দেয়। তাদের মধ্যে আমাদের শারমিন বয়সে অনেক ছোট। যারা সমাজের উন্নতি করতে গিয়ে নানা ধরনের অনিরাপত্তা, ঝুঁকি ইত্যাদির সম্মুখীন হয়েছেন- তাদেরই আসার সুযোগ হয়েছে এই আয়োজনে। এবারের এ অ্যাওয়ার্ড ১১তম বছরের। একেকজন একে ধরনের সাহসিকতা ও কৃতিত্বের জন্য পৃথক সম্মাননা পেয়েছেন। কেউ পেয়েছেন মানবাধিকার রক্ষা এবং অ্যাসিড-সন্ত্রাস রোধে, কেউ পেয়েছেন শান্তি রক্ষা এবং জনগণকে একতাবদ্ধ করার কারণে ইত্যাদি।

আইডব্লিউসি পুরস্কার পাওয়ার আগে ২০১৫ সালে স্বর্ণকিশোরী ফাউন্ডেশন শারমিন আক্তারকে প্রদান করে স্বর্ণকিশোরী পুরস্কার। এতে শারমিন বলেন, ‘বাল্যবিয়ে রোধে এখন দরকার এ সংক্রান্ত ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। প্রচুর সচেতনতাও দরকার। অন্যদের মতো আমিও এসব কাজ করতে চাই। কারণ বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের ঘটনা বিশ্বের অনান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এসব কথা শারমিন বলেছেন ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটে অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে ছেলে এবং মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কত তা অনেকেরই জানা নেই। এ কারণেও অনেক সময় বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটে। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে স্পষ্ট বা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, ১৮ বছরের নিচে বা কম বয়সী মেয়ের ও ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫