ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

অম্লমধুর দাম্পত্যের সদর-অন্তর কাহিনী

গোলাম মাওলা রনি

১৫ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৮:৩৫


গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি

প্রিন্ট

নারী-পুরুষের দাম্পত্য নিয়ে মহাকালে কত যে মহাকাব্য রচিত হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পৃথিবীকে ঘিরে বিধাতার যে অতি আশ্চর্য পরিকল্পনাগুলো সদানিয়ত আবর্তিত হয়, এই ধরনিকে উতলা, উৎফুল্ল, অস্থির এবং ব্যস্ত করে রাখে তার মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কই প্রধানতম। এই সম্পর্কের নায়ক সচিবালয়ের পিয়ন হওয়া সত্ত্বেও ঘরে ঢুকে স্ত্রীর সামনে জয়েন্ট সেক্রেটারির মতো ভাবসাব আরম্ভ করে দেন। অন্য দিকে, কর্মস্থলের বড় কর্তারা ঘরে এসে পিয়ন আর্দালির মতো বোবা, অনুগত এবং কষ্টসহিষ্ণু হয়ে ওঠার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। স্বামী সোহাগিনী অসহায় নারীটি সমাজ-সংসারের সব জায়গা থেকে আঘাত পাওয়ার পরও প্রিয়তমের বাহুডোরে নিজেকে যেমন সম্রাজ্ঞাী বানিয়ে ফেলেন, তেমনি বিত্ত-বৈভব, মান-মর্যাদা এবং পদ-পদবির বিচারে সম্রাজ্ঞীর পর্যায়ে থাকার পরও গৃহকোণে মাত্র একজন মানুষের অবহেলার কারণে তামাম সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে নারী মুহূর্তের মধ্যে ঘুঁটে কুড়ানিতে পরিণত হয়ে যায়।
বিয়ের বয়স দশ-বারো বছর হয়ে গেছে এবং গোটা দুয়েক বাচ্চা-কাচ্চা জন্ম দিয়ে সংসারকে ব্যস্ত করে তুলেছে এমন দম্পত্তির খোঁজখবর নিলে আপনি কতগুলো সাধারণ অভিযোগ অহরহ শুনতে পাবেন। স্বামী বলবে- পিয়ারীর যে কী হলো- এখন আমাকে যেন চেনেই না। কাছে ডাকলে রাগ করে। বলে- মিনসের ঢং দেখে আর বাঁচিনে। আমি তো আর সারা দিন তোমার মতো শুয়ে বসে থাকি না যে, শরীর মনে রস জমে টইটম্বুর হয়ে পড়বে। বিনে পয়সার বুয়া পেয়েছ- সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করতে করতে জান চলে যাচ্ছে- আর উনি আছেন রঙ তামাশার ধান্ধায়। এতই যদি শখ তাহলে আরেকটা বিয়ে করে নাও। স্বামীর অভিযোগ শোনার পর আপনি যদি স্ত্রীর বক্তব্য শুনতে চান, তবে তিনি এক নিঃশ্বাসে নিজের কথাগুলো না বলে কিছুতেই আপনাকে ছাড়বেন না-
এই সংসারে এসে আমার হয়েছে যত মরণ। সারা দিন গাধার মতো খাটুনি খাটছি কিন্তু কারো মন পাচ্ছি না। তিনি আমায় দাসী-বান্দী ছাড়া কিছুই মনে করেন না। সারাক্ষণ মেজাজ দেখান আর রাজ্যের যত ফুটানি আর মাতব্বরি সব আমার সাথে। কাজকর্ম না থাকলেও তার ব্যস্ততার শেষ নেই। কিন্তু ঘরে ঢুকেই প্রথম প্রশ্ন- আমি সারা দিন কী করি। আমার মাথার ওপর রাজ্যের কাজ থাকলেও তার ফুটফরমাসে একটু দেরি হলে আর রক্ষে নেই। ও পিয়ারী চা দাও- টিভির রিমোট কোথায়- মোবাইলটা পাচ্ছি না, কান খোঁচানোর কটনবারটা দেও তো। নেইল কাটার যে কোথায় রাখো সময়মতো পাওয়াই যায় না ইত্যাদি শত অভিযোগ এবং ফুটফরমাসের জবাব দিতে দিতে যখন আমার জান যায়, তখন তার শখ হয় আমার হাত ধরে মহব্বতের কথাবার্তা বলার। তার ওসব ঢং দেখলে আমার পিত্তি জ্বলে যায়। কারণ লোকটার চোখ, থুতনি আর মনের বাপ মা নেই- যখন না ইচ্ছে তা করতে একটুও লজ্জা-শরম বা দ্বিধা-সংকোচের বালাই নেই।
পিয়ারী তার অভিযোগনামা পড়তেই থাকবেন- ‘এই সংসারে এসে আমার জীবনটাই শেষ। দু’মুঠো ভাতের জন্য এত কষ্ট আর বরদাশত হয় না। এর চেয়ে অন্যের বাসায় বুয়াগিরি ঢের ভালো। তা না হলে গার্মেন্টসে কাজ করব- আর কিছু না পারলে ভিক্ষে করে খাবো। আমার আব্বা জীবনে কোনো দিন আমাকে দিয়ে কোনো কাজ করাননি আর তার মেয়ের আজ কী দশা। ও আব্বা দেখে যান! আপনার পিয়ারীর কী দশা!’ এ পর্যন্ত বলার পর পিয়ারীর চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়বে এবং কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাবে। তার স্বামী বিষয়টি হালকা করার জন্য বলবেন- আব্বাকে টানছ কেন! তার কী দোষ! তিনি তো তোমার বিয়ে দেননি- তুমিই তো বছরের পর বছর পার্কে ঘুরে, বাদাম বিস্কুট এবং আইসক্রিম খেয়ে ধীরে সুস্থে বিয়ের সিদ্ধান্ত পাকা করেছ!
স্বামীর কথা শুনে পিয়ারী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবেন। মুখ-বুক আর চোখের সব বাধা পেরিয়ে পিয়ারী অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলবেন- ছোট লোকের কথা শোনেন! ছয় টাকার বাদাম, পাঁচ টাকার আইসক্রিম আর রাস্তার পাশের চা আর লাঠি বিস্কুটের খোটা দিতে তোর একটুও লজ্জা করল না। তুই যে একটা জাত ছোট লোক তা আমি বুঝেছিলাম তোর হুড়ুত হুড়ুত শব্দ করে চা খাওয়ার ঢং দেখে। চায়ের পর আবার বেনসন সিগারেট-আহা কি নবাবী- সারা জীবন হুক্কা টানার পর মেয়ে মানুষের সামনে বেনসন ধরালেই ভদ্রলোক হওয়া যায় না। স্বামী ভদ্রলোক একবার আপনার দিকে তাকাবেন আরেকবার নিজের ছেলে-মেয়ের দিকে তাকাবেন। আপনি লক্ষ করবেন, তার ধৈর্যের বাঁধ তখন ভেঙে গেছে- তিনি পিয়ারীর সাথে পাল্লা দিয়ে তুই তোমারি করে মহাভারতের যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। আপনি বিব্রত হয়ে চলে এলেন এবং ছেলে-মেয়েরা ভয়ে নিজেদের কামরায় গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
আপনি হয়তো ভাবলেন এই বুঝি পিয়ারীর সংসার ভেঙে গেল। তার ছেলে-মেয়েরা ভাবল এ যাত্রা নিশ্চয়ই আব্বু-আম্মু এক মাস কথা বলবেন না। কিন্তু ঝগড়ার দিন গভীর রাতে কিসে কী যে হয়ে গেল তা কেবল বিধাতাই বলতে পারবেন। হঠাৎ গোসলখানায় পানির ঝপঝপানির শব্দ। তারপর সাত সকালে পিয়ারী হাসিমুখে শুরু করে দিলেন তার মরণের সংসারকর্ম আর বেচারা স্বামী তার স্ত্রীর হাতের বানানো চা খেয়ে গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে চলে গেলেন জনারণ্যের কর্মক্ষেত্রে।
এবার দাম্পত্যের মধুময় সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলি। স্বামী-স্ত্রীর মোহময় প্রেমের দুর্বার আকর্ষণ আদিকাল থেকে পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সভ্যতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে এক অনন্য ভূমিকা রেখে আসছে। মধুময় দাম্পত্যের কারণে মরুভূমিতে সৃষ্টি হয়েছে কিংবন্তির মরূদ্যান, সমভূমিতে সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়, সমুদ্র-মহাসমুদ্রের বুকে প্রাসাদ ছাড়াও তাজমহল এবং পিরামিড তো রয়েছেই। স্ত্রীর মুখচ্ছবি স্মরণ করে স্বামী হাসিমুখে যেমন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তেমনি সারাটি জীবন কেবল স্বামীর একটি বাসরের স্মৃতি ধারণ করে কবরের যাত্রী হয়েছেন এমন স্ত্রীর সংখ্যাও কম নয়। প্রকৃতির যা কিছু সুন্দর তার সব কিছুই সুখী দম্পতির সাহায্যকারী শক্তি হিসেবে জমিনে বিধাতার আশীর্বাদের নমুনা হয়ে বিরাজ করে। পাখির কলতান, সমুদ্রের গর্জন, নদীর কুলকুল ধ্বনি, বসন্তের বাতাস কিংবা পূর্ণিমার চাঁদ যেমন সুখী দম্পতিদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়িয়ে দেয় তেমনি ফুল, ফল, পাহাড়, সমুদ্র, শস্যদানা থেকে শুরু করে সাগর-ভূতল থেকে সংগৃহীত মণি-মাণিক্য, চুনি-পান্না, হীরা-মতি-কাঞ্চন দম্পতিদের সুখী ও সমৃদ্ধশালী করতে বিধাতার উপহার হিসেবে কাজ করে।
অম্লমধুর দাম্পত্যের অনাদিকালের ঐতিহ্য-ইদানীং লোপ পেতে বসেছে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার কারণে। দেশ-বিদেশের টেলিভিশনের রকমারি অনুষ্ঠানমালা, ফেসবুক, ভাইবার, ইমো প্রভৃতি সামাজিক মাধ্যমের রাহুগ্রাসের সাথে অবৈধ অর্থবিত্ত, হারাম খাদ্য-পানীয়, নির্লজ্জ এবং বেহায়াপনামূলক মেলামেশার আধিক্য এবং অযাচিত পদ-পদবি, ভোগ-বিলাস এবং আরাম আয়েশের বাসনা দিয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অসম প্রতিযোগিতা, অন্যকে টপকে যাওয়ার উদগ্র এবং নীতিহীন বাসনা মানুষকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের বিপর্যয়, ভেজাল খাদ্য এবং নষ্ট সমাজের অকারণ হিংসা, দ্বেষ, কূটনামী-চোগলখোরী এবং শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বলকে অপমান করার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে মানুষের দেহমন প্রায়ই ক্লান্ত বিধ্বস্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে। সে নিজের অজান্তে নিজের ওপর প্রতিনিয়ত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যার অব্যবহিত প্রতিক্রিয়ায় স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে অমানবিক এবং অসামাজিক আচরণ শুরু করে দেয়।
সম্প্রতি বিয়েবিচ্ছেদের হার সারা দুনিয়ায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। আরো ভয়াবহ খবর হলো- একশ্রেণীর মানব-মানবী এখন আর বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হতে চাচ্ছে না। কেউ কেউ বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক বজায় রাখে কেবল যৌনতার জন্য। কেউ বা কেবল সন্তানসন্ততি লাভের জন্য একত্র হয়। একশ্রেণীর নারী-পুরুষ প্রকৃতির বিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গ বর্জন করে চলেছে সদম্ভে। তাদের একাংশ লুত আ: জমানার লোকদের মতো সমকামিতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অন্য অংশটি প্লাস্টিক নির্মিত নারী বা পুরুষ মূর্তির সঙ্গে নিজেদের আদিম অভিলাষ চরিতার্থ করে চলেছে। ফলে পৃথিবীর মানবসভ্যতা নয়- মানবের অস্তিত্বই সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
একটি সর্বাঙ্গীণ সুন্দর বসুন্ধরা নির্মাণে নারী-পুরুষের সুষম সম্পর্ক এবং সুখী দাম্পত্যের বিকল্প নেই। নারী-পুরুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এই সম্পর্কটি স্বাভাবিক রাখার জন্য সবার আগে দরকার নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ। সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিবারকে যথাযথ শিক্ষা, প্রণোদনা এবং অভিভাবকত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে নারী-পুরুষের দাম্পত্যের চিরায়ত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষা বিরাট এক ভূমিকা রাখতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক সম্মানজনক, মর্যাদাপূর্ণ, আকর্ষণীয় এবং আনন্দময় করে তোলার জন্য সব ধর্মমতেই অমূল্য সব নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কালামে পাকে বলা হয়েছে- ‘স্বামী-স্ত্রী হলো পরস্পরের জন্য পোশাকস্বরূপ।’ কুরআনের এই একটি বাণীর আলোকেই স্বামী-স্ত্রী দায়-দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনাদেনা ইত্যাদি নির্ধারিত হয়ে গেছে। একজন মানুষ তার পোশাকের পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা, পোশাকের মান, রুচি, আভিজাত্য এবং পোশাকটিকে শরীরের সাথে মানানসই করার জন্য সে চেষ্টা তদ্বির করে, ঠিক তেমনি যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি করতে পারে তবে তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। শরীর থেকে পোশাক খুলে পড়লে যে বেইজ্জতির আশঙ্কা মানুষকে তাড়িত করে অথবা চলতি পথে হঠাৎ করে পোশাকটি ছিঁড়ে গেলে বা পোশাকে ময়লা আবর্জনা দুর্গন্ধ লেগে গেলে মানুষ যেমন বিব্রত বোধ করে তেমনি দম্পতি যদি নিজেদের ব্যাপারে তদ্রুপ চিন্তাভাবনা করে চলতে পারে তবে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক দিন দিন উন্নত থেকে উন্নততর হতে বাধ্য। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, একে অপরের কাছে জবাবদিহি করা কিংবা পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত, দয়াপরবশ এবং যত্নশীল হওয়ার ব্যাপারে ইসলামে অনেক বিধিবিধান রয়েছে। স্বামীর সন্তুষ্টি ছাড়া স্ত্রী জান্নাতে প্রবেশ অসম্ভব। অন্য দিকে স্ত্রীর প্রত্যয়ন ছাড়া কোনো স্বামী জান্নাতে যেতে পারবেন না।
এখন প্রশ্ন হলো- ধর্মীয় বিধিবিধান, রাষ্ট্রীয় আইনকানুন, সমাজ সংসারের শত সহস্র বিধিনিষেধ এবং সর্বজনীন স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও সুখী দম্পতির সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে কমে যাচ্ছে কেন? আমার মতে, নারী-পুরুষের পারস্পরিক লোভ, লালসা, অত্যাচারী ও দাম্ভিক মনোভাব, অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতির আইনের বিরুদ্ধাচরণ নারী-পুরুষের দাম্পত্য জীবনে বিষবাষ্প ডেকে আনে। নারীর পুরুষ হওয়ার অপচেষ্টা অথবা পুরুষের নারী হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা অনেক বিপর্যয়ের কারণ। প্রকৃতি নারী ও পুরুষের শরীর, মন ও চিন্তার অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে দিয়েছে। নারীর মন একাধিক পুরুষের ভালোবাসা ধারণ করতে পারে কিন্তু তার দেহে একাধিক পুরুষের সংস্পর্শে মারাত্মক বিষক্রিয়া এবং রোগবালাই সৃষ্টি করে। অন্য দিকে, পুরুষের দেহ এ ক্ষেত্রে কিছুটা সহনীয় হলেও তার মন একই সাথে একাধিক নারীর প্রণয় ধারণ করতে পারে না। পুরুষের মন বহুগামিতা বরদাশত করতে পারে না। ফলে পুরুষ শারীরিকভাবে বহুগামী হলেও তার মন একজনের দিকেই ঝুঁকে থাকে। অন্য দিকে, নারীর শরীর বহুগামী না হলেও তার মনের মধ্যে একাধিক পছন্দের মানুষের সরব উপস্থিতি অহরহ হয়ে থাকে।
সুখী দাম্পত্যের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায় একে অপরের প্রতি বেখেয়াল বা উদাসীন থাকা। পরস্পরকে অবজ্ঞা বা অপমান করার প্রকৃতি যেমন ক্ষতিকর তেমনি খোটা দেয়ার অভ্যাসও কম ক্ষতিকর নয়। সংসার জীবনে দ্বৈত নেতৃত্ব অন্যতম অশান্তির কারণ। স্বামী বা স্ত্রী, যেকোনো একজনকে একক নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে। একজন ভালো নেতা যেমন তার অনুসারীদের সাথে পরামর্শ এবং সমঝোতা করে এগিয়ে যান, তেমনি সংসারের নেতাকেও সফলতা লাভের জন্য একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটি এতই স্পর্শকাতর যে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা দাম্পত্যের যেসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন তা জানলে আপনি আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না। এ ব্যাপারে আকর্ষণীয় একটি কেস স্টাডির কাহিনী বলে আজকের নিবন্ধের ইতি টানব।
আলোচ্য ঘটনার নায়ক স্বামী। বিয়ে করার বিশ বছর পর তার মনে হলো তিনি স্ত্রীকে ঘৃণা করেন এবং একটুও ভালোবাসেন না। নিজ ধর্মমতের একটি পবিত্র স্থানে গিয়ে তিনি অঝোর নয়নে সবার জন্য দোয়া করলেন, কিন্তু বহু চেষ্টা করেও স্ত্রীর জন্য দোয়া করতে না পেরে জীবনে প্রথমবারের মতো তার স্ত্রী সম্পর্কে মনটা বিষিয়ে এলো। দু’টি ফুটফুটে সন্তান, সুন্দরী স্ত্রী এবং আপাতসুন্দর পরিপাটি সব সংশয়ের সর্বত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজেও স্বামী বেচারা স্ত্রীর প্রতি ঘৃণার কারণ বের করতে পারলেন না। এ দিকে তীর্থভূমি থেকে ফেরার পর দিন দিন স্বামী বিষণ্ন হয়ে পড়লেন। তার স্ত্রী অনেক কষ্ট করে তাকে শহরের নামকরা একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে গেলেন। বেশ কয়েক দিন আলাপ-আলোচনার পর মনোবিজ্ঞানী স্বামীর মনোজগতের অদ্ভুত এক খামখেয়ালির সন্ধান পেলেন, যা তিনি মনের অজান্তে গত বিশ বছর ধরে মনের মধ্যে পেলেপুষে বড় করে তুলেছেন।
ঘটনাটি ঘটেছিল বিশ বছর আগে। দম্পতিটির তখন সবে বিয়ের কথা পাকা হয়েছে। স্বামী বয়সে যুবক ছিলেন এবং স্ত্রী ছিলেন কিশোরী এবং চপলা। এ অবস্থায় স্বামী তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে নিয়ে গেলেন বাগদত্তাকে দেখতে। ইচ্ছে ছিল- সুন্দরী বাগদত্তাকে দেখিয়ে প্রিয় বন্ধুকে আশ্চর্যান্বিত করে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে তিনি বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়লেন। হবু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শুনলেন বাগদত্তা পাশের ফ্ল্যাটে গেছেন বান্ধবীদের সাথে গল্প করার জন্য। তার আগমনের খবর শোনার পরও বাগদত্তা চটজলদি না এসে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে এলেন। এ ঘটনায় ভদ্রলোক মনে মনে ভীষণ অপমাণিত বোধ করলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন, বিয়ের পর তিনি এর একটি বিহিত করে ছাড়বেন। গত বিশ বছরের দাম্পত্যে তিনি আসলে বিহিত করার কোনো সুযোগই পাননি। নিজের প্রবল ব্যক্তিত্ববোধ এবং মর্যাদার কারণে স্বামীপ্রবর কোনো দিন ঘটনাটি স্ত্রীকে বলতেই পারেননি। ফলে তার না বলা বেদনা বাড়তে বাড়তে তাকে রীতিমতো মানসিক রোগী বানিয়ে ফেলেছে।
উপরিউল্লিখিত ঘটনা থেকে মনোবিজ্ঞানীরা অনুসিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন, দাম্পত্য জীবনের খুনসুটি, নিত্যকার খিস্তিখেউর এবং চিরায়ত অভাব-অভিযোগ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি প্রমাণ করে যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ভালোবাসেন এবং পরস্পরের কাছে আরো বেশি কিছু আশা করেন। কাজেই ঝগড়াঝাঁটি ও মতবিরোধ বন্ধ হয়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। কারণ সম্পর্ক না থাকলে যেমন ঝগড়া করা যায় না, তেমনি ঝগড়া করার জন্যও একটি ন্যূনতম সম্পর্কের দরকার পড়ে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫