ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

সহোদর

স্বাধীন পারভেজ

১৫ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৭:৪৮


প্রিন্ট

কপাল যখন পোড়ে তখন সব দিক থেকেই বিপদ আসতে থাকে। নববর্ষের সামনে এসে মোটরসাইকেল নষ্ট হয়ে পাক্কা চার হাজার টাকা গচ্চা গেল। ওই দিকে বউ গাল ফুলিয়ে বসে আছে, এপ্রিলের প্রথম দশ দিন পার হয়ে যাচ্ছে অথচ এখনো তাকে শপিংয়ে নিলাম না কেন? অথচ অফিস থেকে জানিয়ে দিয়েছে এ মাসে বেতনের চেয়ে বেশি যে অগ্রিম টাকা লোন করার জন্য আবেদন করেছিলাম তা মঞ্জুর হয়নি। ফলে বেতনের টাকা থেকেই এবারের বৈশাখের ঝক্কিটা পার করতে হবে।
ঠিক এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে বড় আপা অসুস্থ অবস্থায় আমার বাসায় এসে উঠলেন। শহরে বড় ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্য। কী আর করা? পয়লা বৈশাখের ঝকঝকে সকালে বিরস মুখে দজ্জাল বউ আর অসুস্থ বোনকে নিয়ে শহরে ঘুরতে বের হলাম। রাস্তাজুড়ে বাহারি বৈশাখী মেলা দেখে আপা খুশিতে লাফিয়ে ওঠেন। আমারও দারুণ ভালো লাগে সেসব দেখে। ধুলায় আর ইটকাঠের এ যান্ত্রিক শহরে এমন রঙিন প্রাণোচ্ছল আয়োজনে কারো বা মন ভালো না হয়ে পারে? আমি খুশিমনে দুই ভুবনের দুই নারীকে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে মেলায় ঘুরতে থাকি। একটার পর একটা স্টলে নজর বুলিয়ে যাই সাগ্রহে। এভাবে কিছুক্ষণ অস্থির ঘোরাঘুরির পর বড় আপা একটা অদ্ভুত কাজ করে বসলেন। আচমকা আমার মুঠো থেকে নিজের হাতখানা বের করে নিয়ে দ্রুততার সাথে পাশের দোকানটায় ঢুকে পড়লেন। অবাক! সে দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম রাবারের তৈরি একটা খেলনার সাপ হাতে নিয়ে বেশ উত্তেজিত ভঙিতে নাড়াচাড়া করছেন তিনি। আমাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্বিগুণ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন মণি, নিবি এটা? কিনে দেবো?
এক মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তার কথা শুনে। ঘটনার আকস্মিকতায় বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন বড় আপা স্বয়ং; এমনকি আমার বউও। পরমুহূর্তে দ্বিধা কেটে গেলেই বড় আপা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। দৃষ্টি সরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু আমি ফিরে গিয়েছিলাম ত্রিশ বছর আগে, আমার সেই ছোট্টবেলায়। একবারে স্পষ্টভাবে মনে ভাসছে, ঠিক এমনই একটা খেলনা সাপ গ্রামের মেলা থেকে কিনতে পেরেছিলাম না বলে কত যে কেঁদেছিলাম আমি। বাবাহীন সংসারে বড় আপার সেলাই মেশিনের চাকায় ভর করে চলত আমাদের অভাবী পরিবার। মাত্র বিশটি টাকা জোগাড় করতে না পেরে অক্ষমতার দুঃখে ওড়নায় মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলেন তিনি, পাটকাঠির বেড়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে। আজ যেন সেই দৃশ্যগুলো পূর্ণ জীবন ফিরে পায় আমার চোখের তারায়। আমি ভিজতে থাকি আবেগি স্মৃতির আর্দ্রতায়।
ভেজা চোখের দৃষ্টির অবাক চাহনিতে দেখছিলাম প্রিয় বোনকে। কী আশ্চর্য, সেই ত্রিশ বছর আগের মমতাময়ী বড় আপা কি তাহলে আজো সেভাবেই বুকভরা দরদ নিয়ে বেঁচে আছেন এ রুগ্ণ, জীর্ণ দেহটির মাঝে! পূর্ণ বয়সী এ যুবক আমার মাঝে আজো কি তিনি দেখতে পান তার আদরের ছোট ভাই, শিশু মণিকে?
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আমি তাকিয়ে থাকি মানুষটির দিকে। সম্বিত ফিরে পেয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই তার কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেনই। আহা! কি তৃপ্তি? সে স্পর্শের মাথায় যেন প্রাণ ফিরে পায় আমার প্রতিটি ইন্দ্রিয়। বড় আপা, এ তো আমার বড় আপা। যার অক্লান্ত পরিশ্রমে বেঁচে থেকেছি, বেড়ে উঠেছি আমি। যার অপত্য স্নেহে টইটম্বুর থেকেছে আমার মন। এ মানুষটির ত্যাগের ফলেই তো গড়ে উঠেছে আমার দেহের প্রতিটি রক্তকণিকা। অস্থিমজ্জা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, প্রিয় বোনটির ঘনিষ্ঠ হতে থাকি আমি। আরো ও...।
এরপর কেঁটে গেছে বহু বছর। জীবনে যোগ হয়েছে আরো অনেক বৈশাখের অভিজ্ঞতা। কিন্তু আজ, এখন অবধি সেটাই ছিল আমার এই জীবনের শ্রেষ্ঠ পয়লা বৈশাখ। বউ এবং আমি দু’জনেই মেতে উঠেছিলাম বড় আপাকে নিয়ে। আপা তো লজ্জায় জড়ো, এটা খাবে না, ওটা নেবে না বলে শুধু আপত্তি করছিলেন। কিন্তু আমি তা শুনিনি। নিজের সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম আপাকে খাওয়াতে। উপহার দিতে। সন্তুষ্ট করতে। সেদিন আরো অবাক হয়েছিলাম এ ব্যাপারে আমার স্ত্রী মৌমিতার আগ্রহ দেখে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫