ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

রুজভেল্টের চার স্বাধীনতা

আলমগীর মহিউদ্দিন

১৩ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:২০


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রিন্ট

যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট তার তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার প্রাক্কালে ৬ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে জাতির উদ্দেশে তার ভাষণে আমেরিকানদের ‘চার স্বাধীনতা’র কথা বলেছিলেন। সেই থেকে বিশ্বব্যাপী এটা ‘চার স্বাধীনতা’ বলে পরিচিত, আলোচিত এবং গৃহীত।
স্বাধীনতা এমন একটি বিষয় যা সবার প্রিয় এবং সম্ভবত একে সংজ্ঞায়িত করা সবচেয়ে কঠিন। কেননা, যে অত্যাচারী সে স্বাধীনতা চায় এবং যে অত্যাচারিত সেও স্বাধীনতা চায়। মার্কিন আইনজ্ঞ পল বুশেট তাই বলেছেন, ‘যদি কাউকে জিজ্ঞেস করো- মহান দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন বাস করো, সে বলবে, কেননা আমরা স্বাধীন।’ বুশেট বলেছেন, ‘স্বাধীনতার সংজ্ঞা দেয়া তাই কঠিন। মনে হয়, আসলে এটা মনের মধ্যেই বিরাজ করে, বাস্তবে নয়।’ রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য বিষয়টাকে বেছে নিলেন এবং সর্বপ্রথম চার স্বাধীনতার কথা বলে এর সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করলেন। এই চারটি স্বাধীনতা হলো (১) বক্তব্যের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব স্পিচ), (২) ধর্ম পালনের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব ওয়ারশিপ); (৩) দারিদ্র্য থেকে মুক্তি (ফ্রিডম ফ্রম ওয়ান্ট) এবং (৪) ভয় থেকে মুক্তি (ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার)। রুজভেল্ট তার নির্বাচনী প্রচারের মূল স্তম্ভ হিসেবে বিষয়গুলোকে নির্বাচন করেছিলেন। কারণ তিনি সবার মনকে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন, স্বাধীনতা সবাই চায়। তাই এই চাওয়াকে অত্যন্ত পরিচিত অবস্থা ও বিষয়গুলোর সাথে যুক্ত করে নির্বাচকদের তার দলে শামিল করার জন্য প্রচার চালালেন।
৭৬ বছর পর আজো এ চার স্বাধীনতা বিশ্বের কোথায় আছে এবং কারা ভোগ করছে, সে প্রশ্নের সঠিক জবাবের আশায় আলোচনা-সমালোচনার বিরতি নেই।
ঐতিহাসিক জেফরি এনজেল বলেছেন, যখন মানুষ স্বাধীনতার কথা বলে, তখন বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন স্বাধীনতার কথা বলে। যেমন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে সে বছরের ৯/১১ আক্রমণের পরের এক বক্তৃতায় ১৯ বার স্বাধীনতা শব্দটি ব্যবহার করে এ ঘটনার জন্য বিন লাদেনকে দায়ী করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও আক্রমণ করার কথা ঘোষণা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এ যুদ্ধের কথা বলেন। তার জবাবে বিন লাদেন তার টেপ করা ভাষণ প্রচার করেছিলেন। সেখানে তিনি আমেরিকাকে নির্যাতনকারী হিসেবে অভিহিত করে স্বাধীনতার জন্য তার সমর্থকদের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
একটা সর্বজনীন উক্তি হলো ‘একজনের স্বাধীনতা, অপরের অধীনতা। শাসক তার শাসনের স্বাধীনতা চায়। তাই তার প্রজাদের নিরবচ্ছিন্ন বাধ্যতা দাবি করে। আবার প্রজারা শাসকের অত্যাচার বা অগ্রহণীয় শাসন থেকে স্বাধীনতা চায়।’ একজন রাজনীতিবিদ বা আন্দোলনকারী বা বিচারক কোনো ভালো কথা বা বক্তব্য দিলেন, তা মানা বা না মানার স্বাধীনতা সবাই চায়। অর্থাৎ স্বাধীনতার অর্থ বহুমুখী। অন্যায়কারী যেমন তার অগ্রহণীয় কর্মকাণ্ড চালানোর স্বাধীনতা চায়, তেমনি এর ভুক্তভোগীরা তা থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বাধীনতা চায়।
এই বহুমুখিতার সমাধানের লক্ষ্যে রুজভেল্ট এই চার স্বাধীনতার কথা বলেছেন। তিনি একটা সর্বগ্রহণীয় প্রতিচ্ছবি তৈরি করেন, যার বর্ণনা হলো সেই সাত অন্ধের হাতির বিবরণ। তবে তার দেয়া এই সর্বগ্রহণীয় বর্ণনার আসল ছবিটির মোহময়ী হয়ে আছে এখনও, সর্বত্র, বিশ্বব্যাপী। রুজভেল্ট তার বক্তব্যে দু’টি শব্দ ব্যবহার করেছেন। ‘সবাই এবং সর্বত্র’। অর্থাৎ এই স্বাধীনতা সবাই ভোগ করবে এবং সর্বত্র বিরাজ করবে।
তিনি মূলত মার্কিন জনগণের উদ্দেশে বললেন, তার বক্তব্য সমগ্র বিশ্বের; আলোচকরা এটা সবার জন্য প্রযোজ্য বলে গ্রহণ করেছেন। রুজভেল্ট বলেছিলেন, এ স্বাধীনতাগুলো ছাড়া আমেরিকার কোনো অর্থ নেই, আশাও নেই। আর এগুলো ‘বিশ্বে সর্বত্র এখন আক্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেন।
এবার চার স্বাধীনতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। প্রথমটি হলো বক্তব্যের স্বাধীনতা, যা রুজভেল্টের ভাষায় ‘সবচেয়ে মূল্যবান’। ‘ইনডেক্স অন সেন্সরশিপ’ তাদের ২০১৩ সালের বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, আজ বক্তব্যের স্বাধীনতা সত্যিকারভাবে কোথাও নেই।
বক্তব্যকে বাধা দেয়া অথবা সীমিত করার চেষ্টা ও কর্মকাণ্ড বহুমুখী। এগুলো সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক হয়। যেমন দারিদ্র্য, বৈষম্য, আইনি বাধা, সাংস্কৃতিক বাধা-নিষেধ, রাজনৈতিক টানাপড়েন বক্তব্যের স্বাধীনতাকে সাধারণত খর্ব অথবা সীমিত করে। ‘ইনডেক্স’ ভারতের দলিতদের অবস্থা বর্ণনা করে একটা উদাহরণ দেয়। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দলিতদের বক্তব্য আসে না, সামাজিকভাবে তারা অপাঙ্ক্তেয় এবং রাষ্ট্র তাদের কোনো প্রতিবাদও করতে দেয় না। ইনডেক্স বলেছে, বিশ্বের সংখ্যালঘুরা সাধারণত বক্তব্যের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হলেও ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে তারা আবার প্রবল। আর এই পথ ধরেই একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী বক্তব্যের স্বাধীনতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো- এই স্বাধীনতা এখন বিশ্বে নেই বললেই চলে। এই অবস্থা প্রথম বিশ্বে থাকলে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্বে কত ভয়াবহ হতে পারে, সে প্রশ্ন করেছে ইনডেক্স। ৭৬তম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘নেশন’ পত্রিকা এক চমৎকার সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে, ‘বক্তব্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করার নতুন ফর্মুলা হলো বিকৃত বক্তব্য বিপুলভাবে প্রচার করা এবং তার প্রতিবাদ বা সমালোচনাকে স্তব্ধ করে দেয়া। উদ্দেশ্য, সত্য যেন নিশ্চুপ থাকে।’ সম্পাদকেরা বলেছেন, ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলমানদের অবস্থার সত্য বর্ণনা করা এখন প্রায় অসম্ভব। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তারা বলেছেন, প্যারিস ও সান বার্নারডিনোর বোমা আক্রমণের ধুয়া তুলে বিশ্বে মুসলমানদের যে বীভৎস ছবি আঁকা হয়েছে এবং হচ্ছে, তা একটি অনন্য উদাহরণ। অর্থাৎ রুজভেল্টের প্রথম স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত। আসলে শিক্ষার বিস্তৃতি ছাড়া এই স্বাধীনতা ভোগ করা অসম্ভব।
দ্বিতীয় স্বাধীনতা হলো, ধর্মীয় স্বাধীনতা। বিশ্বের গণমাধ্যমে এর যে ছবি দেখা যায় তা আংশিক এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিমূলক। সারা বিশ্বেই এখন ইসলাম ধর্ম প্রতিপালন করার বিষয় নানা বাধার সম্মুখীন। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন ‘সাম্প্রদায়িক’ কথাটি শুধু মুসলমানদের ব্যাপারেই ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্য গোষ্ঠীকে সাম্প্রদায়িক বলা হয় না। এর অনেক কারণের মাঝে একটি প্রধান হলো ইসলাম একটি সুন্দর-নির্মল-যৌনবিরোধী জীবনব্যবস্থায় বিশ্বাস করে এবং নৈতিকতাকে সবার ওপরে স্থান দেয়। অন্য দিকে, বর্তমান বিশ্বে নানা ইজমের বদৌলতে নৈতিকতা-সত্য-সামাজিক জীবন বিপর্যয়ের মুখে। রুজভেল্টের দ্বিতীয় স্বাধীনতার কথা তাই এখন গৌণ। ইসলাম ও মুসলিম বর্তমান বিশ্বে প্রচারণার প্রধান বলি। যে সেøাগান আর বক্তব্য এখন সবাইকে বলতে বাধ্য করা হচ্ছে তা হলো, কুরআন সহিংসতা প্রচার করে এবং সব মুসলমান সন্ত্রাসী নয়; তবে সব সন্ত্রাসীই মুসলমান। এভাবে বিশ্বের এক জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে। এমনকি মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতেও এই সেøাগান ও বক্তব্য দেয়া সহজ এবং এর প্রতিবাদ করা কঠিন। উদাহরণের জন্য বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
রুজভেল্টের তৃতীয় স্বাধীনতা, ক্ষুধা থেকে মুক্তি। প্রথম বিশ্বসহ সর্বত্রই এটা সুদূরপরাহত। এ স্বাধীনতাই আসলে সব স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। কেননা জীবিতই যদি না থাকা যায় তাহলে স্বাধীনতার মূল্য কী? ক্ষুধা থেকে মুক্তিই শুধু এটা নিশ্চিত করতে পারে। অথচ বিশ্বব্যাপী ‘ক্ষুধা থেকে মুক্ত’ করার সেøাগান দিয়ে ক্ষুধাকে দীর্ঘায়িত করছে। সামাজিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ক্ষুধার দীর্ঘ ছায়া এখন বিরাজমান।
সর্বশেষ স্বাধীনতা হলো ‘ভীতি থেকে মুক্তি’। পুরাকাল থেকেই শাসক ও ক্ষমতাবানরা ‘ভয়’কে তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ ও ক্ষমতার ভিত গেড়েছে। এখন এর অগ্ন্যুৎপাত ঘটছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে এর প্রকার, প্রসার ও প্রয়োগের এমন বহুমুখিতার সুযোগ আর কখনো আসেনি। ফলে সাধারণ মানুষ ইতিহাসে এমন শৃঙ্খলাবদ্ধ কখনো হয়নি। একটি উদাহরণই যথেষ্ট। একজন প্রযুক্তিবিদ হাজার হাজার মাইল দূরে বসেই জানতে পারছেন তার প্রার্থিত মানুষটি কোথায় এবং সেখানে বসেই তার কর্ম সম্পাদন করতে পারছেন। এখন ‘ব্যক্তিগত’ বলে কিছু নেই। যতটুকু আছে তা সরকার, করপোরেট সংস্থা এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠী কেড়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় মগ্ন। কখনো আইন তৈরি করে বা কখনো নিয়মনীতির বন্ধন সৃষ্টি করে।
এক কথায় স্বাধীনতা বলতে মানুষের মনে যে প্রতিচ্ছবির জন্ম নেয় তা কখনোই ছিল না। গবেষকরা বলেন, পুরাকালে মানুষ সত্যিকারের স্বাধীন ছিল। তখন সে প্রকৃতির সাথে বাস করে, প্রকৃতির মতো উদার ও স্বাধীন ছিল। তথাকথিত সভ্যতার আগমনের সাথে সাথে মানুষ শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে থাকে। এখন শৃঙ্খলের অবয়ব কখনো দৃশ্যমান, কখনো বা অদৃশ্য! ফলে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার প্রয়োজন আগের চেয়ে বেশি হলেও তা প্রকাশের ক্ষেত্র খুবই সীমিত।
প্রশ্ন উঠতে পারে, রুজভেল্ট এ চার স্বাধীনতার কথা কেন বলেছিলেন? এর জবাব দিয়েছেন প্রফেসর ড. জেফরি এ এনজেল তার ‘এফডিআর স্পোক ফর এভরিওয়ান ইন দি ওয়ার্ল্ড’ নিবন্ধে। রুজভেল্টের প্রশংসা করে একটি চমৎকার মন্তব্য তিনি করেছেন। বলেছেন, রুজভেল্ট স্বাধীনতার ধারণা দিয়ে হয়ে গেলেন ‘আমেরিকার প্রথম ডিক্টেটর।’ কারণ এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি আমেরিকার নেতৃত্ব দিলেন বিশ্বায়নে এবং সেই সাথে মার্কিন জনগণকে বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রের তাঁবেদার বানালেন। জনগণের বহু মৌলিক অধিকার কেড়ে নিলেন। আসলে আমেরিকাকে চারটি প্রার্থিত স্বাধীনতার কথা যদি না শোনানো হতো হয়তো মার্কিন জাতি এবং বিশ্ব তার সাথে এক হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিত না।
স্বাধীনতা একটি ব্যাপক উপলব্ধি, যা শুধু নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ও অধিকারই নয়, বরং অপরের ইচ্ছা ও সুবিধার জন্য কিছু ত্যাগও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই এই চার স্বাধীনতার সাথে নতুন চার স্বাধীনতার দাবি উঠেছে। তা হলো, নতুন সৃষ্টির স্বাধীনতা, প্রতিটি মানুষ নিশ্চিত ও সার্বভৌম হবে, দীর্ঘ জীবন বিষ্ণহীনভাবে উপভোগ করা যাবে এবং মহাবিশ্বকে অনুসন্ধান করা যাবে। এর মাঝে সুস্থ জীবনের আকাক্সক্ষা সর্বাগ্রে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫