ঢাকা, সোমবার,২৯ মে ২০১৭

বিবিধ

চিত্রকলায় বৈশাখ

ড. আব্দুস সাত্তার

১৩ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:১৩


প্রিন্ট

দিন গণনার, মাস গণনার কিংবা বছর গণনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি আছে দুনিয়াব্যাপী। এক এক দেশের মানুষ এক একভাবে গণনা করেন। আমাদের দেশের মানুষ বাঙালি বলে বাংলাকেই পছন্দ করেন। ভারতের পশ্চিম-বাংলার মানুষও আমাদের মতোই বাংলায় কথা বলেন এবং সেজন্য তারাও বাংলা এবং বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তবে ইংরেজরা প্রায় ২০০ বছর আমাদের ওপর চেপে বসে থাকায় এবং তাদের ভাষা ইংরেজিকে চাপিয়ে দেয়ায় আমরা উভয় বাংলার বাঙালিরা অনেকটা দোআঁশলায় পরিণত হয়েছি। অর্থাৎ কিছুটা বাঙালি কিছুটা ইংরেজ ভাবাপন্ন হয়েছি। ইংরেজদের ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সেই যে আমাদের দুর্বলতা, সেই দুর্বলতাকে কাটিয়ে সবল ও সতেজ হতে পারিনি আজো। তাই বৈশাখ মাস এলেই উভয় বাংলায় বাংলা বর্ষবরণের উদ্দেশ্যে কিছুটা চাঞ্চল্য লক্ষ করা যায় বাঙালি শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এ প্রবণতা আবার গ্রামের সাধারণ মানুষদের মধ্যে লক্ষ করা যায় না। যতটা শহুরে শিক্ষিত সুবিধাবাদী তথাকথিত বাঙালিদের মাঝে লক্ষ করা যায়। কারণ এই শ্রেণীর মানুষ ঘটা করে আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে একদিনের বাঙালি সাজেন। আর এই বাঙালিদের বাঙালিয়ানার লোক দেখানো কর্মকাণ্ড প্রচারের জন্য প্রচার মাধ্যমগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিন্তু গ্রামের সাধারণ বাঙালি সম্প্রদায়ের হালখাতা এবং মেলার যে আয়োজন করা হয় সে বিষয়ে তারা কোনো খবরই রাখে না। কারণ তারা খাঁটি বাঙালি এবং তাদের কথাবার্তায়, কাজেকর্মে, আচার-অনুষ্ঠানে রঙ-ঢঙের আয়োজন থাকে না। একদিনের বাঙালি সাজবার মেকি আয়োজন থাকে না। কিংবা পান্তা ইলিশ খেয়ে বাঙালিত্ব প্রকাশের কোনো আয়োজনও থাকে না। গ্রামের সাধারণ মানুষ ধর্মকর্ম এবং ধর্মকর্ম সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। তারা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রঙ বদলানোর সংস্কৃতি তারা অনুসরণ করেন না। শহরে ইদানীং বৈশাখ পালনের যে ঘনঘটা, যে বিশাল আয়োজন এবং প্রচারের প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় সে বিষয়ে গ্রামের মানুষ কোনো খবরই রাখেন না। তবে ইদানীং প্রচারমাধ্যমের বদৌলতে বিষয়গুলো গ্রাম পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলা ভাষাভাষী বাঙালিদের নিকট বৈশাখ মাসের গুরুত্ব অনেক। যদিও পুরোটা বছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারেই সকল কর্মকাণ্ড চলে। তথাপি বাংলা বর্ষবরণের নামে ব্যাপক আয়োজন করা হয় ঢাকা শহরে। আন্তরিকতার ছোঁয়াও থাকে এসব কর্মকাণ্ডে। যেমন, রমনার বটমূলে আয়োজিত সঙ্গীতানুষ্ঠান। সূর্যোদয়ের আগেই শুরু হয় এ অনুষ্ঠান এবং সূর্যোদয়ের পরে পরেই শেষ হয়ে যায়। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আয়োজিত এ অনুষ্ঠান বেশ জনপ্রিয়। এখন ইতিহাসে পরিণত হয়েছে এ অনুষ্ঠান। বর্ষবরণের শুরুটাই হয় এই সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে। রমনার বটমূলের এ অনুষ্ঠান শেষ হলেই জমে উঠে চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রার অনুষ্ঠান। কিন্তু এ অনুষ্ঠানটিও ক্ষণস্থায়ী। কয়েক গজ রাস্তা প্রদক্ষিণের মধ্য দিয়েই শেষ হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার অনুষ্ঠান। এরপর দিনভর মানুষের পদচারণায় প্রাণবন্ত থাকে চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণ। কিন্তু আজ থেকে ৮২ বছর পূর্বে লক্ষ্মৌ প্রবাসী বাঙালিদের বৈশাখের অনুষ্ঠান পালন করতে দেখা গেছে ভিন্নভাবে। সেখানে অনুষ্ঠান হয়েছে দুই দিনব্যাপী। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন ভারতের বাঘা বাঘা পণ্ডিতরা। যেমন- কবি-ব্যারিস্টার শ্রীযুক্ত অতুল প্রসাদ সেন, ড. রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, ড. রাধা কমল মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক শ্রীনির্মল কুমার সিদ্ধান্ত, শ্রী অসিত কুমার হালদার, ড. নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। এদের মধ্যে অধ্যাপক রাধা কমল মুখোপাধ্যায় প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছেন, বাঙালির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রক্ষা করার জন্য এ ধরনের উৎসবের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবে সকল বয়সের মানুষের জন্য নানা ধরনের আয়োজন ছিল। এর মধ্যে ছোট ছেলেমেয়েদের ও তরুণদের জন্য ছিল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। ছিল গানবাজনা, ম্যাজিক, কৌতুক, ব্যায়াম ও অভিনয়ের ব্যবস্থা।
দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিল্পী এবং স্থানীয় সরকারি চারু ও কারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ শ্রী অসিত কুমার হালদার। তিনি সভাপতি হিসেবে সাহিত্য ও শিল্পের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। সমাজ জীবনে ও সাহিত্যে যে চিত্রকলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তিনি তার বক্তব্যে সে কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। গ্রীষ্মের তাপদাহের শেষে বৈশাখ বর্ষার যে বারতা নিয়ে আসে সেই বর্ষা নিয়ে শিল্পী অসিত কুমার হালদার চিত্র এঁকেছেন। ঘন কালো ও হালকা মেঘে ঢাকা আকাশ। বাড়ির বারান্দায় উদ্বিগ্ন বধূ। প্রবল বাতাসে বৃক্ষাদির শাখা দোলায়িত। এসব বিষয় সমন্বয়েই শিল্পী অসিত কুমার হালদার ‘ঋতু-বর্ষা’ নামক অর্থবহ এই চিত্রটি এঁকেছেন।
অসিত কুমার হালদার ভারতের বিখ্যাত শিল্পী পরিবারের সদস্য। তার মা সুপ্রভা দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নি এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসিত কুমারের মামা। অসিত কুমার নিজেও একজন খ্যাতিমান শিল্পী। তিনি জয়পুর রাজকীয় আর্ট স্কুল, লক্ষ্মৌ সরকারি আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফট স্কুল এবং শান্তিনিকেতনের কলাভবনে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেছেন। এই মহান শিল্পীর সভাপতিত্বে শেষ হয় দুই দিনব্যাপী বৈশাখের অনুষ্ঠান। দ্বিতীয় দিনে ছোট ছোট মেয়েদের গানের অনুষ্ঠান, প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠের প্রতিযোগিতা, সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা, শিল্পকর্ম প্রদর্শনী এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘রক্তকরবী’ প্রভৃতির আয়োজন ছিল।
পয়লা বৈশাখের দিনটিকে প্রাণবন্ত করতে উল্লিখিত বিষয়গুলোর আয়োজন বাংলাদেশেও করা যেতে পারে। তাতে সব শ্রেণীর মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে অনুষ্ঠান অধিকমাত্রায় অর্থবহ রূপ লাভ করতে সক্ষম হবে। বৈশাখ বিষয়ে নানামুখী আলোচনা এবং চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা সম্ভব হবে। শুধু তা-ই নয়, অহেতুক এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো এবং শৃঙ্খলা বিঘ্নকারীদেরও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধরে রাখা সম্ভব হবে। এদিন বৈশাখ বিষয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা যেতে পারে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নিজ উদ্যোগে একসময় বৈশাখ বিষয়ে চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। আমি নিজেও সেই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি। যদিও আমি তখন প্রাচ্যকলা বিভাগের ছাত্র। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া আমার চিত্রের বিষয় ছিল বৈশাখী ঝড়ো বাতাসে বিপর্যস্ত এক রমণীর মুখ। ঝড়ো-বাতাসে রমণীর এলোমেলো চুলই ছিল বৈশাখের প্রতীক।
বৈশাখী ঝড়ে বিপর্যস্ত দুই রমনীর চিত্রের কথা নিশ্চয়ই অনেকের স্মরণে আছে। চিত্রটি এঁকেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। প্রচণ্ড ধুলা-বালুপূর্ণ ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির ঝাঁপটা ঠেলে লাল ও সাদা শাড়ি পারহিতা রমণীদ্বয় এগিয়ে চলেছে বাড়ির উদ্দেশে। প্রায় অন্ধকার প্রকৃতি। সামনে তাকিয়ে পথ চলাও দুষ্কর। তাকালেই ধুলাবালু আর কাঁকর চোখে আঘাত হানে। ফলে রমণীদ্বয় হাত দিয়ে চোখ ঢেকে মাথা নুইয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ায় রমণীদের শাড়ি পেছন দিকে পৎপৎ শব্দে উড়ছে। প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশকে অতিক্রম করে ঘরে ফেরার ‘কালবৈশাখীর ঝড়’ নামক এ চিত্রটি শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন এঁকেছেন ১৯৫০ সালে।
আরো অনেক শিল্পী বৈশাখকে নিয়ে চিত্র এঁকেছেন। এসব চিত্র সমন্বয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করলে বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানটি অর্থবহ ও প্রাণবন্ত হতে পারে। হতে পারে আরো অনেক বেশি আনন্দদায়ক।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫