ঢাকা, মঙ্গলবার,২৫ এপ্রিল ২০১৭

বিবিধ

নববর্ষ দেশে দেশে

সৈয়দ মাহবুব আলম

১৩ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:১১


প্রিন্ট

 ১৮৮৬ সালের আগে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় রোজ প্যারেডে ভেরি হান্ট ক্লাবের সদস্যরা তাদের গাড়ি বা মাঠ ফুল দিয়ে সাজাত। এ অনুষ্ঠান কমলালেবু পাকার মওসুমে শুরু হতো। ১৯০২ সালে রোজ টুর্নামেন্টের অংশ হিসেবে রোজ ফুটবলের প্রচলন শুরু হয়। আসলে এটি ছিল রোমানদের রথ উৎসবের বিকল্প।
শিশুদের জন্য গ্রিসে নববর্ষের পয়লা দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিন ছোট শিশুদেরকে ঝুড়িতে নিয়ে বিশেষ কুচকাওয়াজ করা হতো। মনে করা হতো এতে আত্মার শক্তি বাড়বে। প্রাচীন মিসরেও এ রকম ধারণা করা হতো। শিশুদেরকে আত্মিক শক্তি, পুনর্জাগরণের প্রতীক ধরা হতো।
খ্রিষ্টানরা প্রথম দিকে প্যাগানিজমের বিরোধিতা করলেও গির্জায় ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে শিশুদের উপস্থাপনকে তারা বাহবা দিয়েছে। এর পর থেকে গির্জায় শিশুদের মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করা একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে যিশুখ্রিষ্টের বাল্যকালকেও স্মরণ করা হয়। এ ধারণাটিই আস্তে আস্তে আমেরিকা ও জার্মানিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
নববর্ষ নিয়ে কুসংস্কার
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের মাঝে নববর্ষ নিয়ে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। যদিও এসব ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, তারপরও এসব অযৌক্তিক ধারণা মানুষ মেনে আসছে যুগ যুগ ধরে। যেমন অনেকে মনে করে, নববর্ষের পয়লা দিনের শুরুতে সে যা করবে বা খাবে সারা বছরই তাই করবে বা খেতে পারবে। এ জন্য অনেকেই বছরের পয়লা দিনের কিছু সময় আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের সান্নিধ্যে সময় কাটায়। অনেকে এই উদ্দেশ্য নিয়ে মিষ্টিমুখ করে। যাতে সারা বছর মিষ্টি খেতে পারে।
আবার অনেকে বিশ্বাস করে, যদি বছরের পয়লা দিনে কোনো কালো চুলের লম্বা দেহের কারো সাথে দেখা হয় তা নিজের সৌভাগ্য বয়ে আনবে।খাবার দাবারের ব্যাপারেও অনেক বিশ্বাস প্রচলিত আছে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশ্বাস আছে গোলাকার খাবার সৌভাগ্যের প্রতীক। এ বিশ্বাস থেকে ওলন্দাজরা বছরের পয়লা দিন গোলাকৃতির ডোনাট খেয়ে থাকে। তাদের ধারণা, এটি তাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে।
আমেরিকার বেশির ভাগ প্রদেশে এ দিন মটরশুটি ও শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবার খাওয়া হয়। আর শূকর বা শূকরের মাংস আমেরিকায় উন্নতির প্রতীক বলে ধরা হয়। বাঁধাকপিকেও তারা সৌভাগ্যের সবজি বলে মনে করে। বাঁধাকপির প্রতিটি পাতাকে (প্রতীকী অর্থে) তারা কাগজের মুদ্রা বলে মনে করে। আমেরিকায় আবার অনেকেই নববর্ষের দিন ভাতও খায়।
নববর্ষ দেশে দেশে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালনের রীতিনীতি কিন্তু এক নয়। কিছু কিছু মিল থাকলেও নববর্ষের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যোগ হয় দেশীয় ঐতিহ্য। নববর্ষের কিছু প্রথা আছে অবাক করা এবং মজার। যেমন থাইল্যান্ডে একজন আরেকজনের গায়ে পানি ছিটিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়। স্পেনে রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২টা আঙুর খেয়ে নববর্ষের প্রথম ক্ষণটি উদযাপন করা হয়। এখানে বিভিন্ন দেশের নববর্ষ পালনের কিছু মজার রীতি তুলে ধরা হলো।
আর্জেন্টিনা : আর্জেন্টিনায় নববর্ষের আগের রাতে পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসে আহার করে। তারপর বড়রা নাচের অনুষ্ঠানে চলে যায়। ভোর পর্যন্ত চলে এ নাচের অনুষ্ঠান। নববর্ষের প্রথম দিন নদী বা পুকুরে সাঁতার কেটে তারা নববর্ষ উদযাপন করে।
ব্রাজিল : ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো সমুদ্র সৈকতে নববর্ষের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হয়। এর অন্যতম আকর্ষণ চোখধাঁধানো আতশবাজির প্রদর্শনী। এ দিন প্রায় সবাই সাদা পোশাক পরিধান করে। সমুদ্রে সাতটি ডুব দিয়ে এবং সাতটি ফুল ছুড়ে দিয়ে তারা মনে করে বছরটি খুব ভালো কাটবে। এ উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় দুই মিলিয়ন পর্যটক যোগ দেয়।
কোরিয়া : কোরিয়ায় নববর্ষ শুরুর সময় কেউ ঘুমায় না। এ সময় ঘুমালে নাকি চোখের ভ্রু সাদা হয়ে যায়! রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে ৩৩ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। কোরিয়ার ৩৩ বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটি করা হয়। কোরিয়ায় প্রায় সবাই সূর্যোদয় দেখে। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার সময় একজন আরেকজনকে শুভেচ্ছা জানায়।
মেক্সিকো : মেক্সিকোতেও ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এ সময় প্রতি ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে একটি করে আঙুর খাওয়া হয়। তারা বিশ্বাস করে এ সময় যা কামনা করা হয় তা-ই পূরণ হয়।
ভিয়েতনাম : ভিয়েতনামে ভোর হওয়ার সময় প্রতি নববর্ষে সবাই গুরুজনদের কাছে দীর্ঘায়ু কামনা করে আশীর্বাদ নেয়।

বাংলা নববর্ষ
পয়লা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সার্বজনীন উৎসব। বিশ্বের সব প্রান্তের সব বাঙালি এই দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের সব দুঃখগ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল অথবা ১৫ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ পালিত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিষ্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সন চাঁদের হিসেবে এবং খ্রিষ্টীয় সন ঘড়ির হিসেবে চলে। এ কারণে হিজরি সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। আর বাংলা সনের দিন শুরু হয় ভোরে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। কাজেই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বাঙালির পয়লা বৈশাখের উৎসব।
হিন্দু সৌরপঞ্জিকা অনুসারে বাংলা ১২টি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌরপঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌরবছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়– ও ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তি প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।
বাংলা শুভ নববর্ষ একটি সামাজিক উৎসব। এই সামাজিক উৎসবের সাথে বাংলার প্রতিটি পরিবারের সদস্যরাও শরিক হয়। সুতরাং বলা যায় বাংলা নববর্ষ একটি সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব। যখন বাংলা সন প্রথম চালু হয়, এতদঞ্চল তখনো ‘বাংলা’ বা বাংলাদেশ নামে অভিহিত ছিল না। অভিহিত ছিল ‘বঙ্গ’ বা ‘পুণ্ড্র’ নামে। তখনকার ‘বঙ্গ’ বা ‘পুণ্ড্র’ বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার সমার্থক হিসেবে পরিচিত ছিল না। পরিচিত ছিল ভিন্ন ভিন্ন জনপদ নামে যেমন পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, মালদহ ছিল ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ নামে। পাণ্ডুয়া ছিল যার রাজধানী। বর্তমানে খুলনা ও পটুয়াখালী অঞ্চল ছিল সমতট নামে। প্রকৃতপক্ষে সমতটের অধিবাসীরাই ‘বাংলা’ শব্দটির প্রতি বেশি আসক্ত ছিল। সমতট ও পুণ্ড্রবর্ধন জনপদটি ছিল বিভিন্ন কৃষ্টি ও সংস্কৃতির লীলাভূমি।
সমতটের অধিবাসীরা যে ভাষা ব্যবহার করতেন উৎকল ভাষা ও পুণ্ড্রবর্ধনের জনপদের ভাষার সাথে তার কোনোই মিল ছিল না। সমতট ও উৎকল শাসকেরা প্রাচীন বঙ্গজনপদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি দুর্বল। মুঘল শাসকদের আমলেই পূর্ববঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয় বিভাগ এক ঐক্যবদ্ধ শাসনের অধীনে শাসিত হয়। বাংলা সনেরও উৎপত্তি তখন থেকেই।
ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, সম্রাট হোসেন শাহ আমল থেকেই বাংলা ভাষা তার রাজদরবারে প্রথম স্থান পায়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার চর্চা ও ভাষাগত ঐক্য এবং জাতীয় সংহতি প্রকাশ লাভ করে। বাংলাদেশের নববর্ষ উৎসবটি পল্লী অঞ্চলে ‘পরব’ হিসেবে পালিত হয়। এই ‘পরব’ অর্থ পর্ব বা আনন্দ উৎসব।
পয়লা বৈশাখ আমাদের পল্লী বাংলার তাহজিব তামদ্দুনিক চেতনার নবমূল্যায়ন। পল্লী বাংলায় এই দিবসটি পালনের রীতিনীতি যেন হাজার বছরের চেতনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা ফিরে যাই আমাদের স্বকীয় মৌলিক সংস্কৃতি বিকাশের চেতনায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫