ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

রুদ্র বৈশাখে শেকড়ের গান

শামসুদ্দোহা চৌধুরী

১৩ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:০৮


প্রিন্ট

আবহমান বাংলার চিরায়ত বৈশাখ। শুভ নববর্ষ। ভাঙা-গড়ার এক বৈপিরিত্ব দ্যোতনার এক আশ্চর্য সমন্বয়। সাবেকি বর্ষের যাপিত জীবনের যোগ বিয়োগের হিসাব কষার নির্মম পরিণতিকে এক পাশে ঠেলে নব আশায় বুক বেঁধে আরেক শুভ অশুভ পরিণতির দিকে অলঙ্ঘনীয় যাত্রা। ধরণীর নির্মম পরিণতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার সুপ্ত অভিলাষ। পেছনের গ্লানি, অবসাদ, জরা, হতাশা, বার্ধক্য যাই ছিল, থাকুক না, তাতে কী আসে যায়। সামনের নতুনকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে তাবৎ হতাশাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সম্মুখ সমরে এগিয়ে যাওয়ার নাম বৈশাখ, এ যেন এক যুদ্ধ জয় সেরে আরেক যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় চির নতুনের ডাক, এসো হে বৈশাখ।এ যেন মহাজাতকের ‘কোয়ান্টাম’ চর্চার মতো। সারা বছরের পুঞ্জীভূত দুঃখ বেদনা, হতাশাকে ফুসফুসের খাঁচা থেকে নাক দিয়ে ধীরে ধীরে ছেড়ে পয়লা বৈশাখে নববর্ষে মুখ ভরে প্রকৃতির অনাবিল শ্বাস নিয়ে প্রশান্তিতে নিজকে উজাড় করে সম্মুখপানে নবযাত্রা। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির নৈবদ্য পড়ে থাক, সামনের দিনগুলো যেন দুধে ভাতে ভরে উঠুক এইতো বাঙালির চির প্রত্যাশা। এ মহোৎসবে প্রকৃতিও বসে থাকার পাত্র নয়, প্রকৃতিও নিজকে ঝেড়ে মুছে বৈশাখের পাগলা বাতাসে জীর্ণ পাতা আগাছা ঝড়ো বাতাসে ফুৎকারে উড়িয়ে প্রকৃতি নিত্য-নতুনের আরাধনায় মেতে ওঠে। চৈত্রের খটখটে জমিতে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা ছুটানোর জন্য বৈশাখের নতুন পানি বেহুঁশ হয়, প্রকৃতির সন্তান পাখিরা গোসল করার জন্য ভিড় জমায় তিরতিরে বয়ে যাওয়া বৈশাখের স্বচ্ছ জলের কাছে। বৈশাখের কাঠফাটা গরমে একটু ছাগলতাড়ানো বৃষ্টির জন্য জমিনের আত্মসমাহিত শেকড় থেকে মাটি ফুঁঁড়ে উঁকি দেয়ার ঘাস গাছের কী আকুল প্রণতি, বৈশাখের অঝোর ধারার বৃষ্টি নয় বরঞ্চ মেঘে ঢাকা আকাশের গুরুগুরু গর্জনের পরে সামান্য বারিপাতে চৈত্রের খটখটে জমিতে হয়ে যায় সবুজ ঘাসের উৎসব। প্রকৃতির এই উৎসবের ঢেউ লাগে গাছে গাছে, বনে বনে, নদীতে। এই উৎসব একাকার হয়ে যায় বাঙালির ঘর গেরস্থালির যাপিত জীবনে। সারা বছর ধরে ঝিম মেরে বসে থাকা ঝাঁকড়া বাউলের জটাচুলে বাতাস লাগে, একতারা দোতারার ঢিলে তারগুলো টান টান হয়ে ওঠে এক অবার্চীন সুরের সম্মোহনি জাদুকরী পরশে। হিজলতলে বসে থাকা ঘর্মাক্ত মেঠো রাখালের বাঁশিতে সুর ওঠে, ডাকাতিয়া বাঁশি এক মোহন সুরে জানিয়ে দেয়, বৈশাখ এসেছে দ্বারে, বাঙালি, জেগে ওঠো, মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নাও। চারি দিকে এক সাজ সাজ রব। কোথা থেকে মাইকে ভেসে আসে পাগলপারা গান ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি’। আর কি বাগানে থাকা যায়। বৈশাখের ঝাঁঝালো দুপুরে আমবাগানে গুলতি নিয়ে পাখি শিকার আর ঝরা আম খাওয়ার উদগ্র নেশা থেকে বের হওয়া কি চাট্টিখানি কথা। নতুন পানির নদীতে মোজাম দেখে এসেছে, সার্কাসের নাও এসে ভিড়েছে নদীর ঘাটে, সেখানে হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভালুক, পাগলা মাখন এসেছে, এ খবরও পৌঁছে যায় আমবাগানে, ... দে ছুট... মেলায় যাইরে...।
রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের বৈশাখী উসবের জাঁকজমক প্রাতিষ্ঠানিক পর্বের আগে যদি ফিরে যাই, কেমন ছিল বৈশাখী উৎসব। সম্রাট সম্রাজ্ঞী নবাবদের রাজকীয় প্রাসাদ, হেরেমের অন্তপুর ছাপিয়ে হলিখেলার উৎসবের পাশাপাশি হেরেমবালাদের আয়োজিত ‘মীনাবাজার’ সেখানে প্রিয়দর্শিনীদের মসলিনের আলোয়ানের ফাঁকে চাঁদআলোসম মুখমণ্ডল এবং পটলচেরা চোখ দেখার তৃষ্ণা এবং প্রিন্সেসদের অপূর্ব দেহবল্লরীর বাঁক দেখে প্রিন্সদের সঙ্গিনী বাছাই করার এই সুযোগতো হাতছাড়া করার কোন উপায় নেই। তার পরেও কথা থেকে যায় নববর্ষের দিনে সুবেদার, নবাবের পবিত্র বদনখানি প্রজাদের কাছে মেলে ধরতে হয়, শত হলেও বাদশার মুখ তা না দেখেতো ফেরা যায় না। তো নবাব সুবেদারতো সবার সাথে মিশতে পারেন না। তার জন্য চাই উঁচু ‘ঝরোকা’। জানা যায় এই ঝরোকায় রাজকীয় সিংহাসনে বসে সুবেদার, নবাব প্রজাদের মুখ দর্শন করাতেন। এতে কী শান্তি আছে প্রজার, রাজার জন্যে ভেট আনতে হবে, তা যাতা ভেট, নজরানা নয়, আনতে হবে একেবারে শাহী মূল্যবান উপহার। তা না হলে তো মানসম্মান থাকার কথা নয়। অবশেষে রাজার দরবারে শাহীখানা খেয়ে নববর্ষের মিছিলে শরিক হও। নববর্ষের এই মিছিলের অগ্রভাগে নবাব, সুবেদারদের জরি আর কিংখাবে মোড়ানো সাদা হাতি, হাতির উপরে সমাসীন সুবেদার, উপরে ময়ূরপুচ্ছের ছাতা, হাতির পেছনে পাইক বরকন্দাজ, রণবাদ্য, পেছনে নগরবাসীর মিছিল, আজকের বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ কি একই ফ্রেমে বাঁধা কিনা কে জানে? শুধু সম্রাটদের মুখ দেখালে তো চলবে না, সম্রাজ্ঞীদেরওতো পবিত্র চাঁদপনা বদনখানি প্রজাদের দেখাতে হবে। সম্রাজ্ঞীদের তো বের হওয়ার এত্তেলা নেই, দরজার এক ফাঁকে দাঁড়িয়ে অথবা গবাক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রজাদের মুখ দর্শন করাতেন। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান গবাক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রজাদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতেন। আর এদিকে নববর্ষের উৎসব লেগেছে নগরের উন্মুক্ত প্রান্তরে। সেখানে মোরগের লড়াই, পালোয়ানের দ্বৈরথ যুদ্ধ, বাউলের গান, সার্কাসে মগ্ন নগরবাসী।
পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ মানে গহিন গ্রামের গহিনের শেকড়ের উৎসব। বলা হয়ে থাকে এই পাললিক বদ্বীপের কৃষিভিত্তিক আর্থ সমাজব্যবস্থার সেরা উৎসব। সম্রাট আকবরের ফসলি সনের উদ্ভবের আগেও বাঙালির ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উৎসব উদযাপন এবং সম্রাটের খাজনা পরিশোধেরও নিয়ম কানুন ছিল। মহস্থানগড়ের পৌণ্ড্রবর্ধন নগরীতে প্রায় দুই হাজার বছরের কাছাকাছি সময়ের সম্রাট অশোকের জারি করা প্রাকৃত ভাষার এক শিলালিপিতে নগরে খাদ্যাভাব দূর হওয়ার পর নগরবাসীর খাজনা পরিশোধ করার কথা লেখা আছে। নববর্ষের উৎসবের আয়োজন ও ব্যাপ্তি কবে কখন শুরু হয়েছিল ইতিহাসে তা স্পষ্ট না হলেও ধরে নেয়া যায় নতুন ফসলের আগমন এবং ঘরে তোলার নির্মল আনন্দই হয়তোবা নববর্ষের আনন্দ উৎসব আয়োজনের দিকে বাঙালিকে ধাবিত করেছিল। কৃষি কৌম সমাজ অবকাঠামো নির্মাণ যাত্রার সুসংবাদ হলো এই নববর্ষের আনন্দ উৎসব। এ কথা তো অস্বীকার করার কোন জো নেই বাঙালির আদি সমাজ ব্যবস্থাই গড়ে উঠেছিল কৃষির ওপর এবং এই বদ্বীপের যত উৎসব, আয়োজন সবকিছুকে ঘিরে কৃষি বাঙালির যাপিত জীবনে একটি বৃহৎ অংশে জুড়ে আছে। রাজা, মহরাজা, নবাব, সামন্ত, মহাসামন্তদের বিলাসব্যাসন, খাজনা, বিভিন্ন কর, আধিপত্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যাপিত জীবনের আনন্দ আহলাদ সবকিছুকে ঘিরে এবং তার মূলে রয়েছে কৃষি। নববর্ষ উৎসব ফসলি উৎসবের বিশাল আয়োজন কৃষিকে আবর্তন করেই, তাতো ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়ই মেলে। সম্রাট আকবরের সময়ে পঞ্জিকা সংস্কারের পর নির্ধারিত দিনে কৃষকদের খাজনা পরিশোধের নিয়মের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের হালখাতার বকেয়া পরিশোধ করে নতুন করে হিসাব খোলার নিয়মকানুনও ছিল। ব্যবসায়ীরা বকেয়া পরিশোধ করে মিঠাই মণ্ডা খেয়ে বাড়ি ফেরে, তার ব্যত্যয় এখনো ঘটেনি।
নববর্ষ উৎসবে গহিন গ্রামে ঢাকঢোলের বাদ্য বাজনার সাথে ‘শিবের গাজন’ গীত গাওয়া ‘কাছ নৃত্য’ শিব সেজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আম চাল ডাল সংগ্রহ করে নিরন্নদের খাওয়ানো বাঙালির এক চিরায়ত বৈশাখী সংস্কৃতিরই অংশ। বাড়িতে বাড়িতে বৈশাখের কড়া আমের সাথে সজনে দিয়ে ডাল খাওয়া নতুন বোরো চালের সুমিষ্ট ফেনভাতের সাথে মৌরালা মাছের ঝোল তার সাথে শুঁটকির ভর্তা, বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি বাঙালির বৈশাখের খাবার দাবারের অংশ ছিল। তার সাথে বিভিন্ন প্রকারের সুমিষ্ট পিঠাপুলি, দুধ, গুড়ের সুমিষ্ট পায়েস অবশ্যই খাবার দাবারের মেন্যুতে ছিল, একটু অবস্থাপন্ন কৃষকের ঘরে মোরগ মুরগি পোলাও যে হয় না তা কিন্তু নয়, এ সব আয়োজন পূর্বে যেমন ছিল এখনো তেমনি আছে, বরং আয়োজন এবং খাবার দাবারে নতুন মেন্যু যোগ হয়েছে। নগরবাসী ইদানীং পান্তাভাত তার সাথে কড়কড়ে ইলিশ ভাজা খেয়ে, ফেসবুকে নববর্ষের অভিনন্দন জানিয়ে, কেউবা চ্যাটে মগ্ন হয়ে সময় কাটায়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে শেকড়ের সন্ধানে ব্যাপৃত হয়। নগর নন্দিনীরা স্বআয়োজিত মীনাবাজারে দোকানপাট খুলে শখের ব্যবসায় মেতে ওঠেন। বিকেলে দামি পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তারপর রাজসিক ভোজে মত্ত হন। এভাবেই কাটে নগরবাসীর পয়লা বৈশাখের এই সব দিনরাত্রি।
বৈশাখকে ঘিরেই জমে ওঠে মেলা । আবহমান বাঙালির চিরায়ত লোকজ উৎসব। নববর্ষ মানেই বৈশাখী মেলা। শুধু নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য গ্রামীণ মেলাগুলোর সৃষ্টি হয়নি। তার পেছনে আছে বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনব্যবস্থার এক নিগূড় অনুভূতির সৃষ্টিশীল ব্যঞ্জনা। এই মেলার পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের চিন্তা-চেতনায় লালিত চারুকারু শিল্পীদের আপন মনের মাধুরী মেশানো সৃষ্টির বহিঃপ্রকাশ। শুধু বিনোদনের জন্য মেলার সৃষ্টি হয়নি, বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনের কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার হলো মেলা। নিরক্ষর বাঙালি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে যে শিল্পসম্ভারের সৃষ্টি করেছে তার প্রদর্শনীর ক্ষেত্রও বটে গ্রামীণ মেলা। মিলন, সম্মিলন থেকে কি মেলা নামের উৎপত্তি কিনা তা জানা না গেলেও একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে গ্রামীণ মানুষের স্বউদ্ভাবিত লোকজ সম্ভারের দোকানপাটে ভরপুর মানুষের সম্মিলনে যে আয়োজন হয় তার নাম কি মেলা? কবে কখন মেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল তার ইতিহাস অন্ধকার। শুধু ঘরগেরস্থালির সরঞ্জামাদি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্যই মেলা জমে ওঠেনি, সেখানে লোকজ সংস্কৃতির ধারকবাহক লোকজ নাচ-গানের আসরও জমে উঠেছিল। যার ব্যত্যয় এখনো ঘটেনি। মেলা মানে এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব। ঘরবিরাগী আউল বাউলের সাধনার ক্ষেত্র। দোতারা একতারার মূর্ছনায় বাউলের অন্তরের দীর্ঘশ্বাস। মেলা হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান খ্রিষ্টান জাতপাতের ঊর্ধ্বে ওঠা এক সর্বজনীন উৎসব। মানুষের ভাব বিনিময়ের কেন্দ্রস্থল। মেলায় যাওয়ার জন্য শিশু-কিশোরেরা বায়না ধরে। মেলার নাগরদোলার চর্কিতে ঘোরা কিশোরের লালিত স্বপ্ন। উপেন্টি বায়োস্কোপ দেখার জন্য গোঁ ধরা, বাঁশের বাঁশি, কলাপাতার বাঁশির পোঁ পোঁ আওয়াজ, কলসি, ধামায় খই উখরা ভরে গৃহিণীর বাড়ি ফিরে যাওয়ার আকুতি এ যেন চিরায়ত মেলার অভূতপূর্ব দৃশ্য। আবহমান বাঙালির এই প্রাণের মেলার জন্য গ্রামের একটি নির্দিষ্ট স্থানই বরাদ্দ থাকত। কোনো নদীতীরে বা লম্বা হালটে, চটানে মেলা জমে উঠত। কোন তীর্থস্থানে বা তীর্থ স্নানের নদীঘাটে বৈশাখী মেলা জমে ওঠে, উঠত। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য মেলা জমে উঠত। আজ সেই বৈশাখী মেলাগুলো বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে, কয়েকটি নামে মাত্র মেলা টিকে আছে, তাও কখন নগর সভ্যতার চাপে, অপসংস্কৃতির ধাক্কায় মেলার বিলুপ্ত ঘটবে, তার কথা কি কেউ বলতে পারবে?

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫