ঢাকা, শনিবার,২৭ মে ২০১৭

বিবিধ

শুরু হোক নতুন করে

ড. ফজলুল হক সৈকত

১৩ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:০৭


প্রিন্ট

প্রায় দেড় হাজার বৈশাখ তো নীরবে কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে এলো আর গেল। নতুন ফসলের সুগন্ধমাখা বাতাস, শ্রীষ্মের ফল-ফলাদির আগমন-বারতা তো অনেক পাওয়া হলো! পিঠে-পায়েসও তো আর কম খরচ হলো না? নতুন পোশাকের আনন্দ আর মেলায়-হাটে-প্রান্তরে ঘুরে-বেড়ানোর মজা- সেসবেরই বা হিসাব রাখে কয়জনে? নানান রঙে আঁকা মাটির হাঁড়ির কথাই বা বাদ যায় কেন? আর পাতার বাঁশি, তালপাখা, ইলিশ-পান্না- কত যে ফূর্তিময় আমাদের এই বৈশাখ! দেখতে দেখতে আবার আমাদের ঘরের আঙিনায়, মনের নিবিড় বারান্দায়, জানালার গ্রিলের ফাঁকে উঁকি দিল বৈশাখ। হ্যাঁ, আজ পয়লা বৈশাখ!
ভেবে দেখুন তো- ফসলের সাথে, কৃষক আর কৃষাণীর সাথে জড়িয়ে আছে যে বৈশাখের আবেদন ও আনন্দ, তার সত্যিকারের আমেজ কতটুকু আজ অবশিষ্ট আছে? ফসলের মাঠে কি চাষি-কন্যার উদ্যাম লাফালাফি আর কৃষকের মুখে সেই চিরচেনা হাসি সে-রকমভাবে দেখতে পাওয়া যায়? একটা সময় ছিল, যখন গ্রামে গ্রামে বসত বৈশাখী মেলা, বিকিকিনি চলত হরেক রকম সামগ্রীর- নতুন মাটির হাঁড়ি-পাতিল, চুড়ি-ফিতা-লিপস্টিক, মাটির তৈরি খেলনা, চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া, নলখগড়ার বাঁশি, কাগজের চরকি। বৈশাখকে ঘিরে চলত আন্তঃগ্রাম হাডুডু-কাবাডি-ফুটবল প্রতিযোগিতা; ধীরগতিতে সাইকেল চালানোর খেলায় অংশ নিত দূরদূরান্ত গ্রামে সৌখিন সাইকেলচালক। গ্রামের সব হাটে ও দোকানে পয়লা বৈশাখে হতো হালখাতা; দোকানে সেদিন বেচাকেনা বন্ধ রেখে চলত ক্রেতা-আপ্যায়ন, হাটফেরত লোকের হাতে থাকত লুচি-জিলাপি-বুন্দিয়া-সন্দেশের প্যাকেট। নতুন-ওঠা চৈতালি বিক্রি করে সারা বছরের বাকিবাট্টা পরিশোধ করে স্বস্তি পেত কৃষক-শ্রমিক, দরিদ্র-সাধারণ গ্রামবাসী। তৃপ্তিতে ভরে উঠত ব্যবসায়ীর চোখ ও মুখ। আজ আর তেমনটা খুব একটা দেখা যায় না। কোথাও কোথাও জানুয়ারিতে- ইংরেজি নববর্ষে হালখাতার চল শুরু হয়েছে। অনেকে ভুলেই গেছে হালখাতার সেসব হারানো দিনের আনন্দের কথা। কেউ কেউ হয়তো স্মৃতিচারণ করে সাময়িক সুখ খোঁজেন। তবে কি শিল্পবিপ্লব-নগরায়ন-প্রযুক্তির প্রবল প্রবাহ গ্রামের মানুষকে আদিম সুখের উল্লাস থেকে সরিয়ে দিলো- অনেকটা দূরে? নদীর ধারে কিংবা গাছের গুঁড়িতে বসে কোনো যুবককে এখন আর হয়তো বাঁশি বাজাতে দেখা যায় না! আগে যেখানে লেখার প্রতিযোগিতায় এ গ্রাম-ও গ্রামের মধ্যে থাকত পক্ষ-বিপক্ষ, আজ যেখানে বিরোধ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক। সমাজকে যেন গ্রাস করেছে রাজনীতির অচেনা সব দৌড়! এ কী দুর্গতি হলো ঐতিহ্যপ্রেমী, ঘরে ঘরে ছাগল-মুরগি-কবুতর-বেড়াল-কুকুর-গরু-বাছুরের সাথে সহাবস্থান করা চিরদিনের শান্তিপ্রিয় বাঙালির? কে তৈরি করে এই বিভাজনরেখা? মন খারাপ করে মাঝে মধ্যে ভাবতে বসি- চারুকলার বকুলতলায় শোভাযাত্রা, রমনায় প্রথম প্রহর-উদযাপন, ফ্রিজের ঠাণ্ডা-হাওয়ায় তৈরি-হওয়া পান্তা আর ‘আগুন-দরে’ কেনা ইলিশ দিয়ে কি বৈশাখের আনন্দকে টিকিয়ে রাখা যায়? টেলিভিশনে ‘ভীষণ’ সব আলোচনা আর ‘লাইফ’ প্রোগ্রাম বৈশাখকে কী মাত্রায় ধারণ করতে পেরেছে, তারও হিসাব করার সময় হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আনন্দ তার নিজস্ব প্রবাহে চলে, তাকে আরোপ করে বেশিদিন চালানো চলে না। কিন্তু যে রসদ আনন্দকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে মৃত্যুদশা থেকে আরোগ্যলাভের দিকে তুলে আনার দায়িত্ব কি কিছুতেই এড়ানো যায়?
বৈশাখের এই নবীন-প্রহরে দাঁড়িয়ে ভাবতে খারাপ লাগে- উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো অফিসিয়াল ভাষা ইংরেজি। অফিস-আদালত- সবখানে চলছে ইংরেজির দৌর্দণ্ড প্রতাপ! বাংলা এখানে দূরাগত স্বপ্ন মাত্র! চাকরিদাতা-প্রতিষ্ঠানে সিভি বা জীবনবৃত্তান্তও জমা দিতে হয় বাংলায় নয়- ইংরেজিতে। সর্বস্তরে বাংলা চালু হওয়া তো অনেক পরের কথা। বাংলাভাষা-শিক্ষাপ্রবাহের সাথেও পুরোপুরি বাংলা প্রবর্তন করা যায়নি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বাংলা সাহিত্য পড়ানো হয় ইংরেজিতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সব বিষয়ের শিক্ষার্থীর জন্য বাংলা প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক বাংলা প্রবর্তন করার কথা ভেবে দেখা যায়। বাংলা মাস-তারিখ অনুযায়ী সেমিস্টার-পদ্ধতি চালু হতে পারে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বৈশাখের আয়োজন’ নামে ঐতিহ্যনির্ভর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আয়োজিত হলে নতুন প্রজন্ম দেশীয় সংস্কৃতি ও উৎসবের আনন্দধারার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবে। এমনটি করা গেলে হয়তো বর্তমান প্রজন্ম বাংলা সন-মাস সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে পারবে। আর তখন তাদের কাছে বৈশাখ কেবল ‘কোনো এক ভোরবেলা পান্তা-ইলিশের উৎসব’ হয়ে থাকবে না; বৈশাখ তার মূল সুর নিয়ে হাজির হবে আমাদের প্রজন্ম ও পরবর্তীকালের বাঙালির কাছে। আবার, বাংলা সালকে প্রচার-প্রসারের অভিপ্রায়কে সামনে রেখে অটোগ্রাফ, স্বাক্ষর প্রভৃতিতে এবং পাণ্ডুলিপি-দলিলাদি রচনায় তারিখ বাংলা সাল-তারিখ চালু করা যায়।
সম্ভবত বোশেখের চেতনাকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারছি না আমরা। আর তাই, বৈশাখ ‘ভেতর’ থেকে নয়- ‘বাইরে’ থেকে ডাক দিয়ে যায় কেবল। শুধু বছরে ১ দিন- ‘পয়লা বৈশাখ’ পালন করে বাকি ৩৬৪ দিন বৈশাখের প্রত্যয় ও প্রবণতা ভুলে গিয়ে বাংলা সন ও ঐতিহ্যকে ধারণ করা যায় না। চেতনা কোনো অনুষ্ঠান নয়- অনুভবের ভেতর দিয়ে লালন করতে হয়। আর সে অনুভব থেকে সটকে পড়েছি বলেই আমাদের সামাজিক পোশাক ও আচার-আচরণে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব বাড়ছে। ভর করছে আমদানি করা সংস্কৃতি ও উৎসবের প্রবল ভার! তবে, পৃথিবীর সব ইতিহাস ও ঐতিহ্য সাক্ষী- নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমাজ-কাঠামোকে দূরে ঠেলে পরদেশী ভাবনায় নিবেদিত হয়ে পড়লে জাতির জন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো কল্যাণ প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। আমাদের ‘পয়লা বৈশাখ’! হ্যাঁ, জাতীয় এই উৎসবকে আনন্দঘন করতে উৎসবভাতা প্রবর্তন করা যেতে পারে। কারণ, উৎসবের সাথে স্বাভাবিকভাবেই জড়িয়ে থাকে কিছু খরচাপাতির ব্যাপার। পরিবার-পরিজনের জন্য কেনাকাটা করে গৃহকর্তারা পাবেন তৃপ্তি ও সম্মান; সংসারের লোকেদের মুখেও ফুটে উঠবে আনন্দধারা। এ ছাড়া পয়লা বৈশাখ- জাতীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা পণ্য দ্রব্যের ওপর বিশেষ ছাড় দিতে পারেন। মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পণ্যের প্রচার হতে দেখি আমরা সারা বছর; অথচ এই উৎসবে সামান্য ছাড় দিলে আনন্দিত হবেন লাখো-কোটি ক্রেতা। ইউরোপ-আমেরিকায় জাতীয় উৎসবে পণ্যের দাম কমে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার আমাদের দেশে উৎসব এলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রিক দাম বাড়ে। সরকার এবং ব্যবসায়ী এ ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সারা দেশের মানুষের জন্য বয়ে আনতে পারে নতুন খুশির খবর। ভাতা-প্রবর্তন, পণ্যের দামে ছাড় প্রভৃতির পাশাপাশি বাড়িতে বাড়িতে, গ্রামে-গ্রামে, মহলায়-মহল্লায় তৈরি হতে পারে সরকারি ও ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় আনন্দ মঞ্চ; ঘরোয়া আড্ডার আয়োজনও আমাদের আনন্দ যাপনে যুক্ত করতে পারে প্রেরণা ও পাওনা-যোগ। পথে-ঘাটে-হাটে-মেলায় বিত্তবান-সমাজকর্মী-প্রচারমাধ্যম-ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করতে পারে বিভিন্ন উপহারসামগ্রী, খাদ্য-পানীয় এবং উৎপাদিত নতুন পণ্য। এতে সমাজসেবার পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রচারও সহজতর হবে। সাম্প্রতিককালে রাজধানীর রমনা-পাড়ায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে কাগজের তৈরি হাতপাখা এবং কিছু প্রিন্ট মিডিয়াকে ‘বৈশাখী সংখ্যা’ বিতরণ করতে দেখা গেছে। এই ধারণা ব্যাপকভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।
‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়, পান্তা আনতে নুন’- এই হলো আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনধারার চিত্র। যে দেশে লাখ লাখ মানুষ নিয়মিত পেট পুরে খেতে পায় না, সে দেশে পান্তা-ইলিশের ‘শহুরে বৈশাখ’ এক ধরনের প্রহসন মাত্র! বিত্তবৈভবে বিলাসী জীবন যাপনকারী কিছু মানুষের এই উল্লাস বাংলাদেশের সব জনতার জন্য বৈাশাখী-বারতা কিছুতেই বয়ে আনতে পারে না। কৃষি-উৎপাদন; গ্রামবাংলার প্রতিবেশ ও জল-হাওয়ার সাথে যে বৈশাখের সম্পর্ক, তার পরিচয়টি যেন হারিয়ে যাচ্ছে রমনার বটমূলের ছায়ানটকেন্দ্রিক বৈশাখী প্রথম প্রহর-যাপন আর চারুকলা ইনস্টিটিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার সামান্য মোড়কে। সারা বাংলাদেশের ঐতিহ্যিক বৃহৎ আনন্দধারাকে আমরা যেন নামিয়ে এনেছি ঢাকার বকুলতলা-বটতলার নিচে ও আশপাশে। ‘ভদ্রতা’র মোড়কে যেন আটকে ফেলেছি ‘প্রাণের উৎসব’কে। সারা দেশে বটগাছ নির্বিচারে নিধন করে, বকুলের শোভা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে শিল্পায়ন আর নগরের যান্ত্রিকতার দিকে ঠেলে দিয়ে আমরা যেন বৈশাখের প্রাণবায়ুর আশ্বাস ও আওয়াজ ভুলতে বসেছি। অথচ এই বৈশাখ একদা ছিল আমাদের ‘জাতীয় উৎসব’। তাই আজকে এই বৈশাখের সকালবেলায় আমাদের প্রার্থনা হোক- ‘ফিরে আসুক আমাদের প্রাণের উৎসবের ধারা; সকল বৈষম্যের আড়ালে, আধুনিকতার সুখ-সুবিধাকে সঙ্গে নিয়ে পয়লা বৈশাখ পুনরায় হয়ে উঠুক জাতীয় উৎসব- নির্মল-নির্মোহ আনন্দধারা; এই বৈশাখে শুরু হোক নতুন করে...।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫