ফেসবুক বিতর্ক

আমিনুল ইসলাম শান্ত

ফেসবুকের ‘বুকে’ রক্তক্ষরণ হয় মাঝে মধ্যেই। পৃথিবীতে মানুষের সব কাজে দ্রুততা এসেছে। আর ফেসবুকের গতি এত ত্বরিত যে, এর গায়ে বিন্দুমাত্র আঘাত আসার সম্ভাবনা হলেও দ্রুত সমালোচনার ঝড় ওঠে খোদ ফেসবুকেই। সামাজিক যোগাযোগের এ মাধ্যম নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী বা যোগাযোগ তাত্ত্বিকেরা কোনো অ্যাকাডেমিক তত্ত্ব দিয়েছেন কি না, আমার জানা নেই। তবে গণযোগাযোগ বা যোগাযোগ তত্ত্বের সব ধারণা দ্রুতগতিতে পেছনে ফেলে ধাবিত হয়েছে ফেসবুক।
বিভিন্ন দেশে সরকারের প্রধান কর্তা ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে টুইট করেন, পোস্ট দেন, এমনকি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফরের প্রাক্কালে টুইট করেছিলেন ‘বাংলাদেশ, আমি আমার সাথে ভারতের মানুষের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা নিয়ে আসছি।’ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পা রাখার আগমুহূর্তে টুইটারে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর একই কথা ইংরেজিতে ভাষান্তরিত করে আরেকটি টুইট করেন তিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিগত নির্বাচনোত্তর ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় সে সময়ের চলমান বিক্ষোভ ‘খুবই অন্যায্য’ বলে দাবি করেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ফেসবুকে নিজের অবয়ব ও কৃতকর্ম ভাসিয়ে দেন। বলতে গেলে সরকারবিরোধী রাজনীতিকেরা একটা পোস্ট করতে দশবার ভাবেন তথ্যপ্রযুক্তি আইন নিয়ে। কিন্তু সরকারপন্থী রাজনীতিবিদ ও তাদের অনুসারীরা নির্বিঘেœই স্ট্যাটাস লিখেন, ছবি পোস্ট করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপ্লবকে সঙ্ঘবদ্ধ করা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বড় উদাহরণ হলো আরব বসন্ত, বিশেষ করে মিসরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন।
আর সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল এরদোগানের সময় উপযোগী ভিডিও বার্তা, যা তিনি মোবাইল ফোন থেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল রাতে। পৃথিবীর বেশির ভাগ অভ্যুত্থানের ঘটনা রাতেই ঘটেছে। আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কখন, কোন মত ও পথের মানুষ নিজ স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করছে সেটাই বড় ব্যাপার। ক্ষমতার পতন ও পতন রোধ দু’টিই প্রভাবিত করা সম্ভব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে।
বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের অনেক ব্যক্তিই মনে করেন, দেশ মাহাথির ফর্মুলায় এগিয়ে যাবে এবং সরকারপ্রধান মাহাথিরের ভূমিকায় এগিয়ে নেবেন। না বললেই নয়, মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব ও সাবেক উপপ্রধান মন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম প্রত্যেক দিন ফেসবুক পেজ আপডেট করেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গেও স্ট্যাটাস দেন। মজার ব্যাপার হলো, গত রমজানে মালয়েশিয়ার রূপকার ডা: মাহাথির বিন মোহাম্মদ এক ইফতার অনুষ্ঠানে একটি সেলফি তুলে তা ফেসবুকে আপলোড করেন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে আড় চোখে তার দিকে তাকানো প্রসঙ্গে ব্যঙ্গোক্তি করেছিলেন।
বিশ্বের নামীদামি গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রায় সব ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া তাদের ফেসবুক পেজ ব্যবহার করেন। বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরার মতো বড় মিডিয়াগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে।
সামাজিক পরিবর্তনে অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে ফেসবুক। সমাজ বিজ্ঞান বলতে যদি পরিবার, গোত্র, সংস্কৃতি, ধর্ম, কৃষ্টি, রাজনীতি, সামাজিক আচরণ এসবকে বোঝায় তবে নিঃসন্দেহে ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে বহুরূপী সামাজিক বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। সমাজের পাপিষ্ঠ কীটরূপী যারা, তারা তাদের অভিরুচির প্রচার করে যাচ্ছে। আবার সংখ্যালঘু বা নৃগোষ্ঠী বিশ্বময় বিশাল নেটওয়ার্কে তাদের কথা প্রচার করতে পারছে ফেসবুকের সুবাদে। ইতিবাচক, নেতিবাচক সব কিছু নিয়েই যেমন সমাজ; ফেসবুকও ভলো-মন্দের ঊর্ধ্বে নয়।
প্রসঙ্গ স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার, সময় অপচয়, পড়াশোনায় অমনোযোগ ও সময় নষ্ট ইত্যাদি নিয়ে। কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষার জন্য অভিভাবকদের ভূমিকা কী? অভিভাবক যদি মনে করেন, তার সন্তান সুশিক্ষিত হবে, আদব শিখবে, দেশপ্রেমের প্রেরণায় উজ্জীবিত সত্যিকার মানবসম্পদে পরিণত হবে; তাহলে সেই দায়িত্ব বাবা-মায়েরই বেশি। সরকার শুধু প্লাটফর্ম দেবে। বিদ্যালয়, বিদ্যার মান ও পরিবেশ দেবে। নষ্ট সংস্কৃতিমুক্ত বিনোদন ও সমাজ দেবে।
ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি ও ইয়াবার সয়লাব বন্ধ হচ্ছে না কেন? কোন সাংস্কৃতিক পরিবেশে শিশু বড় হচ্ছে, সেটাই বড় ব্যাপার। ধর্মীয় অনুশাসনের কথা সবাই বলে। ক্যাথলিক, ব্যাপ্টিস্ট, প্রটেস্ট্যান্ট, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম প্রত্যেকেই বলে। ওটাই চাবিকাঠি। ইসলামি অনুশাসনের কথা যারা বলে, তারা কেবল মুসলিমদের জন্যই বলে। যদিও সেটা শুনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায় ভাবানুরাগীরা।
ঢাকায় সদ্য অনুষ্ঠিত আইপিইউ সম্মেলনে ফেসবুকের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেক এমপি সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ইতিবাচক বলে মনে করেন। একজন সাধারণ নাগরিক ও সীমিত মাত্রায় ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে আমি মনে করি, সন্ত্রাসবিরোধী সচেতনতায়, সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়াকে নিরুৎসাহিত করতে, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে, মানবিক আচরণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতার এক যুযোপযোগী নেটওয়ার্ক হলো ফেসবুক। মানুষ এখন সংবাদের উৎস হিসেবে যেমন ফেসবুক ব্যবহার করে, আবার অনেক শিক্ষণীয় উপাদান আর নীতিবাক্যের জন্য কাগজে ডায়েরির পাদটীকা পড়ে না। রুচি বদলেছে। ফেসবুক থেকেই অনেক কিছু শিখতে চায়। ফেসবুকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সময় নষ্ট হচ্ছে, সেটা নিংসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু উত্তরণের উপায় বন্ধ রাখা নয়। দিন বা রাত বিতর্ক নয়। কথা হলো ব্লগ বন্ধ থাকবে? পর্নো সাইট বন্ধ করতে পারবেন? পর্নো সাইট ২৪ ঘণ্টার জন্যই বন্ধ করে দিন। সারা বাংলাদেশের ৯৯.৯৯ মানুষ প্রকাশ্যে ভোট দেবে বন্ধ করার জন্য। ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার বন্ধ করতে পারবেন? এ মাধ্যমগুলোয়ও তো লাইভ চ্যাটিং, ভিডিওকল সবই হয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নীতিস্খলনে এগুলোর ভূমিকাও কম নয়। নৈতিক অবক্ষয় হয় ধর্মীয় অনুশাসন ও পারিবারিক শিক্ষার অনুপস্থিতিতে, এটাই সর্বজনীন।

লেখক : মিডিয়াকর্মী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.