ঢাকা, বুধবার,২৬ জুলাই ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

বৈশাখ এলো রে...

শওকত আলী রতন

০৮ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৯:০৩


প্রিন্ট

পয়লা বৈশাখ বাঙালির জীবনে একটি সর্বজনীন উৎসবে। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা ও গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। বাংলা পঞ্জিকা থেকে মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে আরো একটি বছর। আসবে বাংলা নতুন বছর ১৪২৪। দলীয় বা সামাজিক সঙ্কীর্ণতার সীমা ভেদ করে জাতীয় উৎসবের মর্যাদা লাভ করেছে বাংলা বর্ষবরণ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালি জাতির মহোৎসব এ বাংলা বর্ষবরণ। বাংলা নববর্ষ বাঙালি জীবনের নবচেতনার আলোকে নতুন জীবনের অবগাহনের দিন। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সাথে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠান আজো পালিত হয়।
নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ আবহের সাথে যুক্ত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সাথে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলেও এখন বহুল প্রচলিত। এই দিনে বাঙালির আচার-অনুষ্ঠানে ষোলো আনা বাঙালিয়ানা ধরা পড়ে। পোশাক-পরিচ্ছদ, সাজসজ্জা, নাচ-গান, খেলাধুলা সবই যেন হয় বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে লালনপালনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। এ জন্যই আজ বাংলা বর্ষবরণ আমাদের দেশে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পয়লা বৈশাখ বিভিন্নভাবে পালিত হয়ে থাকে। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চল থেকে শহর পর্যন্ত আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিয়ে পালন করা হয়। এ দিনটিতে সাধারণত শিশুরা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। গ্রামগঞ্জে দেশীয় সংস্কৃতির নানা আয়োজন নিয়ে মেলা বসে।
মেলায় শিশুদের জন্য মাটির তৈরী নানা ধরনের খেলনা পাওয়া যায়। মাটির তৈরী খেলনার মধ্যে থাকে পুতুল, গরু, ঘোড়া, হাতি, পাখি, বাঁশি, কাঠ ও বেতের জিনিসপত্র। এ ছাড়া বড়দের জন্য রয়েছে মাটির বাসনকোসন, বেত ও বাঁশের তৈরি ব্যবহার্য নানা ধরনের তৈজসপত্র। বাঙালি সারা বছর অপেক্ষায় থাকে দিনটিকে পালনের জন্য।
১৫৫৬ সালে শুরু হয়েছিল বাংলা সনের প্রবর্তন। মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তার রাজস্ব কর্মকর্তা আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী প্রথম ১৫৫৬ সালে উৎসব হিসেবে বৈশাখকে পালন করার নির্দেশ দেন। একই ধারাবাহিকতায় ১৬০৮ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি ঢাকাকে যখন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন তখন থেকেই রাজস্ব আদায় ও ব্যবসাবাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য বাংলা বছরের পয়লা বৈশাখকে উৎসবের দিন হিসেবে পালন শুরু করেন। ঐতিহাসিক তথ্যে আছে যে, সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি তার বাসভবনের সামনে সব প্রজার শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং বৈশাখ উৎসব পালন করতেন। সেখানে সরকারি সুবেদার থেকে শুরু করে জমিদার, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত থাকত এবং প্রজারা খাজনা নিয়ে আসত।
সে উপলক্ষে সেখানে খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি চলত মেলায় গান-বাজনা, গরু-মোষের লড়াই, কাবাডি খেলা ও হালখাতা অনুষ্ঠান। পরে ঢাকা শহরে মিটফোর্ডের নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারিবাড়ি, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিল, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউজ, পাটুয়াটুলীর জমিদার ওয়াইজের নীলকুঠির সামনে প্রতি পয়লা বৈশাখে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। প্রজারা নতুন জামাকাপড় পরে জমিদারবাড়ি খাজনা দিতে আসত। জমিদাররা আঙিনায় নেমে এসে প্রজাদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। সবশেষে ভোজনপর্ব দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হতো। বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাংলা সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই বাংলা নববর্ষ। চৈত্রের শেষে বৈশাখের প্রথম দিনটিকে তাই নানা উৎসবের সাথে গ্রহণ করে এ দেশের মানুষ।
বাংলাদেশের প্রতিটি শহর-নগর, গ্রামগঞ্জে বাংলা নববর্ষ আনন্দ-উল্লাসে উদযাপিত হয়।
মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ভবনের সামনে থেকে। এখানে শুধু ঢাকাবাসী নয়, অনেক দূর-দূরান্তের মানুষ এসে অংশগ্রহণ করে। নতুন বছর সবার জীবনে শান্তি বয়ে আনবে সেই লক্ষ্যেই এ শোভাযাত্রার আয়োজন। তবে ঢাকায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হলো রমনার বটমূল। পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ সেই সাথে ছায়ানটের গানে শুরু হয় নগরীর নববর্ষ উদযাপন।
ছোট-বড় সবাই সকাল থেকে তাই ভিড় জমায়। রঙবেরঙের বেলুন, বাঁশি দেখা যায় হাতে হাতে। তরুণ-তরুণীদের হাতে, গালে আল্পনা, হাতে বাহারি রঙের চুড়ি। চার দিকে বেজে ওঠে উৎসবের আবহ।
গ্রাম-নগর-গঞ্জে বৈশাখের আমেজ চোখে পড়ে। বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয় গ্রামের হাটগুলোয়। দূর-দূরান্ত থেকে সার্কাস দল আসে, নাগরদোলা, মিষ্টি, বাতাসা, মুড়ির মোয়া দেখা যায়। দোকানিরা হালখাতা খুলে বসে। লাল, নীল কাগজ দিয়ে সাজায় দোকানের চার পাশ। শিশুদের ঢোল, তবলা, বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পথঘাট। গ্রামের বধূরা নিজ আঙিনা লেপেপুছে পরিষ্কার করে নেয়। নতুন বছরের সূর্যের সাথে হাজারো চাওয়া-পাওয়ার উদয় হয়। আজ পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধনী-গরিব সব শ্রেণীর মানুষ এক সাথে এ উৎসব পালন করে। নববর্ষে মানুষের চিরন্তন অভিলাষ শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ আরেকটি বছর।
পুরনোকে বিদায় করে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া। নতুনভাবে নিজেকে তৈরি করা। কোটি মানুষের ছোট ছোট স্বপ্নই যেন ধরা পড়ে নববর্ষ পালনের বহুমাত্রিক আয়োজনে।
নতুন বছরের প্রতিটি দিন কাটুক হাসি-খুশির মাঝে, নববর্ষ যেন সেই বার্তাই প্রতিটি মানুষের দরজায় পৌঁছে দেয়। সেই আকাক্সক্ষায় নতুনের কেতন উড়িয়ে আসুক নতুন একটি বছর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫