ঢাকা, শনিবার,২৭ মে ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

বাংলা সন ও নববর্ষ সংস্কৃতি

রায়হান রাশেদ

০৮ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৮:৫৯


প্রিন্ট

সংস্কৃতি হলো জাতির মানসদর্পণ। যে দর্পণে প্রতিফলিত হয় সামগ্রিকভাবে গণমানুষের চিন্তাচেতনা তথা তাদের জীবন ও মূল্যবোধ। জাতির আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, আহার-বিহার থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সাথে পরিপূরক যে চেতনা তার অন্য নামই সংস্কৃতি।
সংস্কৃতি আপন জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরে। সংস্কৃতচর্চা মানুষকে মর্যাদা দেয়। পরিচিত করে। সমাদৃত করে। শিক্ষণীয় এবং থাকতে হবে শিকড়ের সম্পর্ক। ভিনদেশী সংস্কৃতির পরিতোষক যারা, তারা কোনো সংস্কৃতি দিয়েই তাদের যাপিত জীবনকে পরিপূর্ণ করতে পারে না।
তুর্কি বিজয়ের পর বঙ্গদেশে হিজরি সন চালু হয়েছিল। চান্দ্রবর্ষের হিসেবে হিজরি সন ধরা হয়। চান্দ্রবর্ষে দিন ও মাস প্রতি ৩৩ বছরে একবার করে আবর্তিত হয়। যেমন রমজান মাসের রোজা, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই ঘুরে আসে। চান্দ্রমাস বা হিজরি সনের দিন ও মাস নির্দিষ্ট ঋতু বা ফসল তোলার মওসুমে স্থির না থাকায় খাজনা তোলার নির্দিষ্ট তারিখের সাথে ফসল তোলার সময়ে হেরফের হয়ে যায়। তাই ৯৬৩ হিজরি সনে (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতবর্ষে আকবরের শাসনামলে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে প্রজাদের ফসল তোলার সময়ের প্রতি দৃষ্টি রেখে ফসলি সন হিসেবে বাংলা বর্ষপঞ্জী তৈরি করা হয়। সম্রাট আকবরের উপদেষ্টা আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীর হিজরি সনের চান্দ্রবছরের হিসেবের পরিবর্তে সৌরবর্ষের হিসাব সংযোজন করে বাংলা সনের উদ্ভাবন করা হয়েছিল।
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ সম্রাট আকবর বাংলা সন সংক্রান্ত এক ফরমান জারি করেন। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকেরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। তখন থেকেই নববর্ষকে ঘিরে বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে চলে রকমারি আয়োজন। বাড়িঘর চাতাল উঠানজুড়ে চলে পরিচ্ছন্নতার অভিযান। কারো ঘরে হয় বাড়তি কিছু ভালো খাবারের আয়োজন। দাওয়াত দেয়া হয় আত্মীয়স্বজনকে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে দেখা হয় দূরের কুটুম ও বন্ধুদের সাথে। গল্প আড্ডায় মেতে থাকে অনেক দিন পর একসাথে হওয়া মানুষগুলো।
নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজমেলা বলে পরিচিত। বাংলা সনের প্রথম দিন পালিত হয় বাঙালির সর্বজনীন লোকজ উৎসব। বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লায় জমে ওঠে নববর্ষের তোড়জোড় আয়োজন। মেলায় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের হাতে বানানো বিভিন্ন বিপণিতে সাজানো থাকে মেলার ভ্রাম্যমাণ স্টলগুলো। গ্রামীণ মেলাগুলোয় থাকে ভিন্ন আমেজ। সেখানে দেখা মিলে বৈশাখী মেলার মূল চিত্র। মেলাজুড়ে থাকে মাটির বানানো ঘোড়া, হাতি, পুতুলবউ, শিশুদের চড়–ইভাতি খেলার সরঞ্জাম এবং নানা রকমের মিষ্টি খাবার। তবে মণ্ডা যেন মেলার প্রধান মিষ্টান্ন খাবার। কিন্তু আজকাল মেলার স্টলগুলোয় বেশি একটা দেখা যায়না বাতাশা।
বৈশাখের এ মেলাকে ঘিরে আমাদের দেশে চলে সংস্কৃতিচর্চার নামে অপসংস্কৃতির নোংরা পাঠ। অশ্লীলতা বেহায়াপনা নগ্নতার চলে মিছিল। ভিনদেশী সংস্কৃতি আর গানের উল্লাসে মেতে ওঠে আজকের সমাজ এবং তরুণ-তরুণীরা। নববর্ষকে বরণ করতে আমরা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছি মনগড়া কিছু কৃষ্টি, যা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকে নিক্ষেপ করেছে অসভ্যতার আঁস্তাকুড়ে।
পান্তা ইলিশ নাশতা : বাংলাদেশের লেখক-চিন্তকেরা জানান, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের দিক দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের সাথে এই খাবার দু’টির কোনো যুক্তি খুঁজে পায়নি তারা। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে ব্যবসায়ীরা শহুরে নাগরিকদের কাছে পান্তা ইলিশকে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, ‘পান্তা ইলিশকে বৈশাখের উপলক্ষ করা বানোয়াট ও ভণ্ডামির অংশ। এসব উদ্যোগ যারা নিয়েছে তারা সংস্কৃতিচোর।’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার এক লেখায় বলেন, ‘গরিব মানুষের খাবার পান্তাভাত। রাতের ভাত নষ্ট হওয়া থেকে ভালো রাখার জন্য ভাতে পানি দিয়ে ভাতকে ভালো রাখে। কিন্তু বড়লোকেরা আয়েশ করে সকালে পান্তা ইলিশ খাওয়া মানে গরিবদের সাথে উপহাস করা।’
আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা সংস্কৃতিচর্চায় অন্য সব দেশ থেকে এক ধাপ এগিয়ে। তারা দেশকে ভালোবেসে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে চলে। কিন্তু তাদের অবারিত সংস্কৃতচর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় কিছু লম্পট-বদমাশ। বিশেষ করে তরুণীরা হয় ইভটিজিং, না হয় শ্লীলতাহানির শিকার হয়। সেবারের ১৪ এপ্রিল ২০১৫ নববর্ষ উদযাপনে প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েক নারীকে বিবস্ত্র করে কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক, যা আমাদের সংস্কৃতির সাথে বেয়াদবি ও বৃদ্ধাঙুলি দেখানোর শামিল। তারা দেশ ও জাতির কলঙ্ক। মানবসভ্যতার শুদ্ধতার পথে অন্তরায়। তাদের সঠিক বিচার করে এ দেশের মানুষের জন্য নজির স্থাপন করা অত্যাবশ্যক।
বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি পৃথিবীর অন্য দেশকে ছাড়িয়ে। এ দেশের সংস্কৃতি-ইতিহাস ঐতিহ্যনির্ভর। আমাদের সংস্কৃতির পিঠে লেপ্টে আছে অতীত দিনের মনভালো করা স্মৃতি। মর্যাদার চিরায়িত গান। আমাদের সংস্কৃতি পালিত হোক সুন্দর, সুষ্ঠু ও আগামী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে। আমাদের সংস্কৃতিচর্চা বেঁচে থাকুক বাঙালি থেকে বাঙালির অন্তর্মূলে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫