ঢাকা, রবিবার,৩০ এপ্রিল ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

সিংহের পায়ে শিকল পরানোর ছল থেকে সতর্ক থাকুন

এম জি হোসেন

০৭ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:৩৮


প্রিন্ট

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন দিল্লি সফর ও সামরিক চুক্তির প্রসঙ্গটি এখন বাতাসে বাতাসে। বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এমন একটি চুক্তির উপকারিতা ও অপরিহার্যতার বিষয় ভারতের ডান-বাম, কংগ্রেস, বিজিপিতে মতপার্থক্য না থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। চুক্তির বিরুদ্ধে যেন গোটা জাতি, এমনকি সরকারের সমর্থক দলটির একটা অংশও। এই বিপরীতমুখী বাস্তবতার কারণ অনুসন্ধানে বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটি যথেষ্ট হতে পারে।
এ পর্যন্ত চুক্তির বিষয় যা জানা গেল তাতে মনে হয় আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তান বা চীনের সাথেই এমন একটি চুক্তির প্রয়োজন ছিল ভারতের। তবে কি ভারত অদূর ভবিষ্যতে কোনো বড় রকম যুদ্ধে জড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে যুদ্ধে বাংলাদেশকেও তার পক্ষে লড়াইয়ের মধ্যে বাধ্যবাধকতায় আটকাতে চায়? ইতোমধ্যে বাংলাদেশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নিজ পদ-পদবির কথা ভুলেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারত আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যুদ্ধে নেমে যাবেÑ এমন ঘোষণা দিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে ভারত অবোধ শিশুটির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙুল চুষবে, এমনটি আশা করা যায় কি? মিয়ানমার সরকারের অতীত ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দু’টি দেশের মধ্যে সামরিক সঙ্ঘাতের জন্য যথেষ্ট। সারা দুনিয়া তাদের বিরুদ্ধে। নিন্দা ও প্রতিবাদমুখর হলেও ভারত কিন্তু আঙুলই চুষতে থাকল, টুঁ-শব্দটিও করল না। এই যখন বাস্তবতা তখন কথিত চুক্তি কোন ধরনের মহব্বতের আলামত তা বোঝার বয়স এখনো বাংলাদেশের হয়নি, এমনটিই কি ভাবছে ভারত? ভারত কি তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশকে। অথবা বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ হওয়ার আলামত দেখতে পেয়ে এতটা বেহাল? ধরেই নিলাম ‘নিরাপত্তা হুমকির মুখে বাংলাদেশ’। এ ক্ষেত্রে হুমকির কারণ পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার বা অন্য কেউ? বোধকরি এ ধরনেরই চুক্তিপত্র হয়ে থাকবে সিকিমের লেন্দুপ দর্জি আর কাশ্মিরের ডোগরা রাজার সাথে। আর বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। তিন বিঘা করিডোর পেতে তিন যুগ লেগে গেলেও সার্বভৌমত্ব পেল কি বাংলাদেশ?
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা দিনান্তে হাজারবার স্বীকার করতেও কার্পণ্য নেই। এটি লুকানোর কথা নয় যে, আমরা আমাদের স্বার্থেই মুক্তিযুদ্ধ করেছি, ভারতের জন্য নয়। আর ভারতের সহযোগিতাও বিশুদ্ধ প্রেমের আকুতি থেকে নয়, এমনকি মানবতার খাতিরেও নয়। আমাদের স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা আর ভারত ভেবেছে ‘অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠায় এক ধাপ অগ্রগতি’। যুদ্ধ সমাপ্তির পরপরই ইন্দিরা গান্ধীর ঘোষণা ‘টু-নেশন থিওরি ভুল প্রমাণিত হলো’। কিন্তু ইন্দিরা-রাজিব দু’জনই রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন দ্বিজাতিতত্ত্ব নয়, বরং বহুজাতিতত্ত্বই ভারতের জন্য প্রকৃত সত্য।
ভারতনির্ভর বাংলাদেশ না বাংলাদেশনির্ভর ভারত? নৌবন্দর, সমুদ্রবন্দর চাই, আকাশ-রেল-সড়ক-নৌপথ চাই। পণ্যের মুক্তবাজার চাই। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে শর্তহীন সমর্থন চাই। অভিন্ন নদীর পানির একতরফা নিয়ন্ত্রণ চাই। সংখ্যালঘু দলনে মৌন সমর্থন চাই। খেলার মাঠে হেরে গিয়ে জিততে চাই। সর্বোপরি যুদ্ধ, সঙ্ঘাতে বাংলাদেশকে ব্যবহারের অধিকার চাই। এত ‘চাই’-এর বিনিময়ে বাংলাদেশ শুধু ৫ জানুয়ারি আদলের নির্বাচনের প্রতি সমর্থনই যথেষ্ট মনে করতে পারে কি?
ভারতের প্রধান সেনাপতি বিপিন রাওয়াত সম্প্রতি সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। স্মরণীয় ভারতের সাবেক জেনারেল জ্যাকবের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের উষ্ণ সফরের পরপরই পিলখানা ট্র্যাজেডি জাতিকে কাঁদিয়ে গেল না, শুধু এখনো কাঁদায়। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাওয়া ভিন্ন বাস্তবতা। কিন্তু সেই শান্তিবাহিনী থেকে শুরু করে আমাদের ঘর তো পুড়ছেই, তার পরও সিঁদুরে মেঘ ভেবে নিরুর মতো বাঁশির সুরে বিভোর-মশগুল থাকলে রোম পোড়া বন্ধ থাকবে কি? পিলখানার মর্মান্তিক ঘটনার নায়কদের চিনতে পারলেও ধরতে পারল কি বাংলাদেশ? সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ খোলাখুলি জেনারেল মইনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। রহস্য উদঘাটনে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে বললেন। কিন্তু আমরা তা পারলাম না। রিমান্ডে নেয়া হলো পিন্টুকে। কারণ তার নৌকায় বিদ্রোহীরা নাকি নদী পার হয়েছিল। কিন্তু যাদের অবহেলায় বা পরিকল্পনায় আট হাজার বিদ্রোহী বিবি-সন্তান নিয়ে দেয়ালঘেরা পিলখানা থেকে পালিয়ে গেল, তাদের কিছুই হলো না।
প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাচ্ছেন ভালো কথা, মইনের মতো ঘোড়া-খচ্চর নিয়ে ফিরবেন না আশা করি। ওরা যখন আমাদের দুর্বল সমরশক্তিকে চাঙ্গা করতে এতই পেরেশান, ওদের আণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দিয়েই তা করুক। ভাঙা আর মরিচা ধরা রাইফেল-বন্দুকে আমাদের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই ওদের শিক্ষানবিস হওয়ারও, যারা পেরে ওঠে না পাকিস্তানিদের সাথে। ওদের শত শত টন গম-চাল আজো খুঁজলে গুদামে পাওয়া যেতে পারে, যা আমরা খাওয়াতে পারিনি গরু-ছাগলকেও। ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার জন্য দিল্লির মন নয়, বরং জনগণের মর্জির ওপর নির্ভর করুন। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটির ওপর আর একবার চোখ বুলিয়ে নিন। ভারতীয়দের মন-মানস ও কূটকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান সফরের পাথেয় করে নিন। অকপটে অসঙ্কোচে বলে দিন আমাদের সিংহশাবকদের পায়ে শিকল পরানোর ভয়ঙ্কর অপচেষ্টা যেন না করা হয়। অপ্রাসঙ্গিক হলেও মোদিকে একান্ত বৈঠকে সংখ্যালঘু দমন-নিপীড়ন ও পুড়ে মারার ঘটনায় বাংলাদেশের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে দিন, যেমন জানিয়েছিলেন মোদি নিজেও।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫