ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

বন্ধুত্ব চাই তবে সামরিক চুক্তির দ্বারা নয়

গোলাম মাওলা রনি

০৬ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৫২


গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি

প্রিন্ট

রাজনীতির বাজারে জোর গুজব- ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সামরিক চুক্তি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালীন আরো অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে মূলত সামরিক চুক্তিই মুখ্য বলে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাদের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। বিষয়টি ভারতের জন্য একটি কৌশলগত মহাবিজয়। অন্য দিকে বাংলাদেশের জন্য যারপরনাই স্পর্শকাতর ও আত্মঘাতী। সামরিক চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক মাধ্যমে তেমন স্পষ্ট করে কিছুই প্রকাশিত হচ্ছে না। শাসক দলও কিছু বলছে না। অন্য দিকে ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে সামরিক চুক্তি নিয়ে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের সচেতন মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশঙ্কা এবং আমজনতার মধ্যে বহুমুখী গুজব ছড়িয়ে পড়েছে মহামারীরূপে।
ভারতের সঙ্গে যেকোনো সামরিক চুক্তি কিংবা সমঝোতার সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জাতিগত মানমর্যাদা এবং দেশের স্পর্শকাতর সশস্ত্রবাহিনীগুলোর অস্তিত্ব জড়িত। আওয়ামী লীগকে ভারতপন্থী রাজনৈতিক দল বলে গালি দেয়া হয় অহরহ। কিন্তু ১৯৬২ সাল থেকে আজ অবধি আওয়ামী লীগ ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল, বামপন্থী নকশাল, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ দ্বারা যতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও নাজেহাল হয়েছে তা বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল তো দূরের কথা- ভারতের অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক দলের কপালেও জোটেনি। মুক্তযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি এবং নিজেদের তাঁবেদারি স্বার্থ বজায় রাখার জন্য ভারত মুক্তিযোদ্ধা, প্রবাসী সরকার, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের মধ্যে একাধিক গ্রুপ-উপগ্রুপ সৃষ্টি করে ছিল। ফলে আমাদের মহান মুক্তযুদ্ধে অকারণ রক্তারক্তি, হানাহানি, হত্যা, গুম ইত্যাদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল এবং মুক্তযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু সরকারে এবং আওয়ামী লীগে মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবাসী সরকারকে ভারত যেভাবে অপমান করেছে তা ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধু সরকারকে তাঁবেদারি সরকারে পরিণত করার জন্য যে অনৈতিক কর্মগুলো পর্দার আড়াল থেকে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো করেছে তা তৎকালীন জাসদ, সর্বহারা পার্টি, নকশাল এবং বামঘরানার গুপ্ত দলগুলোর তৎপরতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে। পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী বিনিময়, বাংলাদেশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট এবং খুলনা অঞ্চলে মেজর জলিলের বিদ্রোহ করার নেপথ্যের ঘটনার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের যে অপমান এবং রাষ্ট্রটিকে হেয়প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার নীলনকশার বীজ ছিল তা দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বহুবার আলোচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যর্থতা, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ভারতের কতটুকু সংশ্লিষ্টতা ছিল তার খতিয়ান দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বহুবার বহুভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
ভারতের প্রধান রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের হালহকিতের একটি নমুনা সম্প্রতি দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। ‘র’ কী করতে পারে অথবা কী করে তা প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ২০০১ সালে ‘র’-এর কথামতো কাজ না করায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে দেয়নি ‘র’। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, রাজনীতি এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত ‘র’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগটি যেকোনো বিচারে অমার্জনীয় অপরাধ এবং দেশের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের গুজবে সারা দেশের শান্তিপ্রিয় এবং দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মতো খোদ আওয়ামী লীগের কোটি কোটি অন্তঃপ্রাণ নেতাকর্মী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারণ তাদের স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ওআইসি সম্মেলনে যোগদানের পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহের নির্মম স্মৃতি রয়েছে।
বর্তমান সরকার বলতে দেশ-বিদেশের সবাই শুধু প্রধানমন্ত্রীকে বুঝে থাকেন। তার মন্ত্রিপরিষদের কোনো সদস্য, উপদেষ্টা কিংবা ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক আমলা রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয় কেবল ততটুকু জানেন যতটুকু প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে জানান। গত সাত বছরে তাদের চিন্তা-চেতনা, অভ্যাস, রুচিবোধ এবং শক্তি-সামর্থ্য প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে এমনটাই খাপ খেয়ে গেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিত ছাড়া তারা মুখ খোলেন না- নড়াচড়া করেন না- এমনকি চিন্তাও করেন না। দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের তথাকথিত ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ক্ষমতার নমুনা সম্পর্কে যতটুকু জেনেছে তাতে এ কথা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যায়, তারা সামরিক চুক্তিটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। এ ব্যাপারে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- সব কিছু প্রধানমন্ত্রী জানেন। আপনাদের উচিত তার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখা। সমালোচকেরা বলেন- ‘প্রকৃত ঘটনা হলো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও চুক্তির ব্যাপারে কিছু জানেন না।’
আমি প্রধানমন্ত্রীর সমালোচকদের মতো আগবাড়িয়ে কিছু বলতে যাবো না। আবার চুক্তি সম্পর্কে তার মনোভাব না বুঝে অকারণ দালালি ও গুলবাজি করে চুক্তির পক্ষে ফিরিস্তি গাইতেও যাবো না। আমি কেবল আমার নেত্রীর শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত সামরিক চুক্তির বিপদ-আপদ সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত তুলে ধরব এবং আশা করব, আমার নেত্রী তার মহান পিতার মতো দৃঢ়তা নিয়ে কূটনৈতিকভাবে ভারতকে মোকাবেলা করবেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার, পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের হয়ে সবার আগে ভারত না গিয়ে লন্ডন হয়ে ভারত গমন এবং সেই যাত্রার জন্য ভারত সরকারের বরাদ্দ করা উড়োজাহাজ পরিহার করে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ সরকারের বিমান ব্যবহারের যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা তার ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা, বিচক্ষণতা, দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। আমি আশা করব, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবশই তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন।
সামরিক চুক্তি বা কোনো সামরিক চুক্তির সমঝোতা শুধু ভারত নয়- এই মুহূর্তে অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গেও করা যাবে না। গত ৫০ বছরে বিশ্বের যেসব দেশ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সামরিক চুক্তি করেছিল, তারা সবাই চুক্তির কবলে পড়ে হয় হাহাকার করছে নতুবা নিজেরা শেষ হয়ে গেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সামরিক চুক্তির কারণে দেশগুলো রাজনৈতিকভাবে যেমন একঘরে ও দেউলিয়া হয়ে পড়েছে তেমনি তাদের অর্থনীতি, সমাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ নিদারুণ এক পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আরব বসন্তে ধ্বংস হয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলোকে তাদের বন্ধুরাষ্ট্র যেমন রক্ষা করতে পারেনি তেমনি রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ ওয়ারশভুক্ত পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারকে বিপদের সময় একটুও রক্ষা করতে পারেনি।
বর্তমানের আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও পাকিস্তানের করুণ পরিণতির মূল কারণ হলো সে দেশের শাসকগোষ্ঠী একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে জাতীয় স্বার্থ বিলিয়ে দিয়ে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কোনো বৃহৎশক্তির তাঁবেদারে পরিণত করেছিল। আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ এবং মিয়ানমার ভারত ও চীনের তাঁবেদারি করতে গিয়ে কতটা মূল্য দিয়েছে তা অবশ্যই আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুব ভালো করে জানেন।
প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লাখ কোটি মানুষের আত্মত্যাগ এবং শত বছরের সাধনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সেটি বিসর্জন দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে পুরো জাতিকে আবদ্ধ করার জন্য একজন মানুষের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গভঙ্গ যেমন একজন মানুষের সিদ্ধান্তে হয়েছিল তেমনি দক্ষিণ ভারতের লৌহমানব বলে পরিচিত এবং ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মানসপিতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের একগুঁয়েমি ও একরোখা আচরণের কারণে ভারত ও পাকিস্তান দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ভারতীয়দের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য পূর্ববঙ্গ প্রথমে আসামকে হারায়- পরে সিলেট জেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ করিমগঞ্জকে হারিয়ে ফেলে। কাশ্মির ও সিকিমের পরাধীনতার কাহিনী তো রীতিমতো কিংবদন্তি হয়ে আছে।
ভারতের অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের জন্য সেই অনাদিকাল থেকে দেশটির কট্টরপন্থী হিন্দু শাসকগোষ্ঠী নিন্দিত হয়ে আসছে। মহাভারতের সময়কাল থেকে আজ অবধি ভারতের শাসকগোষ্ঠী এবং গোত্রপতিদের ধর্মান্ধ ও উগ্রতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। গাই-গরুকে নিজেদের মা দাবি করে গোমূত্রের পবিত্রতা রক্ষা এবং গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকারের পাশাপাশি মুসলমানদের দেশ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার উগ্র স্লোগান তুলে কয়ে দশক ধরে বিজেপি, শিবসেনা প্রভৃতি দলের ক্ষমতা লাভ রাষ্ট্রটিকে বিশ্বের সর্বকালের উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রীয় মদদে গরুর মূত্রের ওপর গবেষণা করার জন্য পিএইচডি প্রদান এবং সেই অনুষ্ঠানে যেখানে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থাকেন সেখানে ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করা বাতুলতা মাত্র। ফ্রিজে গো-মাংস রয়েছে এমন সন্দেহে উগ্রবাদী হিন্দুরা যেখানে একটি পরিবারকে নির্মমভাবে মেরে ফেলতে পারে সেখানে গণতন্ত্র, সুশাসন কিংবা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা কোন পর্যায়ে তা সহজেই অনুমেয়।
একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সামরিক ক্ষেত্রে ভারতের সাথে আমাদের যদি সহনীয়পর্যায়ে বিরোধ থাকে তবে তা আমাদের জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু জেনেছি তাতে মনে হয়েছে- স্বাধীন, সার্বভৌম ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টেকে না- যেমনটি টেকেনি অতীতে। জাতি-গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য নিজস্ব সামরিক শক্তির বিকল্প নেই। অন্য দিকে প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা না থাকলে কোনো দিন কোনো রাষ্ট্রে কার্যকর সামরিক বাহিনী গড়ে ওঠে না। মাস্টার সান ঝু, জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, হানিবল বার্কা ও খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক প্রতিভার অধিকারীদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা তাদের বাহিনীকে সব সময় এবং সর্বাবস্থায় কঠোর অনুশীলন ও সীমাহীন প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টির মাধ্যমে প্রায়ই অসমযুদ্ধে পাঠিয়ে জয় লাভ করেছেন।
আমাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী কোনো দিন উগান্ডার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ কিংবা চীন-জাপান-রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের কথা বলে তাদের প্রশিক্ষিত করা হয় না। রূঢ় হলেও সত্য- আমাদের সশস্ত্রবাহিনী ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহত করতে জল, স্থল ও নাভোমণ্ডলে প্রশিক্ষণকর্ম চালিয়ে আসছে। তাদের কৌশলগত শিক্ষায় টার্গেটের শত্রু হিসেবে ভারত ও মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষাকার্যক্রম চলে। কাজেই ভারতের সাথে যেকোনো সামরিক সমঝোতা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ ক্রয় কিংবা সামরিক মহড়া আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বর্তমান সরকার কোনো দেশের কোনো কালের ইতিহাসের একটি নজিরও দেখাতে পারবে না, যেখানে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষদ্বয় একসাথে সামরিক মহড়া করেছে। সামরিক তথ্য বিনিময় বা সমঝোতা করেছে।
সরকার হয়তো বলবে- আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ চাই। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ইতিহাসের করুণ কাহিনীগুলো থেকে শিক্ষা নেয়ার পরামর্শ দেবো। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সাথে সহাবস্থানের জন্য অনেক সামন্ত রাজা, নবাব, জমিদার প্রমুখেরা নিজের প্রাণপ্রিয় কন্যা ও পাগড়ি উপহার হিসেবে পাঠানোর পরও কোনো দিন এবং কোনোকালে নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি। ইতিহাস কন্যা ও পাগড়ি সম্প্রদানকারী কোনো দুর্বলচিত্তের মানুষকে স্মরণ রাখেনি। ইতিহাস যুগে যুগে চাঁদ সুলতানা, শিবাজি, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, হো চি মিন বা চিয়াং কাইসেকের মতো মানুষকে মনে রাখে।
আওয়ামী লীগ সরকার কেনো ভারতকে তাদের নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা ক্ষমতায় বসে থাকার, ক্ষমতায় আসার বা পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার নিয়ামক মনে করছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। ভারতের সাধারণ নীতি হলো- বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলকে ছলে-বলে-কৌশলে নিজেদের কব্জায় এনে নিজেদের স্বার্থ কায়েম করা। একমাত্র বঙ্গবন্ধু সরকার এবং ১৯৯৬ সালের শেখ হাসিনার সরকার আংশিক হলেও ভারতের চিরায়ত সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব রুখে দিয়েছিল। অন্য দিকে সব আমলের সব সরকারের সাথেই ভারতের দহরম-মহরম সম্পর্ক ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো- বাংলাদেশের কোনো সরকারকেই ভারত ক্ষমতায় আনেনি বা ক্ষমতা থেকে বিদায় করেনি এবং কোনো সরকারের বিপদকালে ভারত তাদের পাশে দাঁড়ায়নি।
অনেকে হয়তো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভারত সরকারের বেপরোয়া সমর্থনের প্রসঙ্গ টানবেন। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনের মত হলো- ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় যদি বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় থাকত এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকত তবে ভারত তাই করত, যা তারা করেছে আওয়ামী লীগের পক্ষে। আওয়ামী লীগ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবতা হলো জনগণ যা ধারণা করে, প্রকৃত ঘটনা কিন্তু তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর যে ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও জেদি মনোভাব তা কোনো মতেই ভারতের দাদারা বরদাশত করেন না, যেমনটি করতেন না ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে।
আওয়ামী লীগ যদি স্বেচ্ছায় ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি করে তবে তা হবে দলটির জন্য আত্মঘাতী। অন্য দিকে ভারত যদি চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য চাপ প্রয়োগ করে তবে ধরে নিতে হবে তারা এই চুক্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে শেষ করতে চায় অথবা নাজেহাল করে অনুগত তাঁবেদার বানিয়ে রাখতে চায়। আওয়ামী লীগের উচিত বংলাদেশের জনগণের আবেগ-অনুভূতি এবং তাদের প্রচলিত ধারণার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। জনগণের মতামতে যদি কোনো ত্রুটি থাকে তবে সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে সর্বোচ্চ মেধা খাটিয়ে তা সংশোধন করতে হয়। জনগণের সাথে তাড়াহুড়ো করলে বা ধৈর্য হারিয়ে ফেললে কিংবা জেদ দেখালে ফলাফল সব সময় হিতে বিপরীত হয়।
এ দেশের সব শান্তিপূর্ণ মানুষ ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চায়- তবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে এবং কোনো অবস্থাতেই সামরিক চুক্তি বা সমঝোতা চায় না। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নাক গলানো এবং ভারতীয় পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এড়িয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের খবর প্রকাশিত হওয়া, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার মানহানিকর সংবাদ পরিবেশনকে আওয়ামী লীগ কিভাবে নেয় তা জানি না। তবে দেশবাসী যে ভালোভাবে নেয় না তা দিব্যি করে বলতে পারি। ইদানীং ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের দেবত্ব লাভ এবং দেশের সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিবিদদের ঘন ঘন দূতাবাস গমনের দৃশ্য দেখলে কেন জানি রেজা শাহ পাহলভির শেষ জমানায় ইরানে মার্কিন দূতাবাসের তৎপরতার কথা মনে আসে। আল্লাহ রক্ষা করুন। তাওবা! তাওবা! আসতাগফিরুল্লাহ!

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫