মানুষের ঘোষিত দুশমন

জাফর আহমাদ

শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শুত্রু। এটিই মানুষের সাথে শয়তানের প্রকৃত পারস্পরিক সম্পর্ক। মানুষের সৃষ্টির আদি ইতিহাস থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এখানে সূরা আরাফের ১১ থেকে ২৫ পর্যন্ত আয়াত সরাসরি আপনাদের সৌজন্যে পেশ করা হলো।
‘আমি তোমাদের (মানুষ) সৃষ্টির সূচনা করলাম, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম। অতঃপর ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সেজদা করো। এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই সিজদা করল। কিন্তু ইবলিস সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না।
আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন : ‘আমি যখন তোকে হুকুম দিয়েছিলাম তখন সিজদা করতে তোকে বাধা দিয়েছিল কিসে?’
সে জবাব দিলো: ‘আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে।’
তিনি বললেন: ‘ঠিক আছে, তুই এখান থেকে নিচে নেমে যা। এখানে অহঙ্কার করার অধিকার তোর নেই। বের হয়ে যা। আসলে তুই এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়।’
সে বললো: ‘আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যখন এদেরকে পুনর্বার ওঠানো হবে।’
তিনি বললেন: ‘তোকে অবকাশ দেয়া হলো।’
সে বললো: ‘তুমি যেমন আমাকে গোমরাহিতে নিক্ষেপ করেছো তেমনি আমিও এখন তোমার সরল সত্য পথে এ লোকদের জন্য ওঁৎ পেতে থাকবো, সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে, সবদিক থেকে এদের ঘিরে ধরবো এবং অধিকাংশকে তুমি শোকর গুজার করতে পাবে না।’
আল্লাহ বললেন: ‘বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত অবস্থায়। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখিস, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরে দেবো। আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দু’জনাই এ জান্নাতে থাকো। যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’
তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের পরস্পর থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিলো। সে তাদেরকে বললো: ‘তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোনো কারণ নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেস্তা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো।’ আর সে কসম খেয়ে তাদেরকে বললো আমি তোমাদের যথার্থ কল্যাণকামী।
এভাবে প্রতারণা করে সে তাদের দু’জনকে ধীরে ধীরে নিজের পথে নিয়ে এলো। অবশেষে যখন তারা সেই গাছের ফল আস্বাদন করলো, তাদের লজ্জাস্থান পরস্পরের সামনে খুলে গেল এবং তারা নিজেদের শরীর ঢাকতে লাগলো জান্নাতের.... পাতা দিয়ে।
তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন: ‘আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে মানা করিনি এবং বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শুত্রু?’ তারা দু’জন বলে উঠলো, ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। এখন যদি তুমি ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।’
তিনি বললেন: ‘নেমে যাও তোমরা পরস্পরের শুত্রু এবং তোমাদের জন্য একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত পৃথিবীতেই রয়েছে বসবাসের জায়গা ও জীবন যাপনের উপকরণ।’ আর বললেন, ‘যেখানেই তোমাদের জীবন যাপন করতে এবং সেখানেই মরতে হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের সবশেষে আবার বের করে আনা হবে।’
এই হলো সূরা আরাফের ১১-২৫ সরাসরি উপস্থাপন। আরো প্রত্যক্ষ করেছেন মানুষের সাথে শয়তানের সম্পর্ক। লক্ষ করেছেন শয়তানের প্রকাশ্য শুত্রুতা ও তার চ্যালেঞ্জ। মানুষ জাতির প্রকাশ্য শত্রু শয়তান এমন কি মানুষের যারা তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে, শয়তান তাদেরও শত্রু। কার্যসিদ্ধির পর অর্থাৎ পুরোপুরি গোমরাহিতে নিমজ্জিত করে শয়তান তার থেকে পালিয়ে যায়।
উল্লিখিত আয়াতে শয়তান বা ইবলিসের পরিচিতি নেই। ইবলিস মূলত জীনদের থেকে আগত। আর জীন জাতি আগুনের তৈরি। এ জন্য সে আল্লাহর প্রশ্নের জবাবে দম্ভাকারে বলেছিল: ‘আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে।’
উল্লিখিত আয়াতে শয়তানের চ্যালেঞ্জ যাদের ওপর বাস্তবায়িত হবে, তাদের ব্যাপারে একটি মজার বিষয় হলো, কিয়ামতের দিনে বিপথগামী করার কাজটি শয়তান অস্বীকার করবে। অর্থাৎ শয়তান তার অনুসারীদের কারো দায়দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। সূরা ইবরাহিম চতুর্থ রুকুতে শয়তানের উক্তিটি সরাসরি উপস্থাপিত হয়েছে: ‘তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জবরদস্তি ছিল না, আমার অনুসরণ করার জন্য আমি তোমাদের বাধ্য করিনি। আমি তোমাদেরকে আমার পথের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলাম, এর বেশি কিছুই করিনি। আর তোমরা আমার আহ্বান গ্রহণ করেছিলে। কাজেই এখন আমাকে তিরস্কার করো না বরং তোমাদের নিজেদেরকে তিরস্কার করো।’
লেখক : প্রবন্ধকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.