ঢাকা, শনিবার,২৭ মে ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

ঈমানদার বাদশাহ

আ ন ম আবদুল মান্নান

০৬ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:০৮


প্রিন্ট

বাদশাহ আওরঙ্গজেব ছিলেন মোগল বংশের সর্বশ্রষ্ঠ নরপতি। তিনি স্বীয় বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার দ্বারা মোগল সাম্রাজ্যের চরম বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন এবং তার ইন্তেকাল পর্যন্ত মোগল শক্তির যশ ও প্রতিপত্তি অটুট ছিল। তিনি গণমুখী শাসননীতি ও উত্তম চরিত্রের জন্য বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করেন। তার পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ মহীউদ্দীন আওরঙ্গজেব আলমগীর।
তার বাবা দিল্লির মহান বাদশাহ শাহজাহান, আর মা ছিলেন বেগম আর্জুমান্দ না¤œী খান্দানি উচ্চশিক্ষিতা মহিলা। তিনি যেমনই বিদূষী ও গুণবতী ছিলেন তেমনই ছিলেন অপরিসীম রূপবতী। সম্রাট শাহজাহান স্ত্রী আর্জুমান্দ তথা মমতাজমহলকে খুব ভালোবাসতেন। মৃত্যু কালে মমতাজমহল তার চারটি ছেলে রেখে যান। তারা হলেন- দ্বারা, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ। ছেলেরা প্রায় সবাই ধীশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে আওরঙ্গজেব ছিলেন সর্বাধিক মেধাবী। তিনি যোগ্যতার সাথে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন। বিশেষত, তিনি আরবি ও ফার্সি ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কুরআন শরিফ হিফজ করেন এবং হাদিস শাস্ত্রে যথেষ্ট বুৎপত্তি লাভ করেন। বাল্যকাল থেকে তার মধ্যে তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা, কর্মদক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল।
তা ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ থেকেই তিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু ছিলেন। অল্প বয়সেও তিনি নামাজ-রোজা তরখ করেননি। তার চরিত্র এভাবেই গড়ে ওঠার পেছনে অবশ্য বিশেষ কারণও ছিল। অল্প বয়সেই তিনি কিছু ধার্মিক ও বুজুর্গ ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, উপদেশ এবং চারিত্রিক গুণাবলি দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। বিনয়ী, নম্রতা, সততা, সৎ সাহস, পরহেজগারি এবং ধর্মভীরুতা প্রভৃতি গুণে তিনি বাল্যকাল থেকেই নিজেকে খাঁটি মুসলমানে পরিণত করে নিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে তার অপর ভাইদের মধ্যে এসব গুণ এভাবে ছিল না।
আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেই সর্বপ্রথম নিজ পরিবার-পরিজনের মধ্যে পূর্ণ ইসলামি জীবনব্যবস্থার প্রচলন করেন। মোগল হেরেমের ঐতিহ্যগত বান্দিদাসীর প্রথা বিলোপ করেন। অন্তঃপুরে মহিলাদের মধ্যে নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি এবং ধর্মীয় রীতিনীতির প্রশিক্ষণ শুরু হয়। যেকোনো রকম বিলাসিতা ও জাঁকজমক প্রিয়তার মূলোচ্ছেদ করে তিনি ফকিরি ধারার প্রবর্তন করেন। এভাবে রাজপরিবারের জীবনযাপনের ধারা পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজ্যে মুসলিম প্রজাদের প্রতি ইসলামি অনুশাসন মেনে চলার নির্দেশ জারি করেন। ফলে তার রাজত্বকালে সমগ্র ভারতে ইসলাম স্বীয় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। হিন্দু কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তিনি কোনো অবিচার করেননি। প্রজা হিসেবে দেশের যেকোনো ধর্মের লোকদের প্রতি ছিল তার সমান দৃষ্টি এবং ন্যায়নীতি সম্পন্ন।
তার ওস্তাদদের মধ্যে কিছু শুধু জাহেরি আলেমই ছিলেন না বরং বাতেনি ইলমেও ছিলেন পারদর্শী। বাদশাহ আলমগীর ওই সব কামেল বুজুুর্গ আলেমদের কাছে জাহেরি ও বাতেনি ইলমে কামালিয়াত হাসেল করেন। তার জীবন কাহিনীতে বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার সমাবেশ রয়েছে। হজরত মোল্লা জিউন রহ: নামক একজন অতি উচ্চস্তরের বুজুর্গ দরবেশ ছিলেন তার বাতেনি ইলমের ওস্তাদ। বাদশাহ আলমগীরের ওস্তাদ হজরত মোল্লা জিউন রহ. সংশ্লিষ্ট ঘটনা বড়ই প্রণিধানযোগ্য।
হজরত মোল্লা জিউন রহ: ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। তার একটি বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে ছিল কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে তাকে পাত্রস্থ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে তিনি তার পুরনো শিষ্য বাদশাহ আলমগীরের কাছে বিষয়টি উল্লেখ করেন। বাদশাহ দেখলেন রাজ কোষাগারের অর্থ সন্দেহজনক, তাই তিনি তা থেকে এক কপর্দকও গ্রহণ করতেন না। সেখান থেকে কি করে নিজ পীরকে কোষাগার থেকে অর্থ সাহায্য করবেন। নানা রূপ চিন্তাভাবনার পর শেষ পর্যন্ত নিজ পরিশ্রমলব্ধ চার আনা পয়সা স্বীয় ওস্তাদের হাতে দিলেন। মেয়ের বিয়ের খরচের তুলনায় চার আনা পয়সা একেবারেই হাস্যকর বৈ কিছু নয়। এতে মোল্লা জিউনের মন দমে গেলেও এক সময়ের প্রিয় শিষ্যের দান গ্রহণ না করে পারলেন না। এই চার আনা পয়সা নিয়ে গৃহ অভিমুখে রওনা হলেন। পথে মনে মনে চিন্তা করলেন, এ চার আনা পয়সা দিয়ে কি করবেন, শিষ্য এত বড় রাজ্যের অধিপতি, তার কাছে এসেছিলাম কন্যার বিবাহ দেয়ার একটা উপায় করে দিবে কিন্তু তা হলো না। যা হোক, আল্লাহ পাক ভাগ্যে যা লিখেছেন, তাই হবে। এ কথা ভাবতে ভাবতে পথ চলতে লাগলেন। কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর তিনি দেখতে পেলেন রাস্তার পাশে একটি লোক একটি বিরাট মাছ বিক্রয় করার জন্য বসে আছেন। বেলা শেষ খরিদ্দার না পেয়ে লোকটি মনস্থ করল- কোনো লোক মাছের যে মূল্যই বলে তাতেই সে তা বিক্রি করে দেবে। এ দিকে মোল্লা জিউন তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেই মাছওয়ালা তাকে মাছ কিনে নিতে আহ্বান জানাল। তিনি বললেন, তোমার কাছ থেকে মাছ খরিদ করার মূল্য আমার কাছে নেই। মাছওয়ালা বলল, আরে আপনার কাছে যা আছে তাই দিন। মোল্লা জিউন রহ: তার কাছে যে চার আনা পয়সা তা দিয়ে অনেক বেশি দামের মাছটি খরিদ করে গৃহে পৌঁছে বিবিকে রান্না করতে বললেন। বিবি মাছটি কাটতে গিয়ে এর পেটের মধ্যে কতগুলো মুক্তার দানা দেখতে পেলেন, ওইগুলো চকমক করছিল। তিনি এতে বিস্ময়বোধ করে স্বীয় স্বামীকে ডেকে দেখালেন। তিনিও তা দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
এগুলো কি জিনিস তা পরীক্ষা করার জন্য মোল্লা জিউন রহ: একটি দানা সাথে করে নিকটস্থ বাজারে এক জহুরির দোকানে গিয়ে জহুরিকে দানাটি দেখালেন। জহুরি তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন, সত্যই এটি অতি মূল্যবান মুক্তা। সে বলল, আপনি যদি এটি বিক্রি করেন তবে আমি একশত দিনার মূল্যে কিনতে পারি। তিনি তাতেই রাজি হলেন এবং ওই দিনারগুলো দিয়ে পরম স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে কন্যার বিবাহ কার্য সমাধা কররেন। তারপর বাকি মুক্তার দানাগুলো নিয়ে শিষ্য বাদশাহ আলমগীরের দরবারে গিয়ে দানাগুলো তার হাতে দিয়ে ঘটনা আদ্যপান্ত বর্ণনা করলেন।
বাদশাহ এতদশ্রবণে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন আর বললেন উস্তাদজী! এ মুক্তাগুলো আপনি আমার হাতে দিলেন কেন? এগুলোর মালিক তো আপনি, এতে আমার কোনো অধিকার নেই। তবে এরূপ হওয়ার কারণ বলতে পারেন? আমার তো মনে হয় ‘হালাল মালের বরকত।’
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মাত্র চার আনা পয়সা আমি আপনাকে কেন দিলাম? অথচ রাজকোষাগার থেকে যথোপযুক্ত অর্থ দিলাম না কেন? হুজুর যে কোষাগারের অর্থ আমি নিজে গ্রহণ করি না, তাই আপনি আমার উস্তাদ হিসেবে আপনার জন্যও তা গ্রহণ করা আমি পছন্দ করিনি। উল্লেখ্য ঘটনাটি বাদশাহ আলমগীরের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
বাদশাহ আলমগীর দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক রা: এর হুবহু অনুসারী রূপে এক বিশাল সম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও একজন সাধারণ ফকিরের মতো চলতেন। তার খাদ্য-খাবার এবং পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল একেবারে মামুলী। জনগণ তাকে ‘ফকির বাদশাহ এবং জিন্দাপীর’ নামে আখ্যায়িত করতেন। তার মাথায় এত বড় রাজ্য শাসনের দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকা সত্ত্বেও প্রত্যহ দিনরাত নিয়মিত নফল নামাজ ও তাসবিহ-তাহলিল আদায় করতেন। রাতে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমাতেন আর অবশিষ্ট রাত আল্লাহর ইবাদতে কাটাতেন। সারা রাত রুকু-সিজদায় লিপ্ত থাকার দরুণ তার সুদীর্ঘ দেহখানা সামনের দিকে হেলে গিয়েছিল। তাই কবি বলছেনÑ
আলমগীর জিন্দাপীর নহে মিথ্যা নহে
হে সম্রাট। তুমি কবু বিলাসের মোহে
আচ্ছন্ন করোনি নিজে।
রাজ কোষাগারে বিপুল পরিমাণ ধনরত্ন মজুদ ছিল, কিন্তু নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য একটি কপর্দকও গ্রহণ করতেন না। তার হস্তাক্ষর ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তাই নিজ হাতে কুরআন শরিফ নকল করে এবং টুপি সেলাই করে উপার্জিত অর্থ দ্বারা নিজ পরিবারের খরচ বহন করতেন। আর এটাই তিনি নিজের জন্য হালাল মনে করতেন।
তার কুরআন নকল ও টুপি সেলাই করা বিক্রয়লব্ধ টাকা দু’টি কৌটায় সঞ্চিত রাখতেন। মৃত্যুকালে কুরআন নকলকৃত সঞ্চিত কৌটায় ছিল চার টাকা দুই আনা আর টুপি সেলাইকৃত সঞ্চিত কৌটায় ছিল চৌদ্দ আনা সর্বমোট পাঁচ টাকা। এই হালাল উপার্জিত অর্থ দ্বারাই তার দাফন-কাফনের কাজ সমাধা করার জন্য তিনি তার সন্তানকে অসিয়ত করে যান। সেই অসিয়ত অনুযায়ীই তার কাফন-দাফন করা হয়।
বাদশাহ শাহজাহনের অমর কীর্তি হচ্ছে আগ্রার ‘তাজমহল’, যা নির্মাণ করতে ২০ হাজার লোকের বাইশ বছর লেগেছে আর তাতে খরচ হয়েছে তৎকালীন ৯ কোটি টাকা, যা ইসলাম কিংবা মুসলমানের কোনো উপকারে আসেনি। আর তার ছেলে বাদশাহ আলমগীর যিনি ধর্মীয় জগতের অক্ষয় কীর্তি হিসেবে ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ নামক গ্রন্থখানা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অমূল্য সম্পদ হিসেবে রেখে গিয়েছেন। যার অমৃত সুধা পান করে জগতের মুসলিম সম্প্রদায় পরিতৃপ্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রায় সাত শত ওলামায়ে কেরামের সক্রিয় ও সহযোগতিায় সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় গ্রন্থ ও ফতোয়ায়ে আলমগীরও রচিত হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫