ঢাকা, শনিবার,১৯ আগস্ট ২০১৭

ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব

মুদ্রা সংগ্রাহক লিয়াকত আলী খান

আব্দুর রাজ্জাক

০১ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৭:৩২ | আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৭:৪০


প্রিন্ট

মানুষ শখের বশে কত কি-ই যে করেন। মনের ভেতরের গুণগুলো অনেকেই সযতনে লালন করেন নিভৃতে-নীরবে। ৬১ বছরে পা দেয়া তেমনি একজন ব্যতিক্রমী স্বপ্নচারী মানুষ লিয়াকত আলী খান। তার কর্ম পরিধিই তাকে এনে দিয়েছে আট-দশজন মানুষের চেয়ে ভিন্ন পরিচিতি। মানিকগঞ্জ জেলা শহরের পোড়রা এলাকায় তার বাড়ি।

লিয়াকত আলী খানের সংগ্রহের শুরুর কথা : ১৯৪৮ সালের ৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন লিয়াকত আলী। পড়াশোনা তার খুব একটা করা হয়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করা হয়নি তার। মুক্তিযুদ্ধের আগে জেলা শহরের বাজার সেতুর কাছে বাবা মাজেদ আলী খানের চায়ের দোকান ছিল। সে সময় শিশু লিয়াকত চায়ের দোকানে বাবাকে সহযোগিতা করতেন। তখন বয়স আট কী দশ বছর। একদিন বাড়ি থেকে বাবার চায়ের দোকানে যাওয়ার পথে ব্রিটিশ আমলের এক পয়সার একটি রৌপ্য মুদ্রা কুড়িয়ে পান। মহামূল্যবান ভেবে সযত্নে রেখে দেন। মুদ্রাটিকে মহা মূল্যবান মনে করে বড়দের চোখ এড়িয়ে সেটি নিয়ে দুরুদুরু বুকে হাজির হয়েছিল স্যাকরার দোকানে। নাম ভুলে যাওয়া সোনা-রুপার সে ব্যবসায়ী সেদিন কুড়িয়ে পাওয়া মুদ্রাটি ফিরিয়ে দিয়ে তাকে বলেছিল, এটি কেনা যাবে না। এমন আরো কয়েকটি জমলে তার পর এসো। এ ঘটনা থেকে তার মনে চিন্তা আসে, কিভাবে আরো মুদ্রা জোগাড় করা যায়। যেই চিন্তা সেই কাজ। আশপাশের পরিচিত-অপরিচিত মানুষদের কাছ থেকে একটি-দুটি করে জোগাড় করতে থাকেন দেশ-বিদেশের ধাতব মুদ্রা। কিন্তু এরই মধ্যে কখন যে এসব মুদ্রার প্রতি মায়া জন্মেছিল, টের পাননি লিয়াকত আলী। এরপর থেকে মুদ্রা সংগ্রহ করা নেশায় পরিণত হয়ে গেল। প্রথম দিকে এসব মুদ্রা তিনি দোকানে সংগ্রহ করে রাখতেন।

বিরল মুদ্রা আর দুর্লভ লটারির টিকিট সংগ্রহ : ১৭০টি দেশের তিন সহস্রাধিক মুদ্রা, কাগুজে নোট আর লটারির টিকিটের দুর্লভ সংগ্রহ আছে লিয়াকত আলী খানের। ১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত সব লটারির টিকিটও রয়েছে তার সংগ্রহশালায়। ‘মুদ্রা সংগ্রহকারী লিয়াকত’ নামেই তিনি মানিকগঞ্জবাসীর কাছে পরিচিত। পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। গত বছর দুই-তিন ধরে অসুস্থ হওয়ায় মানিকগঞ্জ শহরে বাসায় পাখি ও তার সংগ্রহশালা দিয়ে কাটাচ্ছেন প্রায় পুরোটা সময়। ইচ্ছা ছিল সারা বিশ্ব ভ্রমণ করবেন, আর্থিক অসঙ্গতির কারণে সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তাই তো তিনি দেশী-বিদেশী নোট, মুদ্রাসহ গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত সব লটারির টিকিট সংগ্রহ করে বিশ্ব ভ্রমণের শখ মিটিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু মুদ্রাই নয়, মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়ে লিয়াকত আলীর নিজের অজান্তেই লটারি টিকিটের দুর্লভ আরেকটি সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। সহধর্মিণী মারা গেছে কয়েক বছর আগে। পাখি আর সংগ্রহশালাই এখন তার জীবন। নিরাপত্তার কথা ভেবে কোথাও বেড়াতে যান না তিনি। ১৯৬৯ সালের ঘূর্ণিদুর্গতদের সাহায্যার্থে রেডক্রসের এক টাকার লটারির টিকিট থেকে শুরু করে চলতি জানুয়ারি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সাহায্যার্থে বিক্রয় করা লটারির টিকিটও সংগ্রহ করেছেন তিনি। লিয়াকত আলী খানের দাবি, ১৯৬৯ সালের পাকিস্তান থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের অনুমোদিত সবগুলো লটারির টিকিট তার কাছে আছে। তার বিশ্বাস, ধাতব মুদ্রার মতো অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলেও এসব দেশের লটারির টিকিটের একটি ঐতিহাসিক মূল্য নিশ্চয়ই আছে।

পাখির জন্য ভালোবাসা : এই মুদ্রা সংগ্রাহকের ভালোবাসা আছে পাখির প্রতিও। ভোর ৫টায় তার ঘুম ভাঙে পাখির আওয়াজে। প্রতিদিন প্রায় সহস্রাধিক শালিক, দোয়েল, ঘুঘুসহ আরো কয়েক রকম পাখি ভিড় করে বাড়ির উঠানে খাবার খাওয়ার জন্য। লিয়াকত পাখিদের আপ্যায়ন করেন মুড়ি ও চানাচুর দিয়ে। দিনে দিনে পাখির সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এ কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পান তিনি।
লিয়াকত আলীর কথা : ১৯৭২ সালে তার সংগৃহীত সব কিছু চুুরি হলেও আবার তিনি সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নানা জনে নানা কথা বলেছেন, গুরুজনেরা তিরস্কার করেছেন। উপহাস করতে ছাড়েনি অনেকেই, তবুও তার নেশা কাটেনি। বরং নেশা ধরে গিয়েছিল সংগ্রহের। লিয়াকত আলী খান তার মুদ্রা সংগ্রহের এমন তথ্য দেয়ার পাশাপাশি জানান, ‘বিরল মুদ্রার খোঁজ পেয়ে দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গেছি। এমন ও ঘটনা ঘটেছে, পুরেনো এক পয়সার তামার মুদ্রাও কিনেছেন হাজার টাকা দিয়ে। আমার এ নেশার কথা দীর্ঘ দিন গোপন রেখেছি। কিন্তু একসময় বন্ধু -বান্ধব, প্রতিবেশী আত্মীয়রা জেনে গেছেন। গোপন রাখা যায়নি। এতে আমার লাভই হয়েছে। এখন আমার বন্ধু-প্রতিবেশীরাই বিভিন্ন দেশের কয়েন পেলে আমার জন্য তা সংগ্রহ করে রেখে দেন বা আমার বাড়িতে পৌঁছে দেন। চেনা পরিচিত জনের বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পথে সেসব দেশের নতুন-পুরনো মুদ্রা আমার জন্য নিয়ে আসেন। লিয়াকত আলী খান বিশ্বের সব দেশের মুদ্রা সংগ্রহ চেষ্টাকে নিজেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তার বিশ্বাস দু-এক বছরের মধ্যে তার সে স্বপ্ন পূরণ হবে। তার কাছে অনেক মুদ্রা আছে যেসব মুদ্রা কোন সময়ের কোন দেশের তা এখনো তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। অনেককে সেসব দেখিয়েছেনও, কিন্তু কেউ তার রহস্য ভেদ করতে পারেননি। আরবি, ফার্সি, কোনো ভাষার সংঙ্গে এসব মুদ্রার বর্ণ মেলেনি। বেশ কয়েকটি মুদ্রা আছে যেগুলোতে কোনো ধরনের কোনো কিছুই লেখা নেই। ধাতব মুদ্রার সাথে তিনি শতাধিক দেশের কাগজের নোটও সংগ্রহ করেছেন। এসব নোটের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের নোটও রয়েছে।

 

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫