ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

রকমারি

বিশ্ব অটিজম দিবসে সুব্রতর গল্প

এস আর শানু খান

০১ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৭:১৭


প্রিন্ট

‘এ দাদা তুই কনে যাচ্ছির রে? আনিচুর কনে? শোন, তুই বাড়ি যাইয়ে সব ঘর খুঁজে দেখবি আনিচুর বাড়ি আছে নাই। সব ঘর খুঁজেও যদি দেহিস যে আনিচুর বাড়ি নাই তাহলে তুই একটা কাজ করবি! কী কাজ শুনবি! তুই যেহানেই পাস আনিচুরকে বলবি যে, সুব্রত তোরে দেহা করতি কয়ছে। আর একটা কথা শুনবি দাদা আলামিন কি স্কুল মিস্কুলে যাওয়া ছাড়ান দেসে।’ (আনিচুর আমার ছোট ভাই) সুব্রতের সাথে যখনই দেখা হয় এমন কিছু প্রসঙ্গ আপনা-আপনি চলে আসে সুব্রতের মুখ থেকে। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান সুব্রত। তিন ভাইয়ের মধ্যে সুব্রত দ্বিতীয়। বাবা বারুজীবী। নিজেদের পানের বরজ আছে। সেখানে সারা দিন কাম-কাজ করেন। মা গৃহিণী। সুব্রতের বাবা খুবই চুপচাপ একটা মানুষ। ঝুটঝামেলাকে যমের মতো ভয় করে চলেন। সুব্রত এখন ১৬ বছরের এক বালক। কখনো ক্লাস ওয়ানের ছাত্র আবার কখনো বা ক্লাস টু নয়তো মন চাইলে স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফাইভের রুমে বসে থাকে। এমনও অনেক দিন আছে যে, বাড়ি থেকে বইখাতা নিয়ে বের হয়ে সারা গ্রাম চইচই করে ঘুরে বেরিয়েছে; কিন্তু স্কুলের ধারেকাছেও যায়নি।
অথচ সুব্রতের বয়সী সবাই মানে জীবনের প্রথম দিকে সুব্রত যাদের সাথে স্কুলে এসেছিল। তারা সবাই এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে কেউবা আবার এইট-নাইনে পড়ে; কিন্তু সুব্রত এখনো সেই ক্লাস ওয়ান, টু, থ্রি নিয়ে পড়ে আছে।
সুব্রত আমাদের পাশের গ্রামের ছেলে। ওকে বেশ কয়েক বছর আগ থেকেই চিনি। একসময় রোজ সকালে ঘুম ভাঙত সুব্রতের গলার আওয়াজ শুনে। ওর গলায় বিরাট আওয়াজ।
আবার কখনো বলে শুনেন দাদা ‘আমি যদি তোদের বাড়ি গিয়ে শুনি যে, চামচ আছে নাই? তাহলে তুই কি বলবি জানিস? বলবি এই সুব্রত একটা চামচ আছে এই নে ধর। তারপর আমি সেই চামচ নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে চামচে করে ধুলাবালু রাস্তার গাড়িতে ছুড়ে মারব।’ সত্যি সত্যি সুব্রত একবার এমনটা করেও ছিল বটে। ওদের বাড়ি মেইন রাস্তার ঠিক পাশেই। সুব্রত সকালে রাস্তার পাশে বসে বড় শামুকের খোসায় ধুলা মাটি তুলে কিছু একটা করছিল। আমি কলেজ থেকে ফেরার পথে দেখে এসেছিলাম যে, সুব্রত সেখানে বসে ধুলাবালি শামুকে করে কোনো কোনো মানুষের দিকে ছুড়ে মারছেন। বাড়ি আসতে না আসতেই শুনতে পেলাম, সুব্রত কোনো একটা মাইক্রোবাসে সেই বালুভর্তি শামুক ছুড়ে মেরেছে এবং মাইক্রোর কাচ ভেঙে দিয়েছে। পরে সেই মাইক্রোওয়ালা সুব্রতকে ধরে নিয়ে যেতে চাইছে। সুব্রতের বাবা গরিব মানুষ। গাড়িওয়ালা যখন কাচ লাগানোর জন্য বড় মাপের টাকার আবদার করছিলেন সুব্রতের বাবা তখন চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। পরে এলাকার লোক মিলে সেই গাড়িওয়ালাকে বুঝিয়ে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করেছিলেন। তারপর বেশ কিছু দিন আর সুব্রতকে রাস্তায় দেখা যেত না। আবার গ্রামেও বের হতে দেখা যেত না।
সুব্রতের আগমন অনেক দূর থেকেই বুঝতে পারে মানুষ। সুব্রত বেশির ভাগ সময় গলা ফাটিয়ে চিৎকার মেরে টেনে টেনে বলতে থাকে ‘ও বাবা তুই রবজের তে পান ভাঙে বাড়ি এনে কলার পাতা দিয়ে মুড়িয়ে পলিতার হাটে নিয়ে পান বেচে কিনে আলু, পটোল, ডাল, লবণ, পেঁয়াজ তারপরে কপি, তেল, হলুদ ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু অবশেষে বলে তুই যদি পারিস বাড়ি আসার সময় হাটের থেকে তোর সুব্রতের জন্য কিছু গলা, না হলি জিলাপি আর তা না হলি কয়টাকার ভাজা কিনে নিয়ে আসিস।’
সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় হলে সুব্রত আশপাশের দুই-তিনটা গ্রামের সুব্রতের বয়সী বা সুব্রতের থেকে একটু বেশি বয়সী সব ছেলেমেয়েদের নাম মুখস্থ এবং কোনো জায়গায় বাড়ি সেটাও একদম ঠোঁটের আগায় এসে ঝুল খায়।
একদিন সকাল বেলা সুব্রত এসে হাজির হয়েছে আমাদের বাড়ি। আমার মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করছে ‘এই দিদি আনিচুর করে রে...উত্তরে মা বলেছে ঘরে ভাত খাচ্ছে। সুব্রত বলল, আনিচুর ভাত খাচ্ছে! খাগগে মানে তাতে সুব্রতর কি!!’
মা বলল, কেন তুই খাবি সুব্রত? সুব্রত বলল খাবো কিন্তু মিঠুরে কবি নানে তো। মা বলল, না কবো নানে। মিঠু সুব্রতর ছোট কাকু। মিটুকে সুব্রত খুব ভয় খায়!!
এ রকম সব সুব্রতরাই দেশের আসল নায়ক। কেননা এ রকম সুব্রতদের ভেতর কিছু থাকুক বা না থাকুক নেই সাম্প্রদায়িকতা, নেই হিংসা-বিদ্বেষ, কাউকে ঠকানোর সব রণকৌশল।

পরামর্শ
কোনো শিশুর মধ্যে অটিজম দেখা দিলে হতাশ হওয়া বা শিশুকে অবহেলা করা কঠিন অন্যায় ও শিশুর প্রতি জুলুম করা বা অবিচার করা হবে। এতে করে হতাশার পাপ ছাড়াও সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্বেও অবহেলার পাপ হবে। একটু বিশেষ কেয়ার, যত্ন ও একটু আলাদা তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুরাও মোটামুটি সফল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কারো সন্তানের মধ্যে এ রকম আচরণগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে ভালো ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে অবহেলা নয় একটু ভালোবাসায় পারে একজন হতাশ মানুষের মনে আশার প্রদীপ জ্বালাতে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫