ঢাকা, রবিবার,২২ অক্টোবর ২০১৭

ভ্রমণ

খাগড়াছড়ির রি-ছাং ঝরনা

মো. জাভেদ হাকিম

০১ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৬:৫০


প্রিন্ট

‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের একদল সুখী ছেলে ঘুরে বেড়ায় সবখানে। নদী, সাগর, পাহাড় কিংবা গহিন অরণ্যে, সুযোগ পেলেই ছুটে চলে নৈসর্গের সৌন্দর্যময় কোনো প্রকৃতির কোলে। তেমনি এক সুবর্ণ সুযোগে ঘর হতে বের হয়ে গিয়েছিলাম নীল আসমানের সাথে পাহাড়ের কোলাকুলি খাগড়াছড়ির মায়াবী পথে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা এক বন্ধুর মাধ্যমে আগে থেকেই হোটেলের রুম বুকিং করা ছিল, তাই কোনো ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই সোজা রুমে। অতঃপর দে ছুট ভ্রমণ সংঘের ফেস্টুন নিয়ে সিএনজিতে চেপে অপরূপ সৌন্দর্যের রি-ছাং ঝরনার পানে । সিএনজি তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত দু’জন নিয়ে সর্বোচ্চ গতিতে ভোঁ ভোঁ শব্দ তুলে পাহাড়ি পথে চলছে। দু’পাশে নজড়কাড়া প্রকৃতি, মাঝে পিচ ঢালা উঁচু নিচু পথ, কখনো কখনো মনে হয় আরেকটু সামনে এগোলেই হয়তো নীলাভ আকাশ ছুঁয়ে দেবে আমাদের, তবে আকাশের পরশ না পেলেও আলুটিলার মোড়ে মেঘের ভেলার সাথে দারুণ এক সাক্ষাৎ হয়েছে। সে এক অপার্থিব অনুভূতি, অজানা শিহরণ! শেষ বসন্তে পাহাড়ের নৈসর্গিক প্রকৃতি দেখতে দেখতে একসময় পৌঁছে যাই রি-ছাং ঝরনার কাছাকাছি। সিএনজি আর যাবে না। শুরু এখন পাহাড়ি পথে হাঁটা। কখনো উঁচু আবার কখনো নিচু এভাবে চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পৌঁছতে হবে জলধারার কাছে। আগের দিন তৈদু দেখতে গিয়ে সারা দিন ট্র্যাকিং করার কারণে শরীরটা কিছুটা ক্লান্ত ছিল; তার পরেও প্রকৃতির ছোয়া পেতে সেদিন কোনো কষ্টই কঠিন মনে হয়নি। প্রায় চল্লিশ মিনিট চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে হাজির হলাম দৃষ্টিনন্দন ঝরনার সামনে। বিশাল জলরাশি অবিরাম ধারায় গরিয়ে পরে তার নিয়মিত ছন্দে। রি-ছাং হল মারমা শব্দ এর বাংলা অর্থ রি-মানে পানি আর ছাং হলো গরিয়ে পড়া। অশ্চর্য! নামের সাথে ঝরনার বৈশিষ্ট্যের হুবহু মিল রয়েছে।
পাথুরে পাহাড়ের মাঝে হৈ হুল্লোড় করে রি-ছাং ঝরনার পানিতে নিজেদের সমর্পণ করি। প্রচণ্ড গতিতে প্রায় ষাট ফুট ওপর থেকে পানি পড়ার রিমঝিম শব্দ। দেশের অন্যান্য ঝরনার চেয়ে এই ঝরনার বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পর্যটকেরা অত্যন্ত নিরাপদে এর জলে নিজেকে মন ভরে ভেজাতে পারেন। কেউ কেউ শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে স্লিপও খেতে পারবেন। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিজতেছি। ভেজার স্বাদ যেন মিটছেই না, সাথে অসংখ্যবার স্লিপ। শেষে দেখি থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আন্ডার গার্মেন্টসহ ছিঁড়ে গেছে। ঝঙ ইঊ ডঅজঊ ঙঋ ওঞ. দীর্ঘ সময় ভেজার পর এবার দে ছুট-এর স্বভাব সুলভ আচরণ ঝরনার পানির উৎসের দিকে পা বাড়ানো। পিচ্ছিল পথ আর লতা গুল্ম ছাড়িয়ে এগিয়ে যাই উপর দিকে। একসময় উৎসের মুখে এসেও যাই, তবে সে পথ ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু আনন্দময়। পানির উৎসের মুখে গিয়ে আমাদের চোখ কপালে। ও... য়া ... ও ! কত ঝরনারইত উৎস দেখেছি কিন্তু এমন আকৃতির আর একটিও কোথাও দেখিনি। প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে যেন সুইংপুল। ইচ্ছে হলে সাঁতারও কাটা যাবে। চোখ বন্ধ করে ভাবুনতো একবার সম্পূর্ণ বুনো পরিবেশে হাজারও ফিট উপরে সাঁতার কাটতে কেমন লাগবে আপনার? খোশ মেজাজে সাঁতার কাটলাম। এ জনমে যতগুলো ঝরনায় দেহ মন ভিজিয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে আনন্দময় ও নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে প্রকৃতির এই রহস্যময় সৃষ্টি রি-ছাং ঝরনা। আকাশছোঁয়া পাহাড়ি বৃক্ষের ছায়া, ঘন জঙ্গলের বুনো গন্ধ, অচেনা পাখির মিষ্টি সুর ভ্রমণপিপাসুদের মন ছুঁয়ে যায়। সরকারের সংশ্লি­ষ্ট বিভাগ যদি একটু নজর দেয় তাহলে আমাদের প্রকৃতি কন্যা রি-ছাং ঝরনা ভ্রমণবিলাসীদের জন্য হয়ে উঠবে এক অনবদ্য বিনোদন মঞ্চ।
পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা স্বকণ্ঠে জনপ্রিয় সেই গানটি গেয়ে উঠি ‘ঘর ছাড়া এক সুখী ছেলে, আনমনে আজ এই ক্ষণে। চলে গেছে দূরে কোথাও, ঠিকানাগুলো ছিঁড়ে ফেলে’ প্রথম লাইনটি দে ছুট-এর জন্য প্রযোজ্য হলেও শেষের লাইনটির সাথে সম্পর্ক নেই। কারণ দে ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা বন বাদাড়ে ভ্রমণের পাশাপাশি নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে থাকে। তাহলে আর দেরি কেন? ছুটে যান অজানা এক ভালোলাগার মায়াবী সৌন্দর্যের হাতছানি রি-ছাং ঝরনার পানে।
খাগড়াছড়ি ভ্রমণে আরো যা দেখবেন : আলুটিলা গুহা, দেবতার পুকুর, ডিজনি ল্যান্ড, বনবিহার এবং শান্তিপুর অরণ্য কুটির।

যোগাযোগ : ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে দিন-রাতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস যায় খাগড়াছড়ি। রাত যাপনের জন্য খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল, শহরের শাপলা চত্বরে শৈল সুবর্ণা ও জিরানসহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। ভাড়া ১১০০-৫০০০ টাকার মধ্যে। তবে চেঙ্গিস ব্রিজের পাশে পর্যটন মোটেলে রাত কাটানোর আনন্দই হবে আলাদা। খরচ জনপ্রতি দু’দিনের জন্য সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা।

সতর্কতা : নিরাপদ ভ্রমণের জন্য অপরিচিত কারো সঙ্গে হুট করে ঘনিষ্ঠ হতে যাবেন না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫