ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

আগডুম বাগডুম

মমতা

মো: মাঈন উদ্দিন

০১ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আবিদ আর আরিফ দু’জনে প্রতিদিন এ রাস্তা দিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে; কিন্তু আজ আরিফ স্কুলে আসেনি। সে অসুস্থ। তাই আবিদ একাই স্কুলে গিয়েছিল। চৈত্র মাসের মেঘমুক্ত আকাশ। কাঠ ফাটা রোদে স্কুল থেকে ফিরছে আবিদ। হাঁটতে হাঁটতে পরিশ্রান্ত, তাই রাস্তার পাশে শেওড়াগাছের নিচে ছায়ায় দাঁড়াল সে। হঠাৎ পাখিছানার গোঙানি শব্দ। ডান হাতে কপাল থেকে নেমে আসা ঘাম মুছতে মুছতে আবিদ এদিক-সেদিক তাকাল; কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শব্দটা আসছে বুঝে উঠতে পারল না। পাখির প্রতি আবিদের প্রবল আকর্ষণ। সে কান খাড়া করে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করল, কোথা থেকে গোঙানির শব্দ আসছে। এবার সে বুঝতে পারল শেওড়াগাছের ঝোপের ভেতর থেকেই আসছে শব্দটা। আবিদ কাঁধের ব্যাগটি দূর্বাঘাসের ওপর রেখে এক লাফে উঠে এলো শেওড়াগাছের ডালে। ওর উপস্থিতি টের পেয়ে পাখিছানার গোঙানি শব্দ থেমে গেল। আবিদও নড়াচড়া না করে সামনে তাকাচ্ছে মিটমিট করে। সম্ভবত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পাখিছানাটি আবারো গুঙিয়ে উঠল।
আবিদ উঁকি দিয়ে ঝোপের ভেতর তাকিয়ে দেখল একটি দোয়েলছানা লতাপাতায় জড়ানো। ছানাটা ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। মা পাখিটি ঠোঁট দিয়ে ঠুকড়ে ছানাকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে; কিন্তু পারছে না। আবিদ লতাসহ ছানাটিকে খপ করে বাম হাতে ধরে ফেলল। মা পাখিটি দোয়েলছানাকে রক্ষার্থে আবিদের হাতে ঠোকড়াতে লাগল। আবিদ ডান হাতে মা দোয়েলটিকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরে যেতে বাধ্য করল। মা দোয়েল পাখিটির কিচিরমিচির শব্দ বেড়ে গেল দ্বিগুণ। সে আবিদের মাথার ওপর দিয়ে ঘনঘন চক্কর দিতে লাগল। আবিদ ছানাটি নিয়ে মাটিতে নেমে এলো। কালোর ভেতর সাদা রঙ। তুলতুলে নরম দেহ। ফুটফুটে ছানাটিকে দারুণ লাগছে আবিদের। আবিদের সোহাগ মাখা হাতের ছোঁয়ায় অল্প কিছুক্ষণ আগে বাঁধনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে ছানাটি গোঙানো বন্ধ করল। দুই চোখ ভরা কৌতূহল নিয়ে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। ছানাটির নরম শরীর আর ভীরু চোখের অদ্ভুত চাহনি দেখে আবিদের ইচ্ছে করছে আরো আদর করতে। সে মনে মনে চিন্তা করল, পাখিটাকে বাড়ি নিয়ে খাঁচায় বন্দী করে লালন-পালন করবে। এ দিকে মা পাখিটি আবিদের মাথার ওপর উড়ে উড়ে গগনবিদারী কিচিরমিচির শব্দ করছে। মায়ের চিৎকার শুনে ছানাটিও কিচিরমিচির শুরু করে দিলো। আবিদ একদৃষ্টিতে ছানাটির দিকে তাকিয়ে রইল। নিশ্চয় মায়ের ¯েœহ পাওয়ার আশায় ছানাটি অসহায় কণ্ঠে চিৎকার করছে। আবিদের মনে পড়ে গেল আজ থেকে প্রায় বছরখানেক আগে সে তার মাকে হারিয়েছে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে সে দেখে, তার মায়ের নিথর দেহকে ঘিরে কান্নাকাটি করছে সবাই। মায়ের ভালোবাসা যে জগৎসেরা সে তা বুঝতে পারছে। মাকে হারিয়ে। মা ছাড়া একজন শিশু যে কতটা অসহায়, তা সে মাকে হারিয়ে অনুভব করছে। ভাবতে ভাবতে দু’ফোঁটা অশ্রু তার দু’গাল বেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সে অশ্রুসিক্ত নয়নে মা-পাখিটির দিকে তাকাল। আবিদ সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এলো। ডান হাতে ছানাটির পাখনায় ধরে বাম হাতের তালুতে দোয়েলছানাটিকে বসিয়ে ছেড়ে দিলো। ছাড়া পেয়ে ছানাটি ফুরুত করে মা পাখির সাথে উড়তে উড়তে পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে গেল। আবিদ ছলছল নয়নে পরমানন্দে তাকিয়ে রইল।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫