ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

একজন শিক্ষাবিদ ও কুরআন গবেষক

ড. নাসিমা হাসান

২৯ মার্চ ২০১৭,বুধবার, ১৯:১৮


প্রিন্ট

কুরআনের তিলাওয়াত চলছে। অত্যন্ত স্পষ্ট উচ্চারণ সুরে সুরে, ছন্দে ছন্দে অনায়াস ভঙ্গিতে- যেন বাবা কুরআন দেখেই পড়ছেন। প্রায়ই তিনি ফজর ও মাগরিবের নামাজে তিলাওয়াত জোরেই করতেন। অন্যান্য সূরাসহ পড়তেন আয়াতুল কুরসি, সূরা নূরের ‘আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ ...’ ‘আল্লাহ আকাশসমূহ ও জমিনের নূর’ (২৪:৩৫) বা ‘আওকা যুলুমাতি ...’ ‘অথবা অথৈ সাগরের বুকে ঘোর অন্ধকার’ (২৪:৪০)। যখনই এ আয়াতগুলো শুনতাম, আমার মনে পড়ে যেত বাবা কিভাবে Light Upon Light বইটিতে হৃদয়গ্রাহীভাবে সূরা নূরের আয়াতগুলো ব্যক্ত করেছেন বিজ্ঞানের আলোকে। ‘আল্লাহ যাকে নূর থেকে বঞ্চিত করেছেন তার ভাগ্যে কোনো নূর নেই’, মনে হতো তিলাওয়াতের সময় তিনি ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছেন এবং তাঁর নূর সংগ্রহ করে আল্লাহর আরো নৈকট্য লাভ করছেন। তিনি গত বছর আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন; কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি।
বাবার চলাফেরা কথাবার্তায় প্রকাশ পেত আল্লাহ তায়ালার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তিনি উঠতে, বসতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতেন। আর নির্দিষ্ট একটি সুরে বলতেন একটি দোয়া ‘রাব্বিশ রাহলি সাদরি ওয়া ইয়াস সিরলি আমরি ওয়াহলুল উকদাতাম মিললিসানি ইয়াফকাহু ক্বাওলি’, অর্থ ‘হে আমার রব আমার অন্তর প্রশস্ত করে দাও, আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দাও এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’ ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে দোয়াটি আমার মুখস্থ হয়ে গেল। মুসা আ: এই দোয়াটি করেছিলেন, যা কুরআনের সূরা ত্বাহায় (২৫-২৮) আছে। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, স্বার্থহীন, উদার, ক্ষমাশীল, মিতভাষী, মিতব্যয়ী, সাদাসিধে, স্বল্পাহারী ও প্রচারবিমুখ। আল্লাহ তাকে সৌন্দর্য, পারিবারিক মর্যাদা, জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য, উচ্চপদ দিয়েছিলেন- তথাপি ছিলেন মাটির মানুষ।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত অধ্যবসায়ী। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন বাবা কুরআন শরিফ নিয়ে লেখালেখি শুরু করলেন। তিনি আরবি ভাষা, ব্যাকরণ নিয়েও গবেষণা শুরু করলেন। আরবি ভাষার পণ্ডিতদের সাহায্য নিতেন। বড় হয়েও কতবার দেখেছি টেলিফোনেই কোনো আরবি শব্দের ধরন নিয়ে তিনি কথা বলছেন। তিনি একটি বিষয় জানার জন্য অনেক সময় ৮-১০টি বই দেখতেন মা অথবা অন্যের সাহায্য নিয়ে হলেও (যখন থেকে উনার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে লাগল)। Concordance of the Koran বইটি কিভাবে পড়তে হয়, তা বাবার কাছেই শেখা।
২০০৬-৭-এর দিকে আব্বা খুবই গবেষণা করছিলেন কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে। আয়াতটি ছিল সূরা ওয়াক্বিয়ার, (৫৬:৭৫-৭৬) ‘মাওয়া ক্বিইন্ নুজুম-এর শপথ! নিশ্চয়ই তা এক মহাশপথ যদি তোমরা জানতে’। বাবা চিন্তাভাবনা করে জানালেন ‘মাওয়া ক্বিইন্ নুজুম’-এর অর্থ হলো ‘তারকারাজির উৎপত্তিস্থলের শপথ’। আমাকে বললেন, কুরআনের পাঁচ-ছয়টি তরজমা দেখে বলতে ওই অংশের অনুবাদ কী লেখা হয়েছে। তিনি কয়েকজন পণ্ডিত ব্যক্তিকে তার বাসায় ডাকলেন এবং আয়াতটি উত্থাপন করে তার নিজ ভাবনা তুলে ধরলেন। বাবার ভাবনাটি ছিল সুদূরপ্রসারী- যার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এখনো হয়তো চলছে। কুরআনে ওই রূপ বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাবা কিভাবে ওই বিশেষ শব্দের গবেষণায় ডুবে আছেন এটা দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তার মন ছিল অনুসন্ধিৎসু এবং বছরের পর বছর প্রয়োজন হলে তিনি একটা বিষয়ের পেছনে সময় দিতেন।
কুরআনের আয়াত নিয়ে এরূপ গভীর চিন্তা তিনি অনেকবারই করেছেন। যেমন- ছোটবেলায় ইসলামিয়াতে সূরা ফালাক্বের অর্থ (প্রথম আয়াত) পড়েছি ‘বল, আমি আশ্রয় চাচ্ছি প্রভাতের রবের নিকট।’ তিনি ব্যাপক ব্যাখ্যা দিলেন কুরআনের অন্য আয়াতের উদাহরণ টেনে (৬:৯৫), (৬:৯৬), (২৬:৬৪) যে আল্লাহ বস্তুত ফা-লিক বা দীর্ণকারী, যিনি অন্ধকার দীর্ণ করে সূর্যের আলো নিয়ে আসেন, বীজ মাটি দীর্ণ করে চারাগাছের রূপ নেয়, মাতৃজঠরের স্তর দীর্ণ করে নবজাতক ভূমিষ্ঠ হয়, তেমনি অজ্ঞানতার অন্ধকার দীর্ণ করে জ্ঞানের আলো ফুটে ওঠে। এটা আরো ব্যাপক ধারণা দেয় পরাক্রমশালী আল্লাহ সম্পর্কে। আমার জীবনের হতাশা ও সমস্যার সময়ে এই একটি আয়াতের ওই রূপ অর্থ মনে অনেক সাহস জুগিয়েছে। অর্থাৎ জীবনের যেকোনো অন্ধকারকে আল্লাহ দীর্ণ-বিদীর্ণ করতে পারেন।
বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান অবিস্মরণীয়। যদিও তিনি মূলত পদার্থ বিজ্ঞানী; কিন্তু প্রতিষ্ঠালাভ করেছেন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ (একুশে পদকপ্রাপ্ত) হিসেবে। তিনি শিশু, কিশোর, বয়স্ক প্রত্যেকের শিক্ষার প্রসারের জন্য গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে বইপুস্তক লিখেছেন। দেশের সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য কাজ করেছেন নিরলসভাবে এবং এ বিষয়ে বই, পুস্তক, নাটিকা, কবিতা, গান রচনা করেছেন; কিন্তু একসময় তার নিরক্ষরতা দূরীকরণের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে খুবই ব্যথিত হন। তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কবিতারূপে উৎসারিত হলো। বইটির নাম দিলেন ‘সাক্ষরতার আর্তনাদ’ Literacy Wails। ওই আর্তনাদ শুধু বাংলাদেশের সাক্ষরতার নয়, বাবার বেদনাক্লিষ্ট হৃদয়েরও আর্তনাদ।
বাবা-মা ছিলেন স্নেহপরায়ণ ও সংস্কৃতিমনা। খুব ভালোবাসতেন নাতি-নাতনীদের। উৎসাহ দিতেন কবিতা বা গল্প লেখা, গান গাওয়া কিংবা ছবি আঁকায়। তিনি পত্রিকায় তাদের লেখা ছাপাতে দিতেন। তার লেখা নাটক নাতি-নাতনীরা মিলে অভিনয় করত। পুরো পরিবারে সাড়া পড়ে যেত। শৈশবে ভাইবোন মিলে খাটকে মঞ্চ বানিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, অনুষ্ঠানের ধৈর্যশীল দর্শক মাত্র দু’জন, বাকি সবাই মঞ্চে। সে দু’জন আমার বাবা-মা। কিন্তু তারা খুবই উপভোগ করতেন অনুষ্ঠানগুলো।
বাবা-মায়ের অনুপম গুণাবলি আয়ত্ত করতে পারলে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারতাম। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে- তাই ওপারে যাওয়ার প্রস্তুতির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক ইনশা আল্লাহ।
মোহাম্মদ ফেরদাউস খানের জন্ম ১৯১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামে। তার বাবা আমানত খান ছিলেন উচ্চশিক্ষিত (বিএ; বিএল) এবং তদানীন্তন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (MLC)। মোহাম্মদ ফেরদাউস খান ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে চারটি লেটার ও স্টার মার্কসসহ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে প্রথম বিভাগে দু’টি লেটারসহ আইএসসি পাস করেন। ১৯৪১ সালে কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএসসি (অনার্স); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৩ সালে এমএসসি (পদার্থ বিজ্ঞান) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম; ১৯৪৫ সালে বিটি বা বিএড (প্রথম শ্রেণীতে প্রথম) এবং ১৯৪৮ সালে London Institute of Education থেকে MA in Education ডিগ্রি লাভ করেন।
চাকরি জীবন শুরু করেন ১৯৪৪ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিজ্ঞানের লেকচারার হিসেবে। যেসব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন সেগুলো হচ্ছে- পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক (চট্টগ্রাম কলেজে চার বছর), Education Directorate Planning Advisor; ADPI Deputy Director Bureau of National Reconstruction ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ডিপিআই (সাত বছর) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশনের (কুদরাত-এ-খুদা কমিশন) সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন (১৯৭৩-৭৪)। শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি তমঘায়ে কায়েদে আযম (১৯৬৬), সিতারায়ে খেদমত (১৯৭০) ও একুশে পদক (১৯৮০) লাভ করেন।
বহু দিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগে তিনি ৩০ মার্চ, ২০১৬ সালে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে ৯৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি রেখে গেছেন নয়জন যোগ্য ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনী এবং অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাক্সক্ষী। তিনি বেঁচে থাকবেন তার আদর্শ ও পঞ্চাশোর্ধ্ব বই-পুস্তিকার মাধ্যমে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫