ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৯ জুন ২০১৭

প্যারেন্টিং

শিশুর পরিচর্যা ও প্রতিপালন

২৮ মার্চ ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৭:২৮


প্রিন্ট

সব বাবা-মায়ের সন্তান লালন-পালনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক নিবিড় আনন্দের অনুভূতি। সব বাবা-মা চান তার শিশুটিকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করে বড় করতে। শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য যা সর্বোত্তম, মা-বাবা সেটাই করতে চান। সেজন্য শিশুর যত্ন, পরিচর্যা এবং প্রতিপালনের জন্য কতগুলো দরকারি নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে এবং তা পালন করতে হবে, যাতে শিশুর প্রতিপালন হয়ে ওঠে এক আনন্দময় অনুভূতি। লিখেছেন ডা: জ্যোৎস্না মাহবুব খান

গর্ভাবস্থা থেকেই মাকে ভাবতে হবে, যেন তার কোলজুড়ে আসে এক সুস্থ সন্তান। সেজন্য খেতে হবে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, ভিটামিন, ফলিক এসিড। নিয়মিত গর্ভকালীন চেকআপ করতে হবে। ফলে জন্ম হবে সুস্থ এবং স্বাস্থ্যবান শিশু, যার কোনো জন্মগত ত্রুটি বা বিকলাঙ্গ থাকবে না।
জন্মের পর শিশুকে প্রথমে খাওয়াতে হবে মায়ের বুকের শালদুধ। এই শালদুধ শিশুর জন্য দরকারি। কারণ এতে থাকে প্রচুর এন্টিবডি, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিভিন্ন অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে নবজাতক শিশু সাধারণত খায় আর ঘুমায়। তাকে এক ঘণ্টা অন্তর বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া উবসধহফ ভববফ বা চাহিদামাফিক দুধ দিতে হবে। অর্থাৎ কান্না করলে বুঝতে হবে, শিশুর ক্ষুধা পেয়েছে, সাথে সাথে দুধ খাওয়াতে হবে। অন্যান্য কারণেও শিশু কাঁদতে পারে। যেমনÑ বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করলে, ভেজা বা ঠাণ্ডা লাগে তখন কান্না করে। শরীরে অস্বস্তিবোধ হলে বা ব্যথা হলে যেমন পেটে ব্যথা, কানে ব্যথায় শিশু কান্নাকাটি করতে থাকে।
জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। মায়ের দুধ শিশুর আদর্শ খাদ্য। কারণ দুধে আছে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার সব প্রয়োজনীয় উপাদান। মায়ের বুকে যথেষ্ট দুধ সরবরাহের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছেÑ শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো, গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের পর সুষম খাদ্য গ্রহণ পর্যন্ত বুকের দুধ সরবরাহে সাহায্য করে। বুকের দুধ খাওয়ানোর পর নবজাতককে উপুড় করে শোয়ায়ে বা বুকের ওপর রেখে আলতোভাবে চাপ দিলে ঢেঁকুর হয়ে পেটের বাতাস বের হয়ে যায়। শিশুর পেটে বাতাস জমা থাকলে অস্বস্তিবোধ করতে থাকে। বমিও হতে পারে। কর্মজীবী মাকেও বুকের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে খেয়াল রাখতে হবে। কাজের জন্য বাইরে বেরোনোর আগে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। যতটুকু পারা যায়, বুকের দুধ বের করে রেখে যেতে হবে এবং তাড়াতাড়ি শিশুকে খাইয়ে দিতে হবে। বাড়ি ফিরে এসে শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
পাঁচ মাস পর থেকে শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। পুষ্টির জন্য প্রথম প্রয়োজন দুধের সাথে ঘন আহারের বা সেরেলাক জাতীয় শস্য আহার। শিশু তার জন্মের প্রথম বছরই সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে এবং প্রোটিনের চাহিদা সর্বোচ্চ হয়। সে জন্য পাঁচ মাস বয়স থেকেই শিশুকে খিচুড়ি খাওয়াতে হবে। খিচুড়ি রান্না করতে চাল সিদ্ধ বা আতপ, ডাল, আলু, কাঁচকলা, মুরগির কলিজা বা গোশত, মাছ, মিষ্টিকুমড়া, পেঁপে, শাকসবজি একটু সয়াবিন তেল, লবণ, পেঁয়াজ ও সামান্য হলুদ দিতে হবে। খিচুড়ি রান্নার পর হাত দিয়ে চটকিয়ে বা ব্লেন্ডার করে দিনে দুই-তিনবার খাওয়াতে হবে। প্রথম অবস্থায় শিশু শক্ত খাবার পছন্দ নাও করতে পারে। তখন জোর করে খাওয়ানো যাবে না, ধৈর্য ধরে খাওয়াতে হবে। আস্তে আস্তে শিশু শক্ত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শিশুকে প্রতিদিন ঘরে তৈরি করা ফলের রস খাওয়াতে ভুলবেন না। পাঁচ মাস থেকে বাড়তি খাবার শুরু হলে শিশুকে তিন ঘণ্টা অন্তর খাবার দিতে হবে। কোনো কারণে শিশুকে মায়ের দুধ দেয়া সম্ভব না হলে বিকল্প হিসেবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী গুণে-মানে স্বীকৃত কোনো ইনফ্যান্ট ফর্মুলা সঠিক নিয়মে শিশুকে খাওয়াতে হবে এক বছর পর্যন্ত। এক বছর পর গরুর দুধ বা অন্য কোনো গুঁড়া দুধও খেতে পারবে। বাড়ন্ত অবস্থায় শিশুকে প্রতিদিন ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার যেমনÑ গাঢ় রঙিন শাকসবজি, হলুদ ফলমূল, পেঁপে, কাঁঠাল, কলা ও আম খেতে দিন। ভিটামিন ‘এ’ অন্ধত্ব প্রতিরোধক ভিটামিন হিসেবে পরিচিত। ফলে শিশুর চোখ সুস্থ রেখে অন্ধত্ব প্রতিরোধে সাহায্য করবে। বাড়ন্ত শিশুদের দাঁত এবং হাড় গঠনে প্রচুর ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ‘ডি’ জাতীয় খাদ্যের প্রয়োজন। প্রতিদিন শিশুকে যদি অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি একটি করে ডিম দেয়া যায়, তাহলে তাদের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব। তা ছাড়া শিশুকে প্রতিদিন কিছু সময় রোদে খোলা বাতাসে খেলতে দিন। কারণ ত্বকের নিচে সূর্য কিরণের প্রভাবে ভিটামিন ‘ডি’ উৎপন্ন হয়। এ সময় রোগ প্রতিরোধের জন্য আরো একটি ভিটামিন খাওয়া জরুরি সেটা হলোÑ ভিটামিন ‘সি’। এই ভিটামিন শরীরে জমা থাকে না, সে জন্য প্রতিদিন লেবু, কমলালেবু, আমলকি, আনারস জাতীয় খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন।
সাধারণত শিশুর দুই বছর বয়স থেকে বিশেষ ধরনের আহারের প্রয়োজন হয় না। তখন সে মোটামুটি পরিমিত মাত্রায় ঘরোয়া খাবারেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। শিশুকে নিজে নিজে খেতে দিন এবং লক্ষ্য রাখুন, ঠিকমতো খাচ্ছে কি না। যদি মনে হয় শিশু ঠিকমতো খাচ্ছে না, তাহলে ওর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের দিকে লক্ষ্য রাখুন। শিশুর যদি ভালো ঘুম হয়, পরিমিত মাত্রায় খায়, জেগে থাকলে ক্রীড়াচঞ্চল থাকে এবং প্রতি মাসে ওজন বাড়ে তাহলে চিন্তার কিছু নেই। যদি ব্যতিক্রম দেখা যায়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস করাতে হবে। সঠিকভাবে ব্রাশ করা শিখিয়ে দিতে হবে।
শিশুকে দৈনিক একবার গোসল করাতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে শিশুর ঠাণ্ডা না লাগে, সে জন্য শিশুদের দেহের উত্তাপ এবং পানির উত্তাপ সমান রাখতে হবে। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি সময়মতো সব টিকা দিতে হবে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও আপনার শিশুকে বেশি বেশি সময় দিন। তাকে হরেকরকম গল্প শোনান।
সপ্তাহে এক দিন নির্দিষ্ট রাখুন। শিশুকে নিয়ে কোথাও বেড়ানোর জন্য চিড়িয়াখানা, পার্ক বা আশপাশের কোনো গ্রামে যেতে পারেন। সেখানে প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিসের সাথে যেমনÑ গাছ, পাখি, পাহাড়, সুন্দর দৃশ্য, ফুল, ফল পরিচিত করে তুলুন। শিশুকে এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গা যেমন- কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, কুয়াকাটায় নিয়ে যান বছরে অন্তত একবার এবং প্রকৃতির প্রতি শিশুর ভালোবাসা জন্মাতে দিন।
সবশেষে বলা যায়, শিশুর প্রতি যত্ন, ভালোবাসা এবং উদার মনোভাব আমাদের সবারই থাকা উচিত। তাহলে শিশুর জীবন গড়বে সঠিক, সুন্দরভাবে। মনে রাখতে হবে, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

লেখক : জেনারেল প্রাকটিশনার (মহিলা ও শিশু), মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫