ঢাকা, রবিবার,৩০ এপ্রিল ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

শিশুদের অধিকার আদায়ে প্রশ্নবিদ্ধ আমরা

রিয়াজ উদ্দিন

২৭ মার্চ ২০১৭,সোমবার, ১৯:১৫


প্রিন্ট

আজকের শিশুরাই আগামী দিনে জাতির কর্ণধার। বলা হয়ে থাকে, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, আগামী দিনের সেসব কর্ণধারদের মানসিক বিকাশের জন্য আমরা তাদের তেমন সুযোগ দিচ্ছি না। আমরা তাদের তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার আইন ও জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার সনদ-১৯৯০ অনুসারে ১৮ বছর পর্যন্ত প্রত্যেকেই শিশু। এই বয়স অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান মতে আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার ৪৮% শিশু।
১৯৯০ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ‘শিশু অধিকার সনদ’ গৃহীত হয়। সনদ অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী দেশগুলো শিশুদের অধিকার আদায়ে বাধ্য থাকলে ও আমাদের রাষ্ট্র তা প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে এড়িয়ে চলছে। যেন শিশুদের জন্য আমাদের কোনো দায়ভার নেই!
জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার সনদে যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো : ০১. শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার (এখানে আছে স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ);
০২. শিশুদের বিকাশের অধিকার (এখানে আছে শিক্ষার অধিকার, শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য জীবনযাত্রার মান ভোগের অধিকার এবং বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার);
০৩. সুরক্ষার অধিকার (এখানে রয়েছে শরণার্থী শিশু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশু, শোষণ-নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন শিশু);
০৪. অংশগ্রহণের অধিকার (এখানে আছে স্বাধীনভাবে শিশুদের কথা বলার অধিকার, অন্যদের সাথে অবাধ সম্পর্ক গড়ে তোলার অধিকার এবং তথ্য চাওয়া, পাওয়া ও প্রকাশের অধিকার)।
শিশু সনদে শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য যেসব অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়েছে সেসব অধিকার আদায়ে আমরা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হচ্ছি।
বেসরকারি সংগঠন ‘এমজেএফ’-এর ‘বাংলাদেশের শিশু পরিস্থিতি-২০১৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শুধু ২০১৬ সালে আমাদের দেশে ৩০৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্য মারা গেছে ২২ জন। সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে রাজধানী ঢাকায়।
বিএসএসের এক রিপোর্ট মতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৯ জন শিশু। অন্য দিকে সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা মতে, পুষ্টির অভাবে ২০১৬ সালে ৩৬% শিশু খর্বকার, ১৪% শীর্ণকার ও ৩৩% শিশু কম ওজনে জন্ম নিয়েছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনি সঙ্কেত।
আর অন্য দিকে বিবিসির এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এই শিশুদের প্রায় অংশ শিক্ষা ও তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশের শিশু অধিকার আইনে বলা আছে, কোনো শিশু যদি বিশেষ পরিস্থিতিতে যেমন মা-বাবার মৃত্যুর কারণে অথবা মা-বাবা ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে কিংবা মা-বাবার কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়ার ফলে পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে সেই শিশুর অধিকার রক্ষার জন্য সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এসব শিশুদের নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই! এদের কোনো আদমশুমারি হয় না, এরা দেশের নাগরিক হিসেবে পায় না তাদের মৌলিক অধিকার।
এক জরিপে দেখা গেছে, এ দেশের ৮৫% পথশিশু কোনো ধরনের সহযোগিতা পায় না। অপর দিকে, শ্রম আইনে শিশু শ্রম বন্ধ করা হলে ও তা শুধু কাগজে-কলমে। সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমিকের ১২% শিশু শ্রমিক। অন্য এক রিপোর্টে দেখা গেছে এ দেশে প্রায় ৪৫ লাখ লোক শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
এসব শিশুরা অজান্তে হারিয়ে ফেলছে তাদের শৈশব, বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার আলো থেকে। ইউনিসেফ ও বিসিএএসের এক যৌথ উদ্যোগে ‘পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে বাঁচতে শেখো : বাংলাদেশের শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সার্বজনীন সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, শিশুশ্রম বন্ধ, ক্ষুধা ও অপুষ্টিকর দূরীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিশুদের অধিকারগুলো ব্যাহত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন রোগে ৮৫% শিশু আক্রান্ত হচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার সনদ এখনই যথাযথভাবে কার্যকর করা রাষ্ট্র ও জনগণের একান্ত কর্তব্য। যদি আমরা শিশুদের কে সেসব অধিকার দিতে ব্যর্থ হই তবে অচিরেই একটি মেরুদণ্ডহীন অন্ধকার জাতিতে পরিণত হবো আমরা।
সব শিশুরা তাদের সব অধিকার ভোগ করে মুক্ত পৃথিবীতে, মুক্তচিন্তায় মানসিক বিকাশের মাধ্যমে বেড়ে ওঠে আগামীর বাংলাদেশে গড়ার প্রস্তুতি নিক- এটাই সবার কাম্য।

লেখক : শিক্ষার্থী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫