ঢাকা, সোমবার,২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

স্বাধীনতা মিশে আছে তাদের রক্তে

ইফতেখার শাকিল

২৫ মার্চ ২০১৭,শনিবার, ১৮:৩২


প্রিন্ট

চাকরিজীবনের পাঁচ বছরের মধ্যে কখনো দেখিনি, আবদুল হালিম দেরি করে এসেছেন। তিনি নয়া দিগন্তের সম্পাদকীয় পাতাটায় বেশি গুরুত্ব দিতেন পরলোকগত সিরাজুর রহমানকে, যার লেখা তার খুব প্রিয় ছিল। তার বয়সের ছাপটা যদিও চোখে পড়ে, মনে হয় এখনো ত্রিশ বছরের যুবক। ছয় ভাই তিন বোনের মাঝে তিনি তৃতীয়। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিমের ১৫-০৬-১৯৪৯ সালে ফেনীর বারাহিগোবিন্দ গ্রামে জন্ম। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ২২। তখন তিনি ফেনী সরকারি কলেজের ছাত্র। যুদ্ধ চলাকালে ২ নম্বর সেক্টরের আওতায় মেজর হায়দারের অধীনে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। সেই সময়ের একটি ঘটনা তার নিজের মুখে শুনেছি। তিনি বলেছেন, রাতে আমাদের মিটিং শেষে আমি আর আলী আরশাদ বাড়িতে যাচ্ছিলাম। আমাদের হাতে গ্রেনেড আর কোমরে ছয় রাউন্ড গুলিসহ পিস্তল ছিল। রাজাপুর দুই সতিনের দীঘির পাড়ে আসতেই তাদের একটা দল দেখতে পাই। সাথে সাথে আমাদের অস্ত্রগুলো খালে ফেলে দিই। ওরা আমাদের গ্রেফতার করে। কোমরে হাত দেয়; তার পর তল্লাশি চালায়। নেতৃত্ব দিচ্ছিল, রাজাকার কমান্ডার সিরাজ। তার পর আমাদের চোখ ও হাত পিছনে বেঁধে রাজাপুর হাইস্কুলে সারা রাত খুব টরচার করে। আমি কয়েকবার জ্ঞান হারাই। পরদিন অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেই দিন সন্ধ্যায় আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল উত্তর দিকের খালের দিকে। সিদ্ধান্ত বদল করে রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের গুদামঘরে নিয়ে যায় এবং গুলি করে। সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে চোখে পানি পড়াতে জ্ঞান ফিরে আসে। বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। কষ্ট করে চোখের বাঁধনটা খুলি। দেখতে পাই, আরশাদ ধড়ফড় করছ্।ে ওরা আমাকে চারটা আর ওকে তিনটা গুলি করে। আমার পেটের বাম পাশে গুলি লাগে। আমি বাঁচার জন্য পাগলের মতো ছুটতে থাকি। জয়নারায়ণপুর আব্বাস ভূঁইয়ার বাড়িতে যাই। তখন রাত আনুমানিক ৪-৩০ মি:। কথা বলতে পারছিলাম না; খোকনদের দরজায় লাথি মারি। খোকনও মুক্তিযোদ্ধা। খোকনের বাবা ওহাব মিয়া বলে ওঠেন কে? বললাম আমি হালিম। ওরা দরজা খুলে দিলো। তার পর আমাকে একটা লুঙ্গি পরিযে দিয়েছে। ভেষজ লতা ও কাপড় দিয়ে আমার রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করে। সকাল ৮টায় ওরা আমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসে। বাবাকে বলি, ডা: ফরিদ আহমদকে নিয়ে আসতে। তার বাড়ি মাতুভূঞা। ফেনী শহরের পাঁচগাছিয়া রোডে (বর্তমানে এস এস কে রোড) তার চেম্বার ছিল। তিনি না এসে স্বাস্থ্য অফিসার হুদা মিয়াকে পাঠান। উনি এসে আমাকে স্যালাইন দেন এবং একটানা আমার সাত দিন চিকিৎসা করেন। হায়াত ছিল, তাই আমি বেঁচে যাই। পরে শুনতে পেলাম, আলী আরশাদ মারা গেছে। এর সাত দিন পরই ফেনী স্বাধীনতা লাভ করে। সে দিন ছিলো ৬ ডিসেম্বর। হায়রে স্বাধীনতা, হায়রে বাংলাদেশ; আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমাদের সাধ মিটে গেছে। কিন্তু যাদের জন্য যুদ্ধ করেছি, তারা কতটুকু বাস্তবে স্বাধীন?
মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিমের বয়স এখন ৬৮ বছর। এখনো তিনি তার পকেট খরচের জন্য কারো কাছে হাত পাতেন না। কোনো অন্যায় কাজ করেন না। এখনো দেশকে নিয়ে খুব ভাবেন। একবার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে তার। দেশের বর্তমান অবস্থায় তাকে নিয়ে আফসোস করতে দেখেছি। তার মতো মানুষগুলো তাদের জীবন বাজি রেখে এই দেশটাকে স্বাধীন করেছেন। কিন্তু আমরা প্রতিদানে তাদের কি দিয়েছি? কখনো কি তাদের কোনো খবর নিয়েছি? জানতে চাইনি, তারা কেমন আছেন, তাদের জীবন কেমন যাচ্ছে। এ জন্য আমরা লজ্জিত।

পাঁচগাছিয়া, ফেনী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫