মোদির ‘যোগী রাজনীতি’

আলফাজ আনাম

উগ্রপন্থী রাজনীতি এখন ভারতের ভবিষ্যৎ। নরেন্দ্র মোদির সাফল্য এসেছিল গুজরাট হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। তার ধর্মান্ধ বা মৌলবাদী পরিচয় অনেক আগেই মুছে গেছে। গুজরাট দাঙ্গার রক্তের দাগও শুকিয়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আরো একধাপ এগিয়ে গেলেন। ভারতের আকাশ এখন গেরুয়া রঙে ছেয়ে গেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশ, উত্তরখণ্ড, মনিপুর, গোয়া ও আসামে বিজেপির জয়জয়কার। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে আলোচনায় ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। আগামী দিনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিভূর মন্ত্রিসভায় যোগী, তান্ত্রিকদের সমাহার হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। মোদির আরেক যোগগুরু বাবা রামদেবও প্রায়ই ভারতের গণমাধ্যমে ঝড় তোলেন। প্রধানমন্ত্রীকে নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তিনি এখন ভারতের বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ীদের একজনে পরিণত হয়েছেন। যোগী আর তান্ত্রিকদের নিয়ে উগ্রবাদী প্রচারণা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির প্রধান কৌশল হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাতে যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট, তা এবারের বিধানসভা নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। শুধু দরকার হবে মোদির পাশে আরো কিছু যোগী আর বাবা। কট্টর সাম্প্রদায়িক হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের বাছাইয়ের কাজ মোদি আর অমিত শাহ মিলে হয়তো আগেই করেছেন।
নরেন্দ্র মোদি এখন শুধু তথাকথিত সেকুলার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এখন ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’। উত্তর প্রদেশের নির্বাচন ও যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে মোদির স্পষ্ট বার্তা- ২০১৯ পর্যন্ত বিজেপি ধাপে ধাপে হিন্দুত্বের সুর ছড়াবে। মোদির লক্ষ্য একটি আদর্শ হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই হিন্দুরাষ্ট্রের রূপ কেমন হবে গোধরা হত্যাকাণ্ডের পর গুজরাটে দাঙ্গার মধ্য দিয়ে তিনি তার প্রমাণ দিয়েছেন। যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর মোদির টুইট বার্তা ছিল আদিত্যনাথের নেতৃত্বেই ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশ একদিন ‘উত্তম প্রদেশ’ হয়ে উঠবে।
কেমন উত্তম প্রদেশ হবে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও তার প্রমাণ রাখতে শুরু করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার এক দিন না যেতেই একজন মুসলিম নেতা খুন হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে তিনজন মুসলিম তরুণকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুসলমানদের এলাকা ছাড়ার পোস্টার পড়েছে। এই যোগী তারুণ্যদীপ্ত করিৎকর্মা লোক। ইতোমধ্যে যোগী তার নির্বাচনী এলাকা গোরক্ষপুরে অনেক কিছু বদলে ফেলেছেন- আলিনগরকে আর্যনগর ও উর্দুবাজারকে হিন্দিবাজার করেছেন। এমনকি সুযোগ এলে তিনি তাজমহলের নামও বদলে দিতে চান। কারণ তার বিশ্বাস, তাজমহল আদতে ‘তেজো মহালয়’ নামে একটি শিবমন্দির ছিল। এ কারণে এখন তাজমহলের নাম বদলানো দরকার বলে মনে করেন অদিত্য। গরুর গোশত আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্ষমতায় এসে এবার একেবারেই কসাইখানা বন্ধ করে দিয়েছেন, যাতে গোশতের গন্ধও মানুষের নাকে না লাগে। যোগী আদিত্যনাথদের এখন ধ্যান-জ্ঞান রামমন্দির নির্মাণ আর মুসলমানদের সংখ্যা কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সে দিকে। সম্প্রতি তার সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ছিল- ‘যদি অনুমতি পাই তাহলে দেশের প্রতিটি মসজিদে গৌরী-গণেশের মূর্তি স্থাপন করে দেবো। পুরো হিন্দুস্তান হবে হিন্দুদের জন্য। পুরো পৃথিবীতে গেরুয়া পতাকা উড়বে।’ এর আগে বাবা রামদেবও বলেছিলেন, আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অখণ্ড হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। নরেন্দ্র মোদি সরকার নাকি সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তবে যোগী আদিত্য শুধু প্রচারণা নয়, অনেক আগেই কাজ শুরু করেছেন। ২০০৫ থেকে তিনি বিভিন্নভাবে পাঁচ হাজার জনকে হিন্দুধর্মে এনে ঘোষণা করেন, ‘উত্তর প্রদেশসহ গোটা ভারত হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত না করে থামব না।’ তার মতে, মুসলমানেরা হিন্দু মেয়েদের বিয়ের জন্য লাভ জিহাদ চালাচ্ছে। এখন এই জিহাদ ঠেকানোর জন্য তার নতুন পথের ঘোষণা হচ্ছে একটি হিন্দু মেয়ের ধর্ম বদল করালে ১০০ জনকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করব। তার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাননি শাহরুখ খানও। তার মতে, শাহরুখ আর পাকিস্তানের হাফিজ সাঈদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। সাথে হুঁশিয়ারি, শাহরুখের মনে রাখা উচিত, এ দেশের সংখ্যাগুরু মানুষই তাকে তারকা বানিয়েছে। নইলে রাস্তায় ভিক্ষা করতে হতো। শাহরুখ খানের জন্য দুঃখ হয় ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটা ধর্মবিযুক্ত জীবন যাপন করেও সেকুলার ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের টার্গেটে পরিণত হতে হচ্ছে। এর আগে মুসলমান হওয়ার কারণে শাবানা আজমি মুম্বাইয়ে অভিজাত এলাকায় বাড়ি কিনতে পারেননি বলে তার মনোবেদনা প্রকাশ করেছিলেন।
ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ ও মুসলমানদের সংখ্যা যেখানে বেশি, সেখানে একজন ধর্মগুরুকে মুখ্যমন্ত্রী বানানো ভারত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজেপির পরিকল্পনার অংশমাত্র। আরো লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, রাজ্যের ৪০৩টি আসনের একটিতেও বিজেপি বা তার শরিকেরা কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। আসলে কোন ধরনের ব্যক্তিরা ভারত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছেন তা এখন স্পষ্ট। ভারতের উন্নয়নের মতো দেশটির সেকুলার রূপটিও কসমেটিক। প্রকৃতপক্ষে ভারত একটি হিন্দুরাষ্ট্র, এর বাইরে কিছু নয়। যোগী আদিত্যনাথও হঠাৎ করে কোনো আবিষ্কার নয়। এই ধর্মীয় নেতা ২০০২ সালে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে একটি উগ্রপন্থী সংগঠন গড়ে তোলেন। ২০০৫ সালে উত্তর প্রদেশে অসংখ্য মানুষকে ধর্মান্তরিত করার সাথে তার যোগসাজশ আছে। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের গোরক্ষপুরের দাঙ্গায় তিনি ছিলেন প্রধান উসকানিদাতা। এ ঘটনায় তিনি ১৫ দিন হাজতবাস কাটান।
ভারতে বিজেপির নির্বাচনী রাজনীতির এখন মডেলে পরিণত হয়েছেন যোগী আদিত্যনাথ। যেসব রাজ্যে বিজেপির ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল সেসব রাজ্যে উত্তর প্রদেশের কৌশল কাজে লাগাতে চাইবে বিজেপি। কারণ, দাঙ্গা আর উগ্রপন্থাকে ব্যবহার করে গুজরাটের পর উত্তর প্রদেশে ভূমিধস সফলতা এসেছে। অমিত শাহর দৃষ্টি এখন পশ্চিম বাংলার দিকে। কলকাতার সংবাদপত্রগুলো খবর দিচ্ছে যোগী আদিত্যনাথকে সংবর্ধনা দেয়ার পরিকল্পনা করছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। গত নির্বাচনে রাজ্যে ভালো ফল করেছে দলটি। বিলীন হতে চলা বামফ্রন্টের বদলে তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে বিজেপির লড়াই হবে পশ্চিমবঙ্গে। বিজেপিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিভাবে মোকাবেলা করেন তা দেখার বিষয়।
শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী জিগির ও প্রবল সাংগঠনিক শক্তির কাছে রাজনৈতিক দলগুলো এখন অসহায় হয়ে পড়ছে। ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস এখন বিবর্ণ ফ্যাকাশে। রাহুল গান্ধীকে দিয়ে নেতৃত্ব সাজানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কংগ্রেস আর বিজেপি উভয়ই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করে আসছে। ভারতের মানুষ কংগ্রেসের মুখোশ পরা হিন্দুত্বের রাজনীতির বদলে বিজেপির রাখঢাকহীন উগ্রপন্থাকে গ্রহণ করেছে। কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরমের মতে, বিজেপি আর আরএসএসের সাংগঠিনক শক্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে কংগ্রেস। এর মধ্যে রাইসিনা হিল থেকে আগামী আগস্টে বিদায় নেবেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। রাষ্ট্র পরিচালনায় কংগ্রেসের আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। এর আগে জুলাইয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হবে। জাকির হোসেন, ফখরুদ্দিন আলী আহমদ বা এ পি জে আবদুল কালামের মতো ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট করে ভারত যে সেকুলারিজমের চাদর টানিয়ে রাখত সে পথে বিজেপি যাবে বলে মনে হয় না, বরং প্রণব মুখার্জি, শঙ্কর দয়াল শর্মা বা প্রতিভা পাতিলের মতো সাফসুতরা প্রেসিডেন্টের চেয়ে কোনো জটাধারী যে রাইসিনা হিলা আসবেন না তা হলফ করে বলা যায় না।
বাংলাদেশের সেকুলাররা এখন মোদিতে মজেছেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ ও নিপীড়নকে পুঁজি করে বিজেপির রাজনীতি নিয়ে তারা একেবারে নিশ্চুপ। বিজেপির উত্থানের মধ্যে অনেকে আবার ভারতে গণতন্ত্রের শক্ত অবস্থান ও বৈচিত্র্য খুঁজেছেন। একজন যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করা ভারতের বৈচিত্র্যময় রাজনীতির অংশ বলে মনে করেন। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, হিন্দুত্বের রাজনীতিতে এ দেশের সেকুলারদের অনীহা নেই। কিন্তু এ দেশে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে ইসলামপন্থীদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে তারা সোচ্চার। ধর্মের নামে বিশেষ করে ইসলামপন্থী রাজনীতি নাকি দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাহলে মোদির ভারত কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশের সেকুলারদের মোদিকে ভালো লাগে, কারণ মোদির যোগীতান্ত্রিক রাজনীতির টার্গেট ধর্ম হিসেবে ইসলাম। এখানেই সেকুলারদের সাথে মোদির মিল। ভারতে অব্যাহত উগ্রপন্থী রাজনীতির বিকাশ নিয়ে সে দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন উদ্বিগ্ন, তখন বাংলাদেশের সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা মোদির ঢাকা সফরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোদিকে গণতন্ত্র আর প্রতিবেশীদের প্রতি সহানুভূতিশীল দয়ালু এক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করে তার ইমেজ বাড়ানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হাস্যোজ্জ্বল সরব উপস্থিতি আমরা দেখেছি। মোদির অতীত নিয়ে তাদের মনে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বিকাশের মধ্য দিয়ে ভারতের ভেতরের রূপ যেমন আমরা দেখতে পাচ্ছি, তেমনি এ দেশের সেকুলারদের আসল রূপটি দেখছি।
alfazanambd@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.