ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

প্রথম পাতা

মিনারেল ওয়াটারের নামে দূষিত পানির রমরমা বাণিজ্য

বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট

খালিদ সাইফুল্লাহ

২১ মার্চ ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ঢাকা ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় মিনারেল ওয়াটারের নামে জার পানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বাসাবাড়ি ছাড়াও অফিস-আদালত, ফুটপাথের চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্টসহ সর্বত্রই এ পানির ব্যাপক চাহিদা। আর এ সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী নিয়ম-নীতি না মেনেই বিশুদ্ধ পানির নামে দূষিত পানি সরবরাহ করছে। বিএসটিআই মাঝে মধ্যে এসব কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও তদারকির অভাবে আবারো তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। নি¤œমানের এ পানি পানের কুফল না জেনেই সাধারণ মানুষ অহরহ পান করায় দেখা দিয়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি।
মিনারেল ওয়াটার। এ নামটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু ক’জন জানেন, পানি মিনারেল হতে হলে তাতে কী কী উপাদান লাগে। যেখানে পানির বিশুদ্ধতা নিয়েই সন্দেহ সেখানে মিনারেল নিয়ে টানাহেঁচড়া করে লাভ যে নেই, তা জানেন ও মানেন প্রতিটি ভোক্তা। ক’বছর ধরেই শহরে বেরিয়েছে নতুন এক মিনারেল ওয়াটার। ‘জাম্বু জার’ নামে এর পরিচিতি। দিন দিন এর চাহিদাও বাড়ছে। রাজধানীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নলকূপ বসানোর সুযোগ নেই। ঢাকা ওয়াসা দুই দশক আগে রাজধানীর বিভিন্ন মোড় থেকে বিনা মূল্যে পানি সরবরাহের কলগুলোও তুলে নিয়েছে। নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওয়াসা; কিন্তু এখনো তারা সফলতা দেখাতে পারেনি। নদীর পানি বিশুদ্ধ করে গ্রাহকদের সরবরাহ করলেও পানিতে দুর্গন্ধ থেকে যাচ্ছে। আগুনের তাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোটানোর পর সে পানি কোনো রকম পানযোগ্য হচ্ছে। এ ছাড়া বোতলজাত পানির দামও বেশি। এ কারণে অনেক নগরবাসী মিনারেল ওয়াটারের নামে জার পানি কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা অখ্যাত অজ্ঞাত কোম্পানির জারের পানি কিনে খাচ্ছেন। এ ছাড়া অফিস-আদালত, ফুটপাথের চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্টসহ সর্বত্রই এ পানির চাহিদা রয়েছে। দোকানপাটে প্রতি গ্লাস পানি এক টাকা মূল্যে বিক্রিও হচ্ছে। যেখানে দেড় লিটার প্লাস্টিক বোতলজাত পানির দাম ২৫ টাকা সেখানে ২০ লিটারের জাম্বু জার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০-৫০ টাকায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। কয়েক বছরে ঢাকা ও এর আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য মিনারেল ওয়াটার ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন নামে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারা জারভর্তি পানি উৎপাদন ও বিপণন করছে। এসব পানি ব্যবসার বেশির ভাগেরই বিএসটিআইর লাইসেন্স নেই। কেউ কেউ লাইসেন্স নিলেও তাদের ফ্যাক্টরি ইন্সপেকশন হয়নি কোনো দিনও। নামে মিনারেল ওয়াটার হলেও পানি শোধনের কোনো প্রযুক্তি তাদের কাছে নেই। সরাসরি সাপ্লাইয়ের পানি ভরে দেয়া হচ্ছে জারে। কেউ কেউ ট্যাবলেট দিয়ে শোধনের চেষ্টা করলেও চাহিদা বেশি হওয়ায় সে সুযোগও অনেক সময় পাওয়া যায় না। পানি ভরার জায়গাগুলোও অপরিচ্ছন্ন। কোনো কোনো ফ্যাক্টরি টয়লেট, ড্রেনের পাশের কল থেকে পানি ভরে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। বিএসটিআই, ঢাকা ওয়াসা ও র্যাব মাঝে মধ্যেই এর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করে। কখনো পাঠানো হয় জেলখানায়। কিন্তু এ ব্যবসা এতটাই লাভজনক যে জেল-জরিমানার পরও তারা আরো বেপরোয়াভাবে অবৈধ এ ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে।
কমলাপুর মোড়ে ফুটপাথে কামরুল ইসলামের চায়ের দোকানে কলা-কেকের পাশাপাশি ‘ফিল্টার পানি’ বিক্রিও বেশ জমজমাট। এই চা বিক্রেতা জানান, ছাত্রছাত্রী ও রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সব ধরনের পথচারী তার ‘ফিল্টার পানি’র ক্রেতা। প্রতি গ্লাস পানির দাম মাত্র এক টাকা। আর কোম্পানির কাছ থেকে তিনি ২০ লিটারের বড় জারভর্তি পানি কেনেন ৪০ টাকায়। দিনে তার বিক্রি হয় তিন-চার জার পানি। ভালো করে খেয়াল করলে চোখে পড়ে, ওই দোকানের ‘ফিল্টার পানি’র জারগুলো আদৌ মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) অনুমোদিত নয়। এ ছাড়া জারগুলোর গায়ে কোনো কোম্পানির নাম বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখও উল্লেখ নেই। জারগুলো নিয়মিত না ধোয়ার কারণে ভেতরে শেওলা জমে গেছে।
জানা যায়, ফুটপাথের দোকান ও মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা ‘ফিল্টার পানি’র ৮০ শতাংশই পরিশোধিত নয়। তথাকথিত বিশুদ্ধ পানিভর্তি জারটির গায়ে নেই কোনো লেবেল, এমনকি উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখও থাকে না। বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, মিনারেল ওয়াটার উৎপাদন ও বাজারজাতের আগে নিজস্ব ল্যাবরেটরি, সুরক্ষিত সেপটিক ট্যাংক, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কেমিস্ট, শ্রমিকদের সুস্থতা, নিয়মিত টেস্টিং রিপোর্ট দেয়াসহ বিএসটিআইএ’র ১৯টি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত থাকলেও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলোর সেসব নেই। এ দিকে নিবন্ধিত কারখানাগুলো পরিদর্শন ও বাজারজাতকৃত পানির নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও বিএসটিআই তা যথাযথভাবে পালন করছে না বলে অভিযোগ আছে।
বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (সিএম) নূরুল আমিন বলেন, বর্তমানে দেশে মাত্র তিন শতাধিক কোম্পানি বিএসটিআই থেকে অনুমোদন নিয়ে বোতলজাত ও জারে করে পানির ব্যবসায় করছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছে শতাধিক। তিনি বলেন, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় জার পানি বিক্রির নামে অবৈধ পানির ব্যবসা চলছে। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা ও সিলগালা করে দেয়ার পরও তাদের থামানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আবার তারা ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে। নূরুল আমিন জানান, বিভিন্ন কোম্পানির নামে জারে করে যে পানি বিক্রি করা হচ্ছে তা মানসম্মত নয়। একটি মানসম্পন্ন সুপেয় পানি তৈরির কারখানায় মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা করা জরুরি। এ পরীক্ষা করা না হলে পানিতে ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডসহ নানা পানিবাহিত রোগের জীবাণু থেকে যেতে পারে। এ ছাড়া পুনর্ব্যবহৃত (রিসাইকলড) জারগুলোকে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হয়। বর্তমানে প্রতিটি কারখানায় জার পরিষ্কার যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলোর ৯৮ ভাগ কারখানায়ই এর কিছুই নেই।
বিএসটিআইয়ের এ কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি অনুসন্ধান করে রাজধানীতে বেশ কিছু অবৈধ পানি ব্যবসায়ীর সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু জনবল ও পুলিশ না পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি ফিল্টারের নামে অপরিশোধিত এসব পানি না খাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা বন্ধ করতে এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক মেজর (অব:) ডা: আনোয়ার হোসেন বলেন, পানিতে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতিতে টাইফয়েড জাতীয় রোগ, ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, জন্ডিসের মতো জটিল রোগ হতে পারে।
পানি কি শুধু ফোটানোর মাধ্যমে বিশুদ্ধকরণ সম্ভব? : পানিতে মিশে থাকা বিষাক্ত কেমিক্যাল, ভারী ধাতু, মরিচা, সিসা, বিভিন্ন দূষিত পদার্থ ইত্যাদি শুধু ফোটানোর মাধ্যমে দূর করা যায় না বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. এম আশরাফ আলী বলেন, ব্যাকটেরিয়াসহ অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংসের জন্য পানি সঠিক তাপমাত্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ফোটাতে হয়। কিন্তু সঠিক তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট সময় ধরে পানি ফোটানোর বিষয়টি সবার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই পানি ফোটালেও ঝুঁকি রয়েই যায়। এ ছাড়া সাধারণ ফিল্টার পানি থেকে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া দূর করতে পারে না। এ জন্য পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য বিকল্প পথ বেছে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে উন্নতমানের পানিশোধন যন্ত্র এ ক্ষেত্রে প্রকৃত সমাধান হতে পারে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫