ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ অক্টোবর ২০১৭

প্রথম পাতা

২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা

মন্ত্রিসভার অনুমতি ছাড়া স্থাপনা করলেই জেল-জরিমানা

বিশেষ সংবাদদাতা

২১ মার্চ ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

জাতীয় সংসদের স্বীকৃতির পর একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞের দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করতে অস্ত্র দিয়ে দমনের চেষ্টায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে গণহত্যা শুরুর দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে মন্ত্রিসভা। আন্তর্জাতিকভাবেও দিবসটি পালনের জন্য এরই মধ্যে জাতিসঙ্ঘে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া স্থাপনা করলেই জেল-জরিমানার বিধান যুক্ত করে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন ২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে এখন দেশের যেকোনো ভূমি উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে হলে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘বালাইনাশক আইন ২০১৭’, ‘বস্ত্র আইন ২০১৭’ এবং ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন ২০১৭’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শততম টেস্ট ম্যাচে অবিস্মরণীয় জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা।
গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এসব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের বিষয়টি এরই মধ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। মন্ত্রিসভা এটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এখন আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনে কাজ করবে সরকার। বৈঠকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনের জন্য মন্ত্রিপরিষদের জারি করা পরিপত্র ‘ক’ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সচিব বলেন, ‘ক’ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলোÑ দিবসটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হবে।
সচিব বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। অপারেশন সার্চ লাইট নামে চালানো হয় এই গণহত্যা। ফুটপাথের মানুষের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসগুলোতেও চালানো হয় নির্মম গণহত্যা। আক্রমণ করা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে। পুলিশ বাহিনী তাদের হালকা অস্ত্র দিয়ে ঠেকাতে পারেনি সেনাদেরকে। এরপর বাঙালি পাল্টা অস্ত্র তুলে নিলেও পরের নয় মাসজুড়ে দেশজুড়ে চলে গণহত্যা। সব মিলিয়ে প্রাণ হারায় আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ। অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর ধষর্ণে সাড়ে তিন লাখের বেশি নারী নির্যাতিত হয় সেই সময়। শহরের পাশাপাশি দূর গ্রামের মানুষরাও এসব নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারেনি। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর পর এই দেশ থেকে বিদেশী সাংবাদিকদের বের করে দেয়া হয় এই অঞ্চল থেকে। তারপরও কিছু সাংবাদিক লুকিয়ে এসব গণহত্যার কিছু চিত্র তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নেয় ভারতে। আর ৯ মাসের সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের আছে ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণের জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের।
পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনে গত ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব আনেন জাসদ নেত্রী শিরীন আখতার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ ৬২ জন সংসদ সদস্য ওই আলোচনায় অংশ নেন। সেদিন প্রায় সাত ঘণ্টা আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব কণ্ঠ ভোটে পাস হয় সংসদে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় এখন থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে। এ বছর থেকেই এ দিবসটি পালন শুরু হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই মুহূর্তে আমি সেটি বলতে পারব না। দিবসটি এ বছর পালন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রস্তুত কি না সেটি আমি জানি না। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পালনের লক্ষ্যে কাজ করছে সংশিষ্ট বিভাগ। দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে জানিয়ে সচিব বলেন, জাতিসঙ্ঘে এ-সংক্রান্ত একটি সংস্থা আছে। তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া স্থাপনা করলেই জেল-জরিমানা : দেশের যেকোনো ভূমি উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে হলে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। এমন বিধান যুক্ত করে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন ২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁঁচ বছরের জেল ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এই আইনের অধীনে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২৭ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। এই উপদেষ্টা পরিষদ এ-সংক্রান্ত সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর কাজের সমন্বয় করবে। আর দৈনন্দিন কাজের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের নেতৃত্বে ২৫ সদস্যের একটি নির্বাহী পরিষদ থাকবে।
এতে বলা আছে, অনুমতি ছাড়া কেউ কৃষিজমি, জলাভূমি বা প্লাবনভূমিকে অকৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য কিনলে তার এক বছর থেকে পাঁচ বছরের সাজার পাশাপাশি আর্থিক দণ্ড হবে। দণ্ড হতে পারে পাঁচ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এই আইনের অধীনে মামলা জামিন অযোগ্য হবে বলেও খসড়ায় বলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকারি, আধাসরকারি বা বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সংস্থা পরিকল্পনার বাইরে ইমারত, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হাউজিং প্রকল্প গড়ে তুলতে চাইলে জাতীয় নগর ও অঞ্চল উপদেষ্টা পরিষদ এবং নগর উন্নয়ন অধিদফতরের অনুমতি নিতে হবে। নিয়ম কার্যকর হচ্ছে কি-না, তা মনিটর করতে শহর ও গ্রামে আলাদা আলাদা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কাজ করবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বর্তমানেও ভূূমি উন্নয়ন কাজের জন্য রাজউক, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। এখন এটিকে একটি আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ না থাকলেও সেটি বিধিতে উল্লেখ করা হবে। এ সময় কেউ যদি গ্রামের বাড়িতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে, তাহলে কোনো অনুমোদন লাগবে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, লাগবে। এখনো ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্টদের অনুমোদন নেয়ার কথা। কিন্তু নেয়া হয় না।
শফিউল আলম বলেন, ‘দেশে অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধে সরকার বদ্ধপরিকর। এ আইনের আওতায় নগর উন্নয়ন অধিদফতর গঠন করা হবে। যার মাধ্যমে দেশের সব নগর ও গ্রামের স্থাপনা নির্মাণ তদারকি করা হবে। সারা দেশে ভূমি ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনার জন্যই এ আইন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি অনেক দিনের প্রত্যাশিত আইন।
আইন অনুযায়ী, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০ জন সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করে ২৬ সদস্যের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। নগর উন্নয়ন অধিদফতরের পরিচালক ওই পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদের অধীনে একটি নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা নির্বাহী কমিটি থাকবে, যার চেয়ারম্যান হবেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নগর উন্নয়ন অধিদফতরের উপপরিচালক (গবেষণা ও সমন্বয়)। এ কমিটি নগর ও জনপদ উন্নয়নে কাজ করবে।
বালাইনাশক আইনে জরিমানা বাড়ছে : দীর্ঘ দিনের ইংরেজিতে তৈরি বালাইনাশক অধ্যাদেশ ও আইন বাংলায় রূপান্তরের প্রস্তাব রেখে বালাইনাশক আইন-২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ছাড়া আইনে আর্থিক জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পেসটিসাইড অর্ডিনেন্স ১৯৭১ কে আইন আকারে করা হয়েছে। আগে এটি ইংরেজিতে থাকলেও এখন তা বাংলায় করা হয়েছে। তিনি বলেন, দুই-এক জায়গা ছাড়া আইনের অন্য সব ধারা আগের মতো আছে। তবে আগে ২১ ধারায় থাকা অপরাধের শাস্তিকে ১৮ ধারায় প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি ১৯৭১ সালের পর ২০০৭ এবং ২০০৯ সালে দুইবার সংশোধন করা হয়েছে।
শফিউল আলম বলেন, আইনের ১৮ এর ১ ধারায় কোনো নির্দেশনা বা আইনের কোনো আদেশ-নির্দেশ অমান্য করা হলে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। দ্বিতীয়বার অমান্য করা হলে এক লাখ টাকা জরিমানা, তৃতীয়বার অমান্য করা হলে দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আগে এটি ছিল যথাক্রমে ৫০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার টাকা ও এক লাখ টাকা। মূল শাস্তির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
শততম টেস্ট জয়ে ক্রিকেট দলকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন : শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে জয়লাভ করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা।
গতকাল মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অভিনন্দন জানানো হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকের শুরুতে মন্ত্রিসভা শ্রীলঙ্কার জাতীয় ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শততম আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে বিজয় লাভ করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য মন্ত্রিসভা সর্বসম্মতিক্রমে অভিনন্দন প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। কলম্বোর পি সারা ওভালে স্বাগতিকদের বিপক্ষে শততম টেস্টে রোববার ৪ উইকেটের জয় তুলে নেয় সফরকারী বাংলাদেশ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫