ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

ওরা মায়ের জাত

কে জি মোস্তফা

২১ মার্চ ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দু’টি সন্তান। দু’টিই কন্যা। মিসেস পেশায় শিক্ষক। মেয়ে দু’টিকে যথোপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে তুলতে পেরেছেন তারা। মেয়ে দু’টি এখন প্রবাসে। একজন জাপানে, অপরজন নিউ ইয়র্কে। দুই গোলার্ধের দুই প্রান্ত। স্বস্তি ও সচ্ছলতায় এদের দাম্পত্য জীবন।
কিন্তু সন্তান দু’টি মেয়ে না হয়ে যদি ছেলে হতো? একটা প্রশ্ন হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়!
বস্তুত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই মনে করেন, সুন্দর করে স্বামী-ছেলে নিয়ে সংসার করাই মেয়েদের প্রাথমিক কর্তব্য। ছেলেরা আশা করে, স্ত্রীরা শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি কর্তব্যগুলো পালন করুক। কিন্তু যৌথ পরিবারÑ যেখানে ‘কন্ট্রোল ফ্রিক’ শাশুড়ি, অপর দিকে নিপীড়িত বা নিপীড়ক গৃহবধূ, মাঝখানে যাঁতাকলে পড়া ছেলেটি হয় মা, নয় বউয়ের দ্বন্দ্বে দিশেহারা।
অন্য দিকে অশিক্ষার অন্ধকারে সংসার খাঁচায় আবদ্ধ নারী স্বাধীনতার ‘স’-ও জানে না। ইদানীং পরিবার মানেই সংসার-সন্তান বনাম পেশার দায়িত্ব। কেউ কেউ সেই মেয়েদের পক্ষে, যারা পরিবার আর কাজ, ঘর আর বাইরের সুষম সমন্বয় করতে পারে। যদিও পরিবারের এক নম্বর শত্রু বিশ্বায়নের চাপ, পাশ্চাত্য ছকের কর্মসংস্কৃতি। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘আঠা দিয়ে জোড়া দেয়া’ সংসার চলছে, চলবে।
৮ মার্চ বিশ্ব নারীদিবস পালিত হলো। নারী উন্নয়নের বিশেষ কার্যক্রম পালনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। মেয়েদের অবস্থা, নারী নির্যাতন, নারীকেন্দ্রিক আন্দোলন, স্ত্রীশিক্ষা, স্ত্রীর স্বাধীনতা, নারীদের চিন্তা-চেতনার জগৎ, কর্মক্ষেত্রে নারী, প্রতিবাদী নারী, প্রকাশ্য জনজীবনে নারী, নারীর বিষয়াধিকার ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে এ দিবসের কর্মসূচি।
বলা বাহুল্য, এ দেশে নবাব বেগম ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, বেগম রোকেয়া প্রমুখ নেত্রী মেয়েদের দুঃখ-বেদনার কথা, স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, স্বাধীনতার বিষয়, পোশাকপরিচ্ছদ, প্রচলিত কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটেই এ দেশে নারী জাগরণের শুরু। রক্ষণশীলতার পাশাপাশি প্রগতিশীলতার ধারা প্রবাহিত হতে থাকে। সে সময় নারীর অবস্থান কোথায় ছিল, আজ বিবর্তনের কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, লক্ষ্যে পৌঁছতেই বা কত বাকি!
অধুনা নারীবাদী আন্দোলনে যে গূঢ় কথাটি বলা হচ্ছে, তা হলোÑ পুরুষেরা নাগরিক হিসেবে যে মর্যাদা পাচ্ছে, নারী তা পায় না। কিন্তু পাওয়া উচিত। কোনো বিপ্লব, কোনো সংবিধান, কোনো আইন নারীর পক্ষে টুঁ-শব্দটি করেনি। নারীকে আদৌ ‘মানুষ’ ভাবার মতো মন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরও ছিল না।
কিন্তু সমতা ও সততায় বিশ্বাসী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মধ্যযুগের মুসলিম পণ্ডিত থেকে আধুনিক মুসলিম নারীবাদীদের এ বিষয়ে চিন্তাধারা আজো অব্যাহত।
বর্তমানে ইন্টারনেট প্রচলিত হওয়ায় নতুন ধরনের মুসলিম পরিমণ্ডল গঠিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে মানবাধিকারের বোধ প্রসারিত হতে হতে নারীদের আরো অধিকার সচেতন করে তুলেছে। নারীরা পাচ্ছেন বৃহত্তর দুনিয়া সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ। উল্লেখ্য, ফ্রান্সে মুসলিম মহিলা নেত্রী মেরি আইমি হেলি লুকাস ‘উইমেন লিভিং আন্ডার মুসলিম লজ’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছেন। ১৯৯০ সালে এই সংগঠন ‘নারী ও আইন’ বিষয়ে একটি কর্মশালা পরিচালনা করে। গোঁড়া ইসলামপন্থীদের প্রভাব হ্রাস করাই ছিল সেই কর্মশালার উদ্দেশ্য।
মেয়েরা যে মায়ের জাতের বাইরেও একটি জাত, সে জাতের নাম মানুষ জাত। নারীবাদীদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব, নারীর সেই অধিকার বাঁচিয়ে রাখা।
বলা বাহুল্য, পশ্চিমা অপসংস্কৃতি আজ সর্বগ্রাসী। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সাঁতার কাটছেন পৃথিবীর নারী। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা যেন নগ্নতা আর নগ্নতা। অবক্ষয়ের জন্য যদিও পরিবার-পরিবেশ এবং কিছু বিত্তবান সমাজই দায়ী। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, সচ্ছল, সুযোগ-সুবিধা পাওয়া কিছু নারী কী ভয়ঙ্করভাবেই না ভুলে যান বেশির ভাগ নারীর কথা। বেশির ভাগ নারীই বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, নিরক্ষর, নির্যাতিত, অবহেলিত আর অসম্মানিত।
আরেকটি বিষয় ‘প্রেম’। অধুনা প্রেম যেন কাঁচা আবেগের এক সঞ্জীবনী ওম। পরিবারের সুলক্ষণা মেয়েটি কখন হারিয়ে ফেলে নিজের পরিচয়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একদা যে দেখত সীমাহীন নীল আকাশ, পেত জুঁইয়ের সুবাস, চোখে যার মেলে ধরত গোলাপ, থিরথির কেঁপে উঠত সবুজ পাতা, অঙ্গে রজনীগন্ধার শিহরণÑ সেই মেয়েটি কেন যে আর তেমন থাকে না। থাকে না তার কুমারী বুকের নিটোল স্বপন, হৃদয়ের মাতাল আবেগ, বিশ্রামবিহীন এলোমেলো চিন্তা। সেসব তরুণী আসলে উন্মাদ, যারা না জেনেশুনেই হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয় আপন আত্মা। এলোমেলো বোনে ভালোবাসার পবিত্র বীজ।
‘আনন্দদেবী’ ক্লিওপেট্রা কী কারণে হত্যা করত পূর্ব রাতের প্রেমিক! পুরুষের স্বভাবচরিত্র বিষয়ে কী গভীর জ্ঞান ছিল তার। প্রতিটি মুহূর্তে যে পুরুষ মিথ্যার বেসাতি করে, প্রিয়তমা নারীর সাথে নিত্য যার অভিনয়, অজস্র নীচতা আর তুচ্ছতার সমাবেশ যার প্রাণ-মন-দেহে, ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় কী ভয়ঙ্কর তার রূপ! রোমান্টিক প্রেমিকও বাস্তবে কত গাদ্যিক! জাদুকরী ক্লিওপেট্রা কিন্তু ফালা ফালা করে দেখতে পেরেছে ওদের স্বরূপ।
সবার তো সেই মায়াবী ক্ষমতা নেই। পরিণামে কারো কারো জীবন হয়ে ওঠে পাপবিদ্ধ এক নোংরা জলের নর্দমা। সেখানে কেবল মরা ব্যাঙ আর ইঁদুরের হাড়, গিজগিজে পোকাদের উৎসব, বুনো জঙ্গলে বিষাক্ত সাপের হিসহিসানি! এ বিশ্বে অবাঞ্ছিতা বলে ফুরিয়ে যায় তার সব দাবি, সব প্রয়োজন। বিমূঢ় যুগের বিভ্রান্ত পথিক, সে যেন হাত থেকে হাতে ঘোরা এক উড়ন্ত রুমাল!
লেখক : গীতিকার, কবি ও কলামিস্ট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫