ঢাকা, সোমবার,২৪ এপ্রিল ২০১৭

মতামত

সাবেক বিচারপতি কি বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে অভিযুক্ত করতে পারেন?

সিরাজ প্রামাণিক

২০ মার্চ ২০১৭,সোমবার, ২০:১৪


প্রিন্ট

বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের এক টকশোতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাকে ‘রাজাকার’ বলায় আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের প্রতি ইতোমধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন এক আইনজীবী। নোটিশে বলা হয়েছে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে ‘রাজাকার’ বলার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে নতুবা ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নোটিশে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আপনার বক্তব্য অনুযায়ী একটি সাংবিধানিক পদে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি যদি রাজাকার হয়ে থাকেন তাহলে এ স্বাধীনতার মাসে ৩০ লাখ শহীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে বিবেচিত হয়। একজন রাজাকারের অধীন দেশের সব বিচার বিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বার এবং বেঞ্চের মধ্যে যে সুসম্পর্ক সেটাও বিঘœ ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি আইনজীবী হিসেবে এ আদালতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করাও বিব্রতকর, যা আমার মানহানি হয়েছে।’
মানহানির মূল কথা হচ্ছে অন্যের সুনাম নষ্ট করা। মানহানি সম্পর্কে সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে, এটা একজন মানুষের চরিত্র বা মানসম্মানের ওপর একটা মারাত্মক আক্রমণ বা আঘাত সৃষ্টি করা। এটা একজন ব্যক্তির সুনামের ওপর মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করা। আরো বলা যায় যে, মানহানি একজন ব্যক্তির মানসম্মানের বিরুদ্ধে একটি অযৌক্তিক, বেআইনি ও মিথ্যা আঘাত সৃষ্টি করা। পত্রিকা বা মিডিয়া প্রকাশনার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ দেশের সব মানুষের কাছে প্রকাশ করা হয়। ফলে ওই ব্যক্তি সমাজে একজন ঘৃণিত, অপমানিত এবং মর্যাদাহানিকর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ফলে ওই ব্যক্তি তার চাকরি পর্যন্ত হারাতে পারে অথবা কোনো অফিসে চাকরি প্রাপ্তির বা চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বা ব্যবসা বা পেশা পরিচালনার ক্ষেত্রে, এমনকি বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রচলিত আছে যে, একজন ব্যক্তির টাকা বা সম্পদ নষ্ট বা চুরি হলে বিশেষ ক্ষতি হয় না, কিন্তু তার সুনাম, চরিত্র নষ্ট হলে জীবনের সব কিছুই হারিয়ে যায়। কাজেই প্রত্যেকটা মানুষের তার সুনাম ধারণ ও রক্ষণ করার অধিকার আইনগতভাবে তাকে প্রদান করা আছে। জেনেশুনে বা বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ থাকা সত্ত্বেও বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে পত্রিকায় মুদ্রণ, প্রকাশন ও বিক্রয় করার মাধ্যমে যেকোনো একজন নাগরিকের সুনাম, মানমর্যাদা জনসমক্ষে ক্ষুণ্ন করা একটা গুরুতর অপরাধ হিসেবে শুধু আমাদের দেশে নয়, প্রত্যেক দেশেই পরিগণিত হয় এবং এটা একটা ফৌজদারি ক্ষমাহীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই শাস্তির বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো বিধান প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত বা পাকিস্তানেও বিদ্যমান নেই।
চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং প্রত্যেক নাগরিকের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে এসব স্বাধীনতার অধিকারটা একই অনুচ্ছেদের আওতায় বিভিন্নভাবে যথা জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে ভোগ করার কথা বলা হয়েছে। এটা একটা বিশ্বজনীন নীতি- যেকোনো অধিকারই লাগামহীন নয়; কাজেই চিন্তা, বিবেক, ভাব প্রকাশ বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও লাগামহীন নয়। লাগামহীন বাক্ বা ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা একটা লাইসেন্স হয়ে যাবে এবং সে জন্যই আমাদের সংবিধানের অধিকাংশ মৌলিক অধিকারকেই যুক্তিসঙ্গত আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এটা বলা একান্ত প্রয়োজন যে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কখনোই একজন ব্যক্তি বা কোনো ব্যক্তি গোষ্ঠীর সুনাম, মর্যাদা রক্ষা করার স্বাধীনতা বিনষ্ট করতে পারবে না। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে দণ্ডবিধি আইনের ৫০১ ও ৫০২ ধারা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, এই মর্মে কোনো রায় প্রদান করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
বিচারকেরা যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তা কখনো নয়, তবে তার দায়বদ্ধতা বা সেসব সমালোচনার ধরন ও প্রকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। বিচারকের রায়ে যদি কোনো ব্যক্তি সন্তুষ্ট না হয় এবং সে যদি মনে করে তবে সে ন্যায়বিচারের প্রাপ্তির জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে। কাজেই আমাদের উচিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ভুলে গেলে চলবে না, একজন বিচারক যদি তার বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভীক না হতে পারেন ও প্রদত্ত রায় সম্পর্কে যদি উদ্বিগ্ন থাকেন বা প্রচারিত কোনো সংবাদ সম্পর্কে ভীত হয়ে যান তাহলে তিনি ন্যায়বিচার কিংবা স্বাধীনভাবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কুণ্ঠা বোধ করতে পারেন। যদি সে রকমটা হতে থাকে তবে পরিশেষে বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে দেশবাসী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিচারপতিদের সাহস থাকতে হবে, তবেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে। পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে আদালতের রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা করার। রায়ের সমালোচনা হতে কোনো দোষ নেই; কিন্তু যে বিচারক সে রায় প্রদান করেছেন তাকে তার রায়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা বা কোনো প্রকারের আক্রমণ করা যাবে না। যদি কোনো রাষ্ট্রে সে রকমটা হতে থাকে তবে সে রাষ্ট্রের বিচারপ্রতিষ্ঠান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ও গণতান্ত্রিক ধারা হুমকির মুখে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
আসুন আমরা একটি ইতিবাচক সংবাদের অপেক্ষায় থাকি। যে দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার পাতায় দেখতে পাবো ‘একজন বিচারক আরেকজন বিচারকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিষোদগার করতে পারবেন না- একটি বিশেষ আইন করে নিষেধ করা হয়েছে।’ সে দিন আমাদের সংবিধানের শাশ্বত বাণী চিরন্তন রূপ পাবে। শুরু হবে বিচারব্যবস্থায় নতুন এক যুগের।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী,
আইনগ্রন্থ প্রণেতা
Email: seraj.pramanik@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫