ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

নিকট ভবিষ্যৎ ও দূর ভবিষ্যৎ কোনোটাই দেখি না

মোজাফফর হোসেন

২০ মার্চ ২০১৭,সোমবার, ১৯:৫৮


প্রিন্ট

কত কিছুই তো দেখার আছে, আমরা দেখি না। দেখি না নিজের পরিবার, দেখি না সমাজ, দেখি না আপন দেশটাকেও। কিন্তু দেখি শুধু নিজেকে। দেখা-না-দেখার ‘দেখ’ ধাতুটির নানাবিধ অর্থ হয়ে থাকে। ভয় বা সতর্ক অর্থে যেমন- ‘দেখ, ভয় দেখাবি না; দেখ, ভালো হবে না বলছি। আবার ‘দেখ’ শব্দটি দেখা বা দর্শন করা অর্থেও ব্যবহার হয়; যেমন- দেখ, ময়ূরটা কী সুন্দর! কখনো কখনো প্রত্যক্ষ বা অবলোকন করা অর্থে দেখা শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। উপলব্ধি অর্থেও দেখা তার অর্থ ধারণ করে থাকে; যেমন- ১৯৪৭ থেকে ২০১৬; এ পর্যন্ত অনেক কিছুই তো দেখলাম। আরো বহু অর্থে দেখা শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে এই নিবন্ধে সামাজিক হালচাল দেখা নিয়ে কিছু কথার অবতারণা করা যেতে পারে।
কিছুসংখ্যক মানুষ তাদের সামনে সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনার দিকে চেয়ে থাকেন মাত্র; দেখেন না। দেখেন না এই অর্থে যে, যদি তারা ঘটনাগুলোকে দেখতেন তাহলে সে ঘটনা তাদের মনে দাগ কেটে যেতে পারত অথবা তাদের চিন্তায় আঁচড় লাগাতে পারত অথবা ভেতরের চেতনা নড়েচড়ে বসাতে পারত। কিন্তু কোনোটাই যখন হয় না, তখন সেটা তারা দেখেন না; শুধু চেয়ে থাকেন। এই চেয়ে থাকা আর দেখা এক নয়। অনেক মানুষ আছেন, যারা একটি ঘটনাকে গভীর থেকে দেখতে পারেন। গভীরে দেখার জন্য তাদের আলাদা চেতনার দরকার পড়ে; সে চেতনার কারণে হয়তো তারা দেখে থাকেন। এই আলাদা চেতনা মানুষের উপলব্ধি ক্ষমতাকে প্রবল করে তুলতে পারে। এমনও কেউ আছেন, যারা ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন; অর্থাৎ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নিকট ভবিষ্যতে কী হতে পারে এবং দূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত কী রূপ ধারণ করতে পারে তা স্বচ্ছভাবে দেখতে পারেন। যারা সেটা করতে পারেন তাদের পরিণামদ্রষ্টা বলা হয়ে থাকে। শুধু চেয়ে থাকলে সংঘটিত ঘটনার নিকট ভবিষ্যৎ ও দূর ভবিষ্যৎ কোনোটাই দেখা সম্ভব না-ও হতে পারে। এই অর্থে চেয়ে থাকা আর দেখা এক হতে পারে না।
১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ এই ৪৭ বছরে কত কিছু বদলে ফেলল, সেই বদলটি সামগ্রিকভাবে কারো পক্ষেই দেখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কেউ হয়তো শুধু উন্নতিই দেখে গেছেন, কিন্তু অবনতি তাদের চোখে ধরা পড়েনি। আবার কেউ হয়তো শুধু অবনতিই দেখেছেন, উন্নতিকে তাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। এ দেশে দেখার ব্যাপারটি সব সময় এমনই হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে যারা থাকেন তাদের কখনো দেশের উন্নতি দেখা হয় না, আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভেতরে যারা থাকেন তাদের কপালে উন্নতি ছাড়া অবনতি দেখার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হয় না। এভাবেই ৪৭ বছর কেটে গেছে। উন্নতি-অবনতি একসাথে সামগ্রিকভাবে দেখার সৌভাগ্য কারো হয়ে ওঠেনি। এ দেশের মানুষ রক্তের বিনিময়ে রাজনীতি দেখার সুযোগ পেয়েছে। সেই রাজনীতিতে নতুন নতুন নেতা দেখা যায় তবে রাজনীতিতে যে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে সেই দুর্বৃত্তায়নকেও আর সেভাবে দেখা হয় না। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন দেখতে গেলে তখন আর নেতা দেখা যায় না। সে জন্যই হয়তো দুর্বৃত্তায়ন দেখা হয় না। সব কিছুতে কেন জানি চেয়ে থাকার মানুষ রয়েছে, কিন্তু দেখার মানুষের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পেতে চলেছে। চলে এসেছে চেয়ে থাকার রাজনীতি, চেয়ে থাকার অর্থব্যবস্থা, চেয়ে থাকার শিক্ষা, চেয়ে থাকার সংস্কৃতি আর চেয়ে থাকার সময়; সর্বোপরি চেয়ে থাকার মানুষ উৎপন্ন হয়েছে।
সবাই কেন জানি চেয়ে থাকতে ভালোবেসেছে। কেউ নিজের করে কোনো কিছুকে দেখছে না। বাড়ির আশপাশে প্রতিবেশীদের বড় বড় দালানকোঠা হয়েছে সে দালানকোঠা অনায়াসে দেখা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবেশীর কেউ কেউ কোন ফাঁকে প্রতিবেশীদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে তা দেখা হয়ে ওঠেনি। নিজের ছেলেমেয়ে চোখের সামনে বেড়ে উঠেছে, দামি দামি জামাকাপড় পরতে শিখেছে সেটা দেখা হয়েছে, অথচ সেই ছেলেমেয়ে বিনয়, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাবিবর্জিত হয়ে অথবা উগ্রবাদী হিসেবে গড়ে উঠেছে, সেটা কখনো দেখা হয়নি। চোখের সামনে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গড়ে উঠতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে যে রঙ লাগানো হয়েছে, সেই রঙকেও হয়তো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে, কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে সেতুবন্ধন সে বন্ধন কখন কিভাবে আলগা হয়ে গেছে তা দেখার অবকাশ কারোই হয়নি। কোন সুযোগে ছাত্রদের হাতে পিস্তল, দা, বঁটি, খোন্তা, কুড়াল, দরপত্রের দলিল-দস্তাবেজ উঠে এসেছে, সেটা দেখা হয়নি। সেসব অস্ত্র ব্যবহার করে একই আদর্শে কিংবা ভিন্নমত পোষণকারী অন্য আদর্শের সহপাঠী প্রতিপক্ষকে খুন, জখম, নির্যাতনের মতো আত্মহননকারী ভয়াবহ অপরাধে ডুবে গেছে, সেটাও দেখা হয়ে ওঠেনি। কেন কেউ দেখে না, সেটাও কেউ দেখেনি। অবক্ষয় ছেয়ে গেল কেন? খতিয়ে দেখা গেল না। হয়তো বা সমাজকে কেউ কখনো গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখার প্রয়োজনও মনে করেনি; তাই দেখেনি। আর সে কারণেই হয়তো নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি সমাজে অগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে; সবখানে সবাই শুধু চেয়ে থেকেছে।
চোখের সামনে একদল মানুষ আরেকদল মানুষের গায়ে আগুন দেয়; মানুষ চেয়ে থাকে। হাতে রামদা, বন্দুক, চাপাতি, লাঠিসোটা নিয়ে একদল ছাত্র আরেকদল ছাত্রকে পশু তাড়ার মতো করে ধাওয়া করে; সবাই চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি, চেয়ে থাকেন ভাইস চ্যান্সেলর, চেয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা। চেয়ে থাকেন শিক্ষক-অভিভাবক, বাবা-মা। এমন করে চেয়ে থাকেন যেন সবাই রেসের ময়দানে ঘোড়দৌড় উপভোগ করেন। চোখের সামনে পুলিশ ঘুষ নেয় পথিক চেয়ে থাকে। সরকারি স্থাপনায় রডের বদলে বাঁশ দেয়া হয়, বাবুরা চেয়ে থাকে। হাসপাতালের ওষুধ চুরি হয়, সেই ওষুধ বাজারে বিক্রি হয়, কর্তারা চেয়ে থাকে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে খুন হয়, নেতারা চেয়ে থাকে। সব কিছুই সবাই চেয়ে চেয়ে দেখে। চোখের সামনে দেখে, প্রতিনিয়ত দেখে। কিন্তু দেখার মতো করে দেখে না। অনেক কিছুই গোপনে হয় না, চোখের সামনে হয়; চোখের সামনে হলেও আমাদের দেখা হয় না। কোথায় আমাদের পচন ধরেছে তা দেখেও দেখি না।
আমরা চেয়ে থাকি, দেখি না। চেয়ে থাকার সময় শেষ হয়েছে। দেখার সময় এসেছে। সবারই চোখ খুলে মন দিয়ে দেখার সময় হয়েছে। দেখতে আরো বিলম্ব হলে বাঙালি সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। ছাত্রদের হাতে দরপত্রের দলিল আর অস্ত্র গেল কিভাবে? খতিয়ে দেখা দরকার। প্রতিবেশী অনিরাপদ হলো কিভাবে, সেটা দেখা দরকার। ছেলেমেয়ে আদব-কায়দাবিবর্জিত হয় কিভাবে, দেখা দরকার। সমাজ অস্থির হলো কিভাবে? প্রত্যেক মানুষ অস্থির জীবন যাপন করছে কিসের প্রভাবে? তা দেখা দরকার। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন হয় কেন? গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার। এ দেখা সরকার দেখলে অর্ধেক দেখা হয়। আর এক ভাগ দেখা রাজনীতিতে রয়ে যায়; বাকি এক ভাগ তখন সবাই মিলে দেখতে পারে। দেখাটা তখন সহজ হয়। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫