ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

প্রশাসন

২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা মন্ত্রিসভার

বিশেষ সংবাদদাতা

২০ মার্চ ২০১৭,সোমবার, ১৭:৪৯ | আপডেট: ২০ মার্চ ২০১৭,সোমবার, ১৭:৫৬


প্রিন্ট

জাতীয় সংসদের স্বীকৃতির পর একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞের দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আন্তর্জাতিকভাবেও দিবসটি পালনের জন্য ইতোমধ্যে জাতিসংঘে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

একই সাথে অনুমতি ছাড়া স্থাপনা করলেই জেল-জরিমানার বিধান যুক্ত করে ‘নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন’ ২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে এখন দেশের যেকোনো ভূমি উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে হলে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। এ ছাড়া বালাইনাশক আইন-২০১৭, বস্ত্র আইন-২০১৭ এবং প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন-২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শততম টেস্ট ম্যাচে অবিস্মরণীয় জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা।

আজ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়াসহ এসব অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। মন্ত্রিসভা এটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এখন আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনে কাজ করবে সরকার। বৈঠকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনের জন্য মন্ত্রিপরিষদের জারি করা পরিপত্র ‘ক’ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সচিব বলেন, ‘ক’ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো, দিবসটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হবে।

সচিব বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। অপারেশন সার্চ লাইট নামে চালানো হয় এই গণহত্যা। ফুটপাতের মানুষের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসগুলোতেও চালানো হয় নির্মম গণহত্যা। আক্রমণ করা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে। পুলিশ বাহিনী তাদের হালকা অস্ত্র দিয়ে ঠেকাতে পারেনি সেনাদেরকে। এরপর বাঙালি পাল্টা অস্ত্র তুলে নিলেও পরের নয় মাসজুড়ে দেশজুড়ে চলে গণহত্যা। সব মিলিয়ে প্রাণ হারায় আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ। অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর ধর্ষণ; সাড়ে তিন লাখের বেশি নারী নির্যাতিত হয় সে সময়। শহরের পাশাপাশি দূর গ্রামের মানুষরাও এসব নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারেনি। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর পর এই দেশ থেকে বিদেশী সাংবাদিকদেরকে বের করে দেয়া হয় এই অঞ্চল থেকে। তারপরও কিছু সাংবাদিক লুকিয়ে এসব গণহত্যার কিছু চিত্র তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নেয় ভারতে। আর নয় মাসের সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের আছে ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণের জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের।

প্রসঙ্গত. পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনে গত ১১ মার্চ দশম জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আনেন জাসদ নেত্রী শিরীন আখতার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ ৬২ জন সংসদ সদস্য ওই আলোচনায় অংশ নেন। সেদিন প্রায় সাত ঘণ্টা আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে পাস হয়।

মন্ত্রিসভার অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় এখন থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে। এবছর থেকেই এ দিবসটি পালন শুরু হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই মুহূর্তে আমি সেটি বলতে পারবো না। এবছর পালন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রস্তুত কি না সেটা আমি জানি না। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পালনের লক্ষ্যে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে জানিয়ে সচিব বলেন, জাতিসংঘে এ সংক্রান্ত একটি সংস্থা আছে। তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

অনুমতি ছাড়া স্থাপনা করলেই জেল-জরিমানা
দেশের যেকোনো ভূমি উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে হলে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। এমন বিধান যুক্ত করে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন-২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

আজ মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এই আইনের অধীনে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২৭ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। এই উপদেষ্টা পরিষদ এ সংক্রান্ত সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর কাজের সমন্বয় সাধন করবে। আর দৈনন্দিন কাজের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিবের নেতৃত্বে ২৫ সদস্যের একটি নির্বাহী পরিষদ কাজ করবে।

এতে বলা আছে, অনুমতি ছাড়া কেউ কৃষিজমি, জলাভূমি বা প্লাবনভূমিকে অকৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য কিনলে তার এক বছর থেকে পাঁচ বছরের সাজার পাশাপাশি আর্থিক দণ্ড হবে। দণ্ড হতে পারে পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এই আইনের অধীনে মামলা জামিনঅযোগ্য হবে বলেও খসড়ায় বলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকারি, আধাসরকারি বা বেসরকারি যে কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সংস্থা পরিকল্পনার বাইরে ইমারত, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হাউজিং প্রকল্প গড়ে তুলতে চাইলে জাতীয় নগর ও অঞ্চল উপদেষ্টা পরিষদ এবং নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। নিয়ম কার্যকর হচ্ছে কি-না, তা মনিটর করতে শহর ও গ্রামে আলাদা আলাদা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কাজ করবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বর্তমানেও ভূমি উন্নয়নকাজের জন্য রাজউক, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। এখন এটিকে একটি আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ না থাকলেও সেটি বিধিতে উল্লেখ করা হবে। এ সময় কেউ যদি গ্রামের বাড়িতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে, তাহলে কোনো অনুমোদন লাগবে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, লাগবে। এখনো ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্টদের অনুমোদন নেওয়ার কথা। কিন্তু নেয়া হয় না।

শফিউল আলম বলেন, 'দেশে অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধে সরকার বদ্ধপরিকর। এ আইনের আওতায় নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর গঠন করা হবে। যার মাধ্যমে দেশের সব নগর ও গ্রামের স্থাপনা নির্মাণ তদারকি করা হবে। সারা দেশে ভূমি ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনার জন্যই এ আইন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি অনেক দিনের প্রত্যাশিত আইন।

আইন অনুযায়ী, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০ জন সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করে ২৬ সদস্যের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদের অধীনে একটি নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা নির্বাহী কমিটি থাকবে, যার চেয়ারম্যান হবেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (গবেষণা ও সমন্বয়)। এ কমিটি নগর ও জনপদ উন্নয়নে কাজ করবে।

বালাইনাশক আইনে জরিমানা বাড়ছে
দীর্ঘদিনের ইংরেজিতে তৈরি বালাইনাশক অধ্যাদেশ ও আইন বাংলায় রূপান্তরের প্রস্তাব রেখে বালাইনাশক আইন-২০১৭ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এছাড়া আইনে আর্থিক জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

আজ মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এই আইনের খসড়ার অনুমোদনের কথা জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, পেসটিসাইড অর্ডিনেন্স ১৯৭১কে আইন আকারে করা হয়েছে। আগে এটি ইংরেজিতে থাকলেও এখন তা বাংলায় করা হয়েছে। এছাড়া এখানে খুব বেশি পরিবর্তন আনা হয়নি। তিনি বলেন, দুই-এক জায়গা ছাড়া আইনের অন্যসব ধারা আগের মতো আছে। তবে আগে ২১ ধারায় থাকা অপরাধের শাস্তিকে ১৮ ধারায় প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি ১৯৭১ সালের পর ২০০৭ এবং ২০০৯ সালে দুইবার সংশোধন করা হয়েছে। তবে এবার খুব কম সংশোধনী আনা হয়েছে।

শফিউল আলম বলেন, আইনের ১৮ এর ১ ধারায় জেলা জরিমানা কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে কোনো নির্দেশনা বা আইনের কোনো আদেশ-নির্দেশ অমান্য করা হলে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। দ্বিতীয়বার অমান্য করা হলে এক লাখ টাকা জরিমানা, তৃতীয় বার অমান্য করা হলে দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আগে এটা ছিল যথাক্রমে ৫০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার টাকা ও এক লাখ টাকা। মূল শাস্তির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। দুই বছর জেল ও এক বছর কারাদণ্ডের আগের বিধানই বহাল আছে।

শততম টেস্ট জয়ে ক্রিকেট দলকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে শততম টেস্টে জয়লাভ করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা।

আজ মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অভিনন্দন জানানো হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকের শুরুতে মন্ত্রিসভা শ্রীলঙ্কার জাতীয় ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শততম আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে বিজয় লাভ করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য মন্ত্রিসভা সর্বসম্মতিক্রমে অভিনন্দন প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। কলম্বোর পি সারা ওভালে স্বাগতিকদের বিপক্ষে শততম টেস্টে রবিবার ৪ উইকেটের জয় তুলে নেয় সফরকারী বাংলাদেশ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫