ঢাকা, শনিবার,১৯ আগস্ট ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

নির্বাচন নিয়ে আশা-নিরাশার দোলা

সালাহউদ্দিন বাবর

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৭:৫৯


সালাহউদ্দিন বাবর

সালাহউদ্দিন বাবর

প্রিন্ট

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একই সাথে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটবে, নাকি আবারো একটি একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রহসন ঘটবে? তা নিয়ে এখন আশা-নিরাশার দোলায় দুলছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। অথচ আগামীতে অংশগ্রহণমূলক অর্থপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, জাতির আকাক্সক্ষা ও দেশের স্বার্থেই জরুরি। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে, দেশ থেকে দারিদ্র্য মোচন হবে, এই আশাবাদ সবার। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন যে হাওয়া বইছে, তাতে স্পষ্ট নির্বাচনের আমেজ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র বলেছে এবং সাধারণভাবেই ধরে নেয়া হচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে। বহু বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি। তার আগেই নির্বাচন হতে হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাতে দেশে এবং দেশের বাইরে আগামী নির্বাচন নিয়ে ঔৎসুক্য ও আগ্রহ প্রবল।
বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা এখন অনেক উঁচুতে। নারীর অধিকার, নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের স্বীকৃতি এসেছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু দেশ পিছিয়ে আছে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ও গণতন্ত্রে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর হাতে সাধারণ মানুষের নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ রয়েছে। শুধু সরকারি বাহিনী নয়, প্রভাবশালী মহলের হাতেও মানুষ লাঞ্ছিত হচ্ছে। হত্যা, গুম, বিনা বিচারে আটক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। দেশের জন্য আরো একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক দুর্নীতিপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কুখ্যাতি রয়েছে। অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, যাদের সহায়-সম্পদ বেশি এবং সমাজে যারা প্রভাবশালী, তারাই বেশি দুর্নীতি করে থাকে। ক্ষমতার কেন্দ্র ও আশপাশে যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা প্রবল। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত নেই বলে এখানে জবাবদিহিতার প্রচণ্ড অভাব। আর জবাবদিহিতা না থাকলে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের বিস্তার ঘটে। জনগণের অধিকার খর্ব হয় এবং সুশাসনের অভাব ঘটে। দুঃখজনক হচ্ছে, এখানে জবাবদিহিতার কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
বিগত দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে এটা বলা যায়, গত নির্বাচন কমিশন যোগ্যতার পরিচয় মোটেও দিতে না পারায় এবার নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের প্রখর দৃষ্টি। এ জন্য নতুন নির্বাচন কমিশনের সম্মুখে বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে নতুন নির্বাচন কমিশনের সূচনা কিন্তু আশাব্যঞ্জক নয়। সম্প্রতি কয়েকটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে। এসব নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি এবার লক্ষ্য করা গেছে, তা হলো ভোটারদের স্বল্পতা। নির্বাচন কমিশনও এ কথা স্বীকার করেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভোটপাগল। ভোটারেরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন উৎসব হিসেবে। নারী ও বৃদ্ধরা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে বিপুলভাবে উপস্থিত হন। কিন্তু এবার এ ধরনের দৃশ্য ভোটকেন্দ্রে ছিল না। ভোট নিয়ে হয়তো মানুষের হতাশা, ভীতি বা উৎসাহহীনতা ছিল। নির্বাচন কমিশন হয়তো ভীতি দূর করতে পারেনি অথবা উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারেনি। ভোটে বিভিন্ন অনিয়মের খবর জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের অনুপস্থিতিতে ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটডাকাতি, পোলিং এজেন্টদের মারধর, তাদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়াসহ বহু অনিয়ম হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকেরা বাধাগ্রস্ত হন, ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বুথের ভেতর পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার না থাকায় ভোট গ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গল্পগুজব করে সময় কাটিয়েছেন। একটি কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত জনৈক ব্যক্তিকে আটক করে শাস্তি দিয়েছেন। মোট কথা এই ভোট নিয়ে আশাবাদী হওয়ার খুব সুযোগ নেই।
এখন আসা যাক নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে। নতুন নির্বাচন কমিশনের সম্মুখে চ্যালেঞ্জ হলো- বিগত নির্বাচন যেভাবে জনগণকে হতাশ করেছে, সেই হতাশা দূর করা। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যে প্রচুর স্বাধীনতা দিয়েছে তা সমুন্নত করা এবং অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। অতীতে নির্বাচন কমিশনের সচিবালয় প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের অধীন ছিল। এখন তা আর নেই। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগের ব্যবস্থা রহিত করে কমিশন স্বাধীন করে দিয়েছে। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনতা দিয়েছে; কিন্তু তা প্রয়োগ করতে হবে। কমিশন নিরপেক্ষতার সাথে কাজ করে সব দলের জন্য নির্বাচনক্ষেত্র ‘সমতল’ করতে হবে। নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে পারে তার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হতে হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যে বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো হালনাগাদ করতে হবে। এখন নির্বাচন পরিচালনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং জেলা নির্বাচনী অফিসাররা সরকারের কর্মকর্তা। তারা প্রেষণে নির্বাচন কমিশনে যান। এতে তাদের ওপর সরকারের প্রভাব পড়ে। তাই নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ক্যাডার সৃষ্টি করতে হবে। নির্বাচনী বিরোধের এখন মীমাংসা হয় না। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পূর্ণমেয়াদ নিজ পদে থাকলেও তারা অভিযুক্ত হন না। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা চলে। এ ক্ষেত্রে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংবিধানে যে দিকনির্দেশনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রণয়ন করা অপরিহার্য।
নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন পরস্পর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে দেশের প্রধান দুই দল। আওয়ামী লীগ বলছে, আগামী সংসদ নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনেই হবে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে তারা (বিএনপি) আবারো প্রশ্ন তুলেছে। কিয়ামত পর্যন্ত নাকি তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি যাই বলুক না কেন, নির্বাচন ২০১৯ সালেই হবে এবং শেখ হাসিনার অধীনেই হবে।’ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, আগামী নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে হবে না। বেগম খালেদা জিয়া শিগগিরই নির্বাচনকালীন সরকারের যে রূপরেখা দেবেন, সেই রূপরেখা অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবে। সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেছেন।
সুশীলসমাজের সদস্য এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত দেশে যে ছয়টি সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেই ছয়টি নির্বাচনের একটিও ভালো হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী নির্বাচন ভালো হবে কি না, সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। ড. মালিক বলেন, বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যায়, আগামী নির্বাচন কোনোভাবেই সুষ্ঠু হবে না। গত ৪৭ বছরে ১০টি নির্বাচনের মধ্যে ছয়টি দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে। বাকি চারটি হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, তিনি একটি টিভি চ্যানেলের টকশোতে এ কথা বলেন। এখানে উল্লেখ করা যায়, যে চারটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে, সেগুলো অপেক্ষাকৃত ভালো নির্বাচন ছিল।
বিএনপি দাবি করছে, নির্বাচনের আগে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনসহায়ক সরকার গঠন করে তার অধীনে নির্বাচন। পত্রপত্রিকায় উল্লেখ করা হচ্ছে, সত্বর বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনসহায়ক সরকারের একটি রূপরেখা দেয়া হবে। এ দাবি নিয়ে বিএনপির নেতৃবৃন্দ সোচ্চার। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আবারো বলেছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও সম্প্রতি অনুরূপ বক্তব্য রাখেন। এ দিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেছেন, সংবিধানে ‘নির্বাচনসহায়ক সরকার’ বলে কিছু নেই। বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামীতে সেভাবে নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সম্পন্ন করবে। পৃথক এক ফোরামে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির থাকার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানের বাইরে গেলেও নিবন্ধন হারানোর ভয়ে বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসবে।’ অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে এর পাল্টা বক্তব্যে বলা হয়েছে, বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হলে আর কারো নিবন্ধন থাকবে না।
অপর দিকে আওয়ামী লীগ মনে করে, বিএনপি মুখে যাই বলুক দলের নিবন্ধন রক্ষার জন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নিতে বাধ্য। দলটি আরো মনে করে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে গুরুত্ব হারাবে। তা ছাড়া নির্বাচনী গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের ৯০ এইচ(১)ই ধারা বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হবে। তাদের মতে, এই ধারার কারণে বিএনপি নির্বাচনে আসতে বাধ্য হবে। আরপিও ৯০এইচ(১) ধারায় দলের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পাঁচটি কারণে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। এই ধারার (ই) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হবে যদি কোনো রাজনৈতিক দল পর পর দু’টি সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়। পরপর দুইবার নির্বাচনে অংশ না নেয়া দলটিকে শুনানিতে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। কমিশনের কাছে দলটির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না হলেই কেবল তারা নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবে।
ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ চায় আবারো ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসতে। সরকার একই কায়দায় ছলচাতুরী করে গোল করতে চায়, কিন্তু তা সহজ নয়। বাংলাদেশের মানুষ কখনোই ষড়যন্ত্র মেনে নেবে না। তিনি বলেন, আইন করা হয়েছে, দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। আইন হবে মানুষের কল্যাণের জন্য। যে আইন মানুষের কল্যাণে আসবে না, তা আইন নয়।
বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি জনপ্রিয় করা এবং সেই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এর অংশ হিসেবে নীরবে নির্বাচনী ইশতেহার রচনা করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। বর্তমান সংসদের অবস্থান ও জনপ্রিয়তা তারা যাচাই করছে। তৃণমূলে দলীয় কোন্দল কমানো, কথিত সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে নেয়ার কাজ বিএনপি শুরু করেছে। দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, দলের কার্যক্রমকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দল গোছানো, নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ঠিক করা এবং এ জন্য আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনী প্রস্তুতি গ্রহণ। বিএনপি ধারণা করছে, নির্বাচনসহায়ক সরকারের দাবি এই সরকার সহজে মেনে নেবে না। এ জন্য তাদের রাজপথে যেতে হতে পারে। রাজপথে যাওয়ার আগে জনমত গঠন, এই দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরা এবং এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার বিষয়ও বিএনপির চিন্তায় রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি ভিন্ন কারণেও আন্দোলনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা হলো, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে আনীত বিভিন্ন মামলা। আগামী নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যাযে ঔৎসুক্য রয়েছে। ইতোমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ব্রিটিশ মন্ত্রী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সরকার ও বিএনপির সাথে আলোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক বলয় থেকে বলা হচ্ছেÑ আগামী নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয়, সব দল নির্বাচনী ময়দানে সমান সুবিধা লাভ করুক এবং নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে এমন ব্যবস্থা নেয়া হোক।
তবে নির্বাচন আবারো একটি একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে শঙ্কা এখনো কাটেনি। নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন বয়কট করে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট। একতরফা সে নির্বাচন হয়েছিল সঙ্ঘাতময়। এখন একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা। প্রতিপক্ষ দুই রাজনৈতিক শিবির আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চলছে উত্তপ্ত বাদানুবাদ। এই উত্তেজনা সেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে। এ ইস্যুতে দুই পক্ষ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। নির্বাচনের মাঠে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে ক্ষমতাসীনেরা এবার আরো দুর্বল মনে করছে। একই সাথে, আওয়ামী লীগ মনে করছে আন্দোলন করে বিএনপির দাবি আদায় সম্ভব হবে না। ক্ষমতাসীনেরা আরো ভাবছেন, নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই এবার আর নির্বাচন বয়কট করতে পারবে না বিএনপি। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের এ ধরনের চিন্তার বিপরীত অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবিতে মাঠে নামবেন তারা। এই ইস্যুকে শক্তিশালী করে সামনে আরো কঠোর অবস্থান নেয়ার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। ‘উপযুক্ত সময়ে’ আন্দোলনের কৌশল ও ছক তৈরি করবে দলটি। এখনই বিএনপির শীর্ষ নেতারা বারবার এ কথা বলে আসছেন, তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে যাবেন না। অনেকের মত, আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে হয়তো আওয়ামী লীগ বিএনপির প্রতি নমনীয় হতে পারে। নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়াও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন হয় এবং নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারেও বিএনপি দৃষ্টি রাখবে। এসব বিষয় দেখেই নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।
রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এখন নির্বাচনের আবহ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আগের মতো জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতি হিসেবে ‘হোম টাস্ক’ শুরু করেছে, দলকে সাজাচ্ছে এবং মাঠে ময়দানে দলের নেতাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপিও নির্বাচনে তাদের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। জাতীয় পার্টির বিষয়টিও এবার লক্ষ করার মতো। গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে নির্বাচন করেছে। এবার তারা নতুন কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এবারো জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করেই কাজ করছে। এবারের কৌশল এমন বলে ধারণা করা হচ্ছে যে, বিএনপি যদি কোনো কারণে নির্বাচনে না আসে সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচনে নামাবে। এ দিকে জাতীয় পার্টি তাদের অবস্থান আরো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ করে তুলতে ইসলামপন্থী নামসর্বস্ব কয়েকটি দলের সাথে জোট করার জন্য আলাপ-আলোচনা করছে। ছোট বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনমুখী তেমন কোনো তৎপরতা এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে না।
নবগঠিত নির্বাচন কমিশনও আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় এবং পত্রপত্রিকার খবর অনুসারে নির্বাচন কমিশন আগামী বছর ডিসেম্বর মাসে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করেছে। একটি জাতীয় দৈনিক নির্বাচন কমিশন সচিবের বরাত দিয়ে বলেছে, সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের নভেম্বরে প্রথমে তফসিল ঘোষণা করে ডিসেম্বরের শেষ ভাগে সংসদ নির্বাচন হতে পারে। এই হিসাবে প্রায় এক বছর ৯ মাসের মতো সময় রয়েছে নির্বাচনের। নির্বাচন কমিশন (ইসি) চলতি মাসেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। ইসি সচিবালয় থেকে রোডম্যাপ তৈরির পুরোদমে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একটি জাতীয় দৈনিকের কাছে ইসি সচিব এ কথা প্রকাশ করেন। আগামী সংসদ নির্বাচনের পথে করণীয় নিয়ে সচিবালয় যে সময়টুকু রয়েছে তার একটি খসড়া কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করবে। এটি হচ্ছে রোডম্যাপ, যার ভিত্তিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ করা হবে। আগামী সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে কোন দিন কোন কাজটি করা হবে, তা চূড়ান্ত করা হবে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী রাজনৈতিক দল ও মিডিয়ার সাথে সংলাপের প্রস্তাব থাকবে। ইসির কর্মপরিকল্পনার মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার নিবন্ধন, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা মুদ্রণ, ডিজিটাল ভোটিং মেশিনে ভোটগ্রহণ, বিভিন্ন আইনকানুন সংশোধন ও আলোচনার জন্য সম্ভাব্য সূচি তৈরি হবে। সেই সাথে সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে কাজ শেষ করার বিষয়টি রোডম্যাপে অগ্রাধিকার পাবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রয়োজনীয় বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সবার মতামত গ্রহণের জন্য এ মাসের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রস্তাব রাখবে ইসি সচিবালয়। কর্মপরিকল্পনার বিষয়গুলো কমিশন বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে আলোকে তা সম্পাদন করবে ইসি সচিবালয়।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সর্বত্র এখন আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নির্বাচন প্রশ্নে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হওয়া এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান। নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্য হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। অথচ অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলের ন্যূনতম ঐকমত্য হওয়া খুবই জরুরি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের ভূমিকার ওপরই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্ভরশীল। দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে অতীতে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হতে হয়েছে তার প্রধান কারণ হচ্ছে, এ তিন পক্ষের দুর্বলতা। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো সুষ্ঠু না হওয়ার পেছনে এ দুই পক্ষের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আপত্তিজনক ছিল। অথচ এখন দেশের জন্য একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা অপরিহার্য।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫