ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

বিবিধ

সংবাদ উপস্থাপক সাজাহান খন্দকারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৭:৪৬


প্রিন্ট

নিউজ প্রেজেন্টার বলে কথা। তাদের সাধারণরা একটু আলাদাভাবেই দেখি। হ্যাঁ, দেখিই। কিন্তু কেউ জানি না তাদের ভেতরের কষ্টের কথা। কথাগুলো আমরা হয়তো কাউকেই বলি না। বা বলার মতো ইচ্ছাকে চাপিয়ে রাখি। কারণ সবাই আমাদের সুন্দর দেখে। দেখে টিভিতে অথবা বেতারের ইথারে শোনে কণ্ঠ। সেখানে তো নিজের কোনো কথা থাকে না। থাকে দেশের কথা বিদেশের কথা। মানুষের কথা প্রকৃতির কথা। থাকে বিশ্বজাহানের অথবা পার্থিব অপার্থিব সব। কিন্তু কেউ জানে না বা জানতে চায় না সংবাদ উপস্থাপকের কথা। সত্যিই আমরা এক অসহায় 'প্রাণী'। কোরবানির পশু যেমন কোরবানির জন্য সাজানো হয়, সংবাদ উপস্থাপকদের সাজানো হয় প্রতিবার, বার বার। তারা একটু এদিক-সেদিক করলেই শেষ সব অর্জন।
আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ। আজকের এই দিনে আমরা হারিয়েছি আমাদের সবার প্রিয় নিউজ আইকন সাজাহান খন্দকারকে। সেদিন সকালে খবরটা শুনে কাঁদতেও ভুলে গেলাম। দুই দশক ধরে মিডিয়ায় কাজ করে এটা অন্তত বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের জন্য, মানে সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য আসলে আমাদের পরিবার-বন্ধু-সহকর্মী ছাড়া আর কেউ নেই। কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানই আমাদের বিপদের দায় নিতে চায় না। স্বার্থ ফুরালেই শেষ, ‘আজ থেকে তোমাকে আর দরকার নেই’। এটাই বাস্তব।
আমাদের নিজস্ব 'স্ট্যাটাস' বা 'স্টাইল' বলে একটা বিষয় সবারই নজর কাড়ে। সত্যিই তা পারসোনালিটির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তা শুধু আমাদের নিজস্বতার প্রকাশ। আমাদের সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা, রোগ-শোক, সবই আমাদেরই। ঘটনা ঘটার পর আরেকজন সংবাদ উপস্থাপক তার করুণ কণ্ঠে বলে যান, আমাদের অমুক আজ নেই। ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন। তার পরই অন্য নিউজ। যদি খেলার নিউজ থাকে তবে হাসতে তাকে হবেই। আগের নিউজের কোমল রূপ ঠিক তখনি বদলে ফেলতে হবে। অর্থাৎ সব অতীত হয়ে গেল। কেউ জানল না আর তার কথা।
সাজাহান খন্দকার চলে গেছেন। ঠিক এ রকমই একটি নিউজ আমরা উপস্থাপন করেছি আজকের এই দিনে। আমরাই তাকে ভুলে গিয়েছি। কিন্তু এটা কি স্বাভাবিক? এটাই কি হওয়ার কথা ছিল? পড়ে দেখুন সাজাহান খন্দকারের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল কি না? বেতার টেলিভিশনে নিউজ তিনি একচেটিয়া পড়তেন। খুব ব্যস্ত থাকতেন। সকাল ৭টায় নিউজ থাকলে তাকে ঘুম থেকে উঠতে হতো ভোর ৫টায়। তার মানে তাকে ঘুমাতে যেতে হতো রাত ১০টার পরই। এটাই নিয়ম বলে জানি। কিন্তু এমন কোনো উদাহরণ তার ছিল না যে একটি রাতেও ১০টায় তিনি ঘুমাতেন। তার খুব কম হলেও রাত ২টার পর লাইট অফ হতো। তারপর ৫টায় উঠে নামাজ তারপর চলে আসতেন বেতারে। এখানে তাকে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পাওয়া যেত। অন্য কোনো কাজে অথবা আড্ডা অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠানে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি মিটিং আছে, উপস্থাপনার জন্য ডাকো তাকে। আবার অমুকের একটা আয়োজনে দরকার উপস্থাপক, ডাকো সাজাহান খন্দকারকে। এভাবেই হঠাৎ তার হার্ট অ্যাটাক হয়।
তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। একেবারে আইসিইউতে। জানাজানি হলে শুরু হলো সহকর্মীদের দেখাদেখি। ওটা তাকে আরো বেশি বিপদের দিকে নিয়ে যেতে থাকল। কিন্তু কী উপায়? নোটিশ দেয়া হলো বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিউজ রুমে। শুনে হয়তো চমকেই উঠবেন সবাই। নিউজ প্রেজেন্টার সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত সেই নোটিশে চাওয়া হলো সাহায্য। টাকার অভাবে সাজাহান খন্দকারের চিকিৎসা হলো ব্যাহত। খুব কম মানুষই এগিয়ে এলেন তার চিকিৎসাসহায়তায়। তবু টানা বেশ কিছু দিন চলল চিকিৎসা। তারপর সুস্থতার দিকে ফিরে এলেন। আবার তাকে আমরা পেলাম স্টুডিওতে। আবার সেই স্পষ্ট কণ্ঠ স্পষ্ট উচ্চারণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এলেন বাংলাদেশ বেতারের ৭৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে। সেখানেও তাকে দেখা গেল সেই হাস্যোজ্জ্বল সাজাহান খন্দকারকে। মাথার ওপরে স্বভাবসুলভ চশমাটা রাখা। দেখে মনে হলো আবার সেই আগের মতোই ব্যস্ততা তার। বিরামহীন নিদ্রাহীন একপেষে কর্মজীবন। অনেকেই তাকে নিষেধ করলাম- এভাবে নয়, আরো কিছু দিন পর না হয় করবেন অনুষ্ঠান। অনুরোধ তিনি মানলেন না।
বিটিভির ৫০ বছর পূর্তির আয়োজনেও তিনি হাসিতে কথায় মাতিয়ে রাখলেন। তারপর গেলেন গাজীপুরে সফিপুর আনসার একাডেমির অনুষ্ঠানে। তার রিহার্সেলে। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটা সমাবেশ ছিল আনসারদের নিয়ে। ক’দিন টানা সেখানে যাওয়া-আসা, নিউজ পড়া, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করা। নিজের কাজ তো আছেই। ওখানেই হয়তো খারাপ লেগেছিল তার। বাসায় এসেই আর পারলেন না। আবারো ভর্তি করা হলো জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউশনে। আবার শুরু হলো তার চিকিৎসা। আবারো দেয়া হলো সাহায্যের আবেদন লিখে নোটিশ। কিন্তু এবার তার অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলো। একপর্যায়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হলো। সেখান থেকে নেয়া হলো ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে। সেখান থেকে আবার তাকে নেয়া হলো শাহবাগে আইপিজিএমআর মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিইউতে। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ১৯ মার্চ ২০১৫।
না ফেরার দেশে যিনি একবার গেছেন, আর ফিরে আসার নজির নেই। কিন্তু যাওয়ার আগে এই আমাদের কিছু দায়িত্ব থেকে যায়। সেই দায়িত্ব আমরা পালন করতে পারিনি। যদি সঠিক সিদ্ধান্ত সঠিক চিকিৎসা তার হতো হয়তো তিনি এবারো ফিরে আসতে পারতেন। হ্যাঁ, প্রশ্নটা আসবেই। কেন তাকে বার বার হাসপাতাল পরিবর্তন করতে হয়েছিল? কেন? টাকার অভাবে নাকি নির্বুদ্ধিতায়? কেন তাকে জীবন বাঁচানোর জন্য সাহায্যের হাত পাততে হলো? যিনি দেশকে এত কিছু দিলেন, তার চিকিৎসার টাকা কেন অন্যের কাছ থেকে নিতে হলো? বেতার-টেলিভিশনের বিশেষ গ্রেডের একজন শিল্পীকেও বিনা চিকিৎসায় চলে যেতে হবে? কে দেবেন এই প্রশ্নের জবাব? কার কাছে করছি এই প্রশ্ন? কে করবেন এই অবিচারের বিচার? যার একটি শব্দের উচ্চারণ শুনতে অপেক্ষায় থাকতাম গোটা জাতি, তিনিই এভাবে বিনাচিকিৎসায় চলে যাবেন? আসলে এমনই আমরা নিউজ প্রেজেন্টার। এভাবেই মিডিয়ার বহু জনপ্রিয় মানুষকে সাহায্যের হাত পাততে হবে। এটাই বুঝি নিয়তি।
আমরা মরহুম সাজাহান খন্দকারের জন্য দোয়া করি। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আর কামনা করি, প্রতিটি স্বনামধন্য মানুষ যেন মৃত্যুতেও সম্মান নিয়ে যেতে পারেন।
লেখক : সংবাদ উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার ও সাংবাদিক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫