ঢাকা, শুক্রবার,২১ জুলাই ২০১৭

নারী

কোথায় যাবে ওরা

খন্দকার মর্জিনা সাঈদ

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৪:৫০


প্রিন্ট

মেয়েটার বয়স কতই! ১৭-১৮ হবে হয়তো। কোলে এক বছরের একটি, আর হাতে ধরে দাঁড়িয়ে তিন-চার বছর বয়সী আরেকটি শিশু। কোলের শিশুটি কাঁদছিল আর মায়ের ওড়না ধরে টানাটানি করছিল। সহজেই বোঝা গেল ক্ষুধার জ্বালায় শিশুটি অস্থির হয়ে উঠছে। উপায় না দেখে মা ফুটপাথেই বসে পড়ল। ওড়না দিয়ে কোনো মতে একটু আড়াল করে আপন মনে দুধ খাওয়াতে লাগল। একটু পরে আবার শুর পথ চলার চলতে লাগল। একপর্যায়ে মুখোমুখি হলে জানতে চাইলাম, কোথায় যাবে? মেয়েটির উত্তর ছিল, ‘কোথায় আর যামু! স্বামী নতুন বউ লইয়া ঘরে উঠল। এক কাপড়ে আমায় তাড়াইয়া দিলো। অনেক চেঁচাইছি কিন্তু কে শোনে কার কথা! বস্তির হগোল ডাইকা সালিস করাইতে চাইলাম। তাও করবার দিলো না। পোলাপান দুইডারে কাইড়া রাখার ধমকি দিলো। তাই উপায় না দেইখা এই দুইডারে সম্বল কইরাই পথে নামছি। একটা কামের খোঁজে অনেক বাড়ির দরজায় গিয়া দাঁড়াইছি। দারোয়ানেরা দূর দূর কইরা বাইর কইরা দেয়। কেউ আবার কু-প্রস্তাব দেয়। আড়ালে ডাইকা কয়, প্রস্তাবে রাজি হইলেই এই ফ্ল্যাটে ঢুকবার পারবা। পাইবা কাম। আইজকার দিনটা তো ঈমান ঠিক রাখছি। রাইত হইলে পারমু কি-না, জানি না।’ ফুটপাথে দেখা মেয়েটার বয়ান ছিল ঠিক এমনই। ওর অসহায়ত্ব দেখে সাহস করে বলেও ছিলাম, ছুটা কাজ করবে? মেয়েটা বলছিল- ‘না, ছুটা কাজে আমার পোশাইব না। বাচ্চা দুইডারে কোথায় রাখুম। যদি বান্ধাবাসা পাই, তাহলে বেতন কম পাইলেও করুম। পোলাপান দুইডারে কাছে রাখবারও পারুম। দুই চোখ ভইরা দেখবার পারুম, এইডা হুদা আশা।’ মেয়েটির আকাঙ্ক্ষার কথা শুনে চিহ্নিত হলাম। মস্ত এই ঢাকা শহরে যেখানে একজনের ঠাইই হয় না। সেখানে তিনজনের আশ্রয় জোটা অসম্ভবই মনে হচ্ছে। তারপরও মানুষতো আশায়ই বাঁচে।
মনোয়ারা মিমি। প্রায় দুই বছর হলো তিন শিশু নিয়ে বাবার বাড়ি আছেন। বাবা ৬৫ বছরের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তার সম্বল বলতে ঢাকার আদাবরে ১২ শ’ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট, আর সামান্য কিছু পেনশনের টাকা মিমি জানান, তিনি ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে মাস্টাস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরে একটা বেসরকারি কলেজে দুই-তিন বছর অধ্যাপনাও করেছেন। বিয়ে, সন্তানদের মা হওয়ার পর আর পারছিলেন না চাকরিতে সময় দিতে। অবশেষে সন্তানদের সংসারের প্রতি একনিষ্ঠ কর্তব্যপরায়ণেই বেশি উদ্যোগী হন। কিন্তু তাও বেশি বছর টেকসই হলো না। স্বামীর কাছে কোনো চাহিদার কথা প্রকাশ করলে, তা হোক নিত্যপণ্য, শিশুদের জামা-কাপড়, শিক্ষার উপকরণ, শোনালেই সে যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠত। চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিত। অনেক সময় মারধর করত। শেষ পর্যন্ত যৌতুকের দাবি তুলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলো। ভেবেছিলাম বাবার কাছে ফিরে এসে তার অসহায়ত্ব, দুশ্চিন্তা বাড়াব না। তাই দুই-চার মাস বন্ধু, আত্মীয়দের বাড়িতে আত্মগোপন করেছি। ভেবেছিলাম যোকোনো একটি চাকরির ব্যবস্থা করে নিতে পারব। পারব সন্তানদের দায়িত্ব নিতে। কিন্তু কোথাও চাকরি না পেয়ে অবশেষে বাবার সংসারেই আসতে হলো ফিরে। বাড়াতে হলো অবসরপ্রাপ্ত বাবার আর্থিক বোঝা। ভবিষ্যতেও যে চাকরি পাব, আমার সন্তানদের যাবতীয় দেখাশোনার জন্য পাবো দক্ষ লোক এমনও কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রবীণ বাবা-মায়েরও তো বিশ্রামের দরকার। দরকার মানসিক প্রশান্তির। যা দিতে পারছি না বলেই নিজ মনে হীনমন্যতায় ভুগছি। অপরাধ বোধ করছি ভাঙনকবলিত দাম্পত্য জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। যদিও এ জীবনের জন্য আমি একা-এককভাবে দায়ী নই বলেও জানান মনোয়ারা মিমি।
তাসলিমা আক্তার নিশি। একজন নারী উদ্যক্তা। একটি কানাডিয়ান এনজিওর হয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। নিশি জানান, ব্যক্তি জীবনে আমার মা এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তাই, জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই নানা বাড়িতে। মা অবশ্য জীবনকে থামিয়ে রাখেননি। সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পড়ালেখা করেছেন। নিজ যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাকরি ক্ষেত্রে প্রবেশ, নতুন দাম্পত্য সম্পর্ক গড়াসহ জীবনের সব প্রতিকূলতাকে শক্ত হাতে প্রতিহত করেছেন। কোনো একদিনের জন্য থামেননি। তার এক কথা, বাঁচতে হলে বাধ আসবেই। হোক মানসিক-শারীরিক। সেই বাধ পেরনোর পথ আমাকেই খুঁজে পেতে হবে। সুস্থ ও সুখী হতে হবে। পুরনো সব ভুলতে হবে। মাকে খুব একটা কাছে পাইনি সত্য। তবে যতক্ষণ মা পাশে থাকতেন, ততক্ষণই আমার জন্য শিক্ষা লাভের সময়। আর মায়ের জ্ঞান সম্বল করেই চলছি পথ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫