লিপি এখন কম্পিউটার আপা

আবদুর রাজ্জাক

মানিকগঞ্জের মেয়ে ফারহানা আফরোজ লিপি নিজের কাজে ও যোগ্যতায় সফল হয়েছেন। জিতে নিয়েছেন পুরস্কার। ২০১১ সালে ২৮ অক্টোবর ঢাকায় ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ভবনে ‘ওয়ার্ল্ড আইসিটি গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিভাগের শতাধিক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিশেষ অবদানের কারণে লিপি কম্পিউটার সেন্টার প্রথম হওয়ায় ওই অনুষ্ঠানে তাকে স্বর্ণপদক দেয়া হয়। ২০১৫ সালে ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি ফাউন্ডেশন ‘আইসিটি শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা’র সম্মাননা স্মারক হিসেবে ক্রেস্ট ও স্বর্ণপদক দেয়া হয় তাকে।
এসএসসি পাস করে সবেমাত্র কলেজে পা রেখেছেন । পরিবারের সবার সঙ্গে উচ্ছ্বাস-আনন্দেই কাটছিল দিন। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম; ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার বাবা মো. আনোয়ার হোসেন হঠাৎ একদিন মারা গেলেন। অসচ্ছলতা ও হতাশা নেমে এলো পরিবারটিতে। অর্থকষ্টে দু’বেলা দু’মুঠো খাদ্য জোগানই সে সময় পরিণত হলো অনিয়মিত রুটিনে। তখন লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া লিপির জন্য কতটা যে দুরূহ বিষয় হয়ে দাঁড়াল, তা বর্ণনাতীত কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বললেন তার মা রোকেয়া আনোয়ার । না, তবু হাল ছাড়েননি তিনি। ভাগ্যের হাতে নিজেকে সোপর্দ না করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়প্রত্যয়ের বীজ বুনলেন অন্তরে। তার সেই আত্মবিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রমই তাকে এনে দিয়েছে সাফল্যের বিজয় মুকুট।
দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে লিপি সেজ। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য কিছু টাকা ছিল। তা দিয়ে বড় বোনের বিয়ে দেয়া হয়। প্রয়োজনের তাগিদে তিনি প্রাইভেট পড়িয়ে কোনো রকমে চালিয়ে যান নিজের পড়াশোনা। কিন্তু সংসার আর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চলবে কিভাবে? মাথায় চিন্তা এলো, কিছু একটা করা দরকার। সিদ্ধান্ত নিলেন, গ্রামের আর দশজন গৃহবধূর সাথে জামা-পাঞ্জাবি সেলাইয়ের কাজ করবেন। যেই ভাবা, সেই কাজ। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) সেলাইয়ের কাজও মিলে গেল। কিন্তু সমস্যা হলো ঈদ কিংবা পূজার উৎসবের আগে তিন মাস ছাড়া বাকি সময় কাজ থাকে না। এতে তো সংসার চলবে না। নয়া দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ভর করল স্বপ্নিল হৃদয়ে। অবশেষে তার এক আত্মীয়ের সহায়তায় কাজ নিলেন স্থানীয় এক দর্জির দোকানে। কাজের ফাঁকে চালিয়ে যান পড়াশোনা। মানিকগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ থেকে সম্পন্ন করেন স্নাতক।
সাফল্যের গোড়াপত্তন : ২০০৩ সালের কথা। লিপি একদিন মানিকগঞ্জ পৌর সুপার মার্কেটে ‘বিট-বাইট কম্পিউটার সেন্টার’ নামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দেখতে পান। সে সময় ছোট্ট এই জেলা শহরে হাতেগোনা মাত্র দু-তিনটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল। ওই কেন্দ্রে ক’য়েকজন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। লিপি তখন সাহস করে কথা বলেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী বর্তমানে মোহনা টেলিভিশনের মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি মো. সালাউদ্দিন রিপনের সাথে। কম্পিউটার শেখার আগ্রহের কথা জানালেন লিপি এবং খুলে বললেন তার জীবনের সব ঘটনা। সবকিছু জানার পর টাকা ছাড়াই কম্পিউটার শেখানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন রিপন।
বাড়ি ফিরে লিপি মা ও ছোট ভাইকে জানালেন তার ইচ্ছার কথা। পরের দিন থেকেই শুরু করলেন কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেয়া। একই সাথে চলতে থাকল সেলাই কাজ আর কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। এভাবে ছয় মাস না যেতেই মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল, ফটোশপসহ কম্পিউটারের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামিং সফটওয়্যারের কাজ সম্পর্কে ভালো ধারণা হলো তার। এক সময় রিপন জানালেন, নানা কাজে তার বাইরে থাকতে হয়। খুব একটা সময় দিতে পারেন না। তা ছাড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আরও একজন প্রশিক্ষকেরও প্রয়োজন আপনি থাকবেন কিনা? লিপি আর সুযোগটি হাতছাড়া করলেন না। তখনই রাজি হয়ে গেলেন। এবার লিপির সুযোগ হলো প্রশিক্ষণ নেয়ার পাশাপাশি ‘বিট-বাইট কম্পিউটার সেন্টারে’ প্রশিক্ষক হওয়ার। অপর দিকে বন্দোবস্ত হলো পারিশ্রমিক হিসেবে মাসে দুই হাজার টাকা। ফলে বাদ দিলেন সেলাইয়ের কাজ। আরও মাস ছয়েক পার হওয়ার পর বেতন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াল তিন হাজার টাকায়। এভাবে প্রশিক্ষণের চাকরিতে কেটে গেল কয়েক বছর।
আত্মনির্ভরতার বুনিয়াদ : এবার লিপি ভাবলেন, নিজেই একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দিলে কেমন হয়? বড় ভাইয়ের কাছে পরামর্শ নিলেন। তত দিনে বড় ভাইও পেয়ে গেছে ভালো একটা চাকরি। বোনের ইচ্ছার কথা জানার পর ভাই একটি কম্পিউটার কিনে দেয়ার কথা জানালেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দিতে গেলে তো শুধু কম্পিউটার হলেই হবে না। এর জন্য চাই একটা ভালো ঘর, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও আসবাবপত্র। গেলেন পৌর মার্কেটের বণিক সমিতির সভাপতি গোলাম কিবরিয়ার কাছে। ইতিমধ্যে একই মার্কেটে প্রশিক্ষণের কাজ করার সুবাদে আগে থেকেই লিপির সম্পর্কে জানতেন তিনি। ২০০৯ সালের মার্চ মাসের কথা। শেষমেশ তিনি জামানতের অগ্রিম টাকা ছাড়াই মাসে এক হাজার টাকা ভাড়ায় একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর একটি কম্পিউটার নিয়ে শুরু হলো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম। শুরুতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে এমন দুজন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি করা হলো। শুরু হলো লিপির নতুন করে স্বপ্ন দেখার, নতুন করে বাঁচার। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির নাম দিলেন ‘লিপি কাম্পউটার সেন্টার’। শুরুতে মার্কেটের আশপাশের ব্যবসায়ীরা বিষয়টি খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না। এতে তিনি বিচলিত কিংবা পিছু হটেননি। বরং নয়া উদ্যমে মনোনিবেশ করলেন কাজে। এক মাস দুই মাস-এভাবে বাড়তে থাকল প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা। তবে পড়ালেখা ছাড়েননি তিনি। এরই মাঝে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ফেললেন। মাঝে বিয়েও করেন। বিয়ের পর থেকে তাকে সহযোগিতা করছেন স্বামী রকিবুল হাসান পাভেল। তিনি যুব উন্নয়ন অধিদফতর, মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয় থেকে কম্পিউটার বেসিক, পোশাক তৈরি ও মৎস্য চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে ঋণ নিয়ে সফল আত্মকর্মী হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমানে তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৫টি কম্পিউটার, রয়েছে শতাধিক প্রশিক্ষণার্থী। মার্কেটের ব্যবসায়ীরা সবাই এখন তাকে সম্মান করেন। ডাকেন ‘কম্পিউটার আপা’ বলে। তার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় সহস্রাধিক নারী-পুরুষ বিভিন্ন পেশায় কম্পিউটার বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন।
জীবন সংগ্রামে জয়ী ফারহানা আফরোজ লিপি বললেন, আমি সব সময় হৃদয়ে ধারণ করি ‘সাফল্য তাদের কাছেই ধরা দেয় যারা সাহস করে এগিয়ে যায়’। বাংলাদেশের নারীসমাজ দীর্ঘকাল থেকেই নানাভাবে বঞ্চিত। কর্মক্ষেত্র, সংসার, পরিবার, সমাজসহ রাষ্ট্রের সব জায়গায় নারীরা নিগৃহীত। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বিক
উন্নয়নে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ একটি জরুরি বিষয়। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তি পৌঁছে যাচ্ছে। গরিব ও মেধাবীদের বিনা খরচে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণসহ শিশুদের জন্য একটি কম্পিউটার স্কুল প্রতিষ্ঠা করার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানালেন তিনি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.