ঢাকা, শনিবার,২৯ এপ্রিল ২০১৭

অবকাশ

বীর প্রতীকের চোখে অশ্রু

আব্দুর রাজ্জাক

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বীর প্রতীক আতাহার আলী খান মানিকগঞ্জের খেতাবপ্রাপ্ত তিন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে একমাত্র বেঁচে আছেন তিনি। সদর উপজেলার বাড়ই ভিকরা গ্রামে তার বাড়ি। স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয়ের মাস এলেই খোঁজ পড়ে তার। সাংবাদিকেরা আসেন, ছবি তোলেন, ঝলমলে পাঞ্জাবি পরে নেতাদেরও কেউ কেউ আসেন, কুশল জিজ্ঞেস করেন, আশ্বাস দেন আবার চলেও যান। তারপর সব আগের মতোই সাদামাটা। বাকি দিনগুলো কেমন করে কাটছে, কী খাচ্ছে, সংসারই বা চলছে কী করে কেউ কোনো খবর রাখে না। 
‘১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাস। বাবার সাথে অভিমান করে চট্টগ্রামে চাচার বাড়ি চলে গেলাম। স্কুলজীবনে ভালো ক্রীড়াবিদ ছিলাম। সে সূত্রে চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) বর্তমানের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে চাকরি পেলাম। প্রশিক্ষণ শেষে পোস্টিং হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পাটগ্রামে। চাকরির আট বছরের মাথায় এলো ১৯৭১। তখন টগবগে তরুণ আমি। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিনি, ভাবিনি পরিবার-পরিজনের কথা। দেশমাতৃকার টানে সোজা যুদ্ধের ময়দানে। ভুরুঙ্গামারী কলেজে পাকসেনাদের একটি ক্যাম্পে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে ২০ জনের মতো খানসেনা মেরে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেই। এরপর রায়গঞ্জে পাকসেনাদের হেড কোয়ার্টারে আক্রমণ চালাই। লে. সামাদসহ আমাদের ১২-১৩ জন সহযোদ্ধা শহীদ হন। ‘আমরা বাধ্য হয়ে পিছু হটে আসি। তবে এ ঘটনার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আমরা পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন ছিল ১৪ ডিসেম্বর। এবার আর ব্যর্থ হইনি। আমাদের মরণপণ হামলায় রায়গঞ্জ হেড কোয়ার্টারে অবস্থানরত শতাধিক পাকসেনাকে আমরা খতম করি। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস বৃহত্তর রংপুর, লালমনিরহাট, রায়গঞ্জ, জয়পুরহাট, ভুরুঙ্গামারীসহ বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। শীর্ণকায় শরীর, জ্বলজ্বল করতে থাকা কোটরাগত গৌরবী চোখ আর দুর্বার গতি চেহারার আতাহার আলী বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পেয়েছিলাম মর্যাদাপূর্ণ বীর প্রতীক খেতাব। একজন সৈনিকের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!
তবে যুদ্ধশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে ফের চাকরিতে যোগ দিলেও পূর্ণমেয়াদে চাকরি করার ভাগ্য হয়নি বীর প্রতীক আতাহার আলীর। ১৯৮৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভালুকাপাড়ায় শান্তিবাহিনী আতাহার আলীদের ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে তিন সৈনিককে হত্যা করে। আকস্মিক এই হামলা ঠেকানোর ব্যর্থতার দায়ে আতাহার আলীসহ ১০ বিডিআর সদস্যকে বরখাস্ত করা হয় তখন। অথচ এই ব্যর্থতার দায় তার ছিল না বলে দাবি তার। দায়িত্বে ছিল না কোনো গাফিলতি। এরপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরেও চাকরি ফিরে পাননি এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। একবারও বিবেচনায় আনা হয়নি তার বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্তির গৌরব। ‘রাজনীতি করি না বলে অথবা বিত্তবৈভব নেই বলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সে সম্মানটাও কেউ আগের মতো দেয় না। এটুকু যে দেয় তাও যেন করুণা করেই দেয়।’ এসব কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হন আতাহার আলী খান। প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা কুরে কুরে খায় তার অন্তরাত্মাকে। চোখ গড়িয়ে নামে অশ্রুধারা। সেই থেকে অভাব, অনাহার, ক্ষুধা তার পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এরপর বলেন, মানিকগঞ্জ শহরে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বেশ ক’টি মার্কেট হয়েছে। কিন্তু একটি দোকানের বরাদ্দ আমার নামে জোটেনি। 
‘ভেবেছিলাম চাকরি গেছে তো কী হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার সম্মান নিয়েই বেঁচে থাকব। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সে সম্মানটুকুও কেউ অন্তর দিয়ে দিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে অভাব আর অবহেলায় দগ্ধ হয়েও মানিকগঞ্জের এই অজপাড়াগাঁয়ে বাপ-দাদার মাটি কামড়ে পড়ে আছি। বাড়িতে সাংবাদিক আর নেতাদের আনাগোনা দেখলে গ্রামের মানুষ টের পায়, স্বাধীনতা দিবস অথবা বিজয় দিবস আসছে।
আতাহার আলীর বয়স সত্তরের কোটা পেরিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। জীবনের পড়ন্ত বেলায় অসুখ-বিসুখ বাসা বেঁধেছে শরীরে। এরই মধ্যে তার স্ত্রী পরপারে চলে গেছেন। এখন অনেকটা একাকী জীবনযাপন করতে হচ্ছে এই বীরকে। একমাত্র ছেলের রোজগারেই তার বেঁচে থাকা। কিছুই চাওয়ার নেই আতাহার আলীর; অভাবে নয়, কষ্ট বাড়ে শুধু অবহেলায়।
এলাকাবাসীর আকাক্সক্ষা তাদের গ্রামের পাশে নির্মিতব্য ধলেশ্বরী নদী ব্রিজটি যেন বীর প্রতীক আতাহার আলীর নামেই হয়Ñ এটুকু সম্মান করতে কেউ যেন কার্পণ্য না করেন।



 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫