ঢাকা, সোমবার,০১ মে ২০১৭

অবকাশ

এক ছোট্ট মুক্তিযোদ্ধার কথা

রুমান হাফিজ

১৯ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গ্রামের বাড়িতে এলে ঘরে বসে থাকতে পারি না। কোথাও-না-কোথাও ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। শহুরে বন্দিজীবন থেকে বের হওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য। তবুও একটু সুযোগ পেলেই ছুটে আসি গ্রামের বাড়িতে। যেখানে আমার ভালো লাগার সব উপকরণ ছড়িয়ে আছে। সুবিশাল মাঠ, নদী, খাল-বিল, গাছগাছালি কিংবা কাদামাখা মেঠো পথ আরো কত কী!
সেদিন বিকেলে বাড়ির পাশেই একটি মুদিদোকানে বসে বন্ধুদের সাথে গল্প করছিলাম। মুদিদোকানি আজিজ মামা আর আমরা চারজন মতি, সুমন, মুয়াজ ছাড়া আর কেউ ছিল না তখন।
আমাদের আড্ডা চলছে। এ সময় এসে হাজির এনাম চাচা। পুরো নাম শফিকুল হক এনাম হলেও এনাম নামেই পরিচিত সবার কাছে। এলাকাজুড়ে এনাম চাচার অন্য একটা পরিচয় রয়েছে, তা হলোÑ তিনি একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
চাচা আমাদের পাশে বসলেন। আমরা তখন চাচার সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, আচ্ছা চাচা যখন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাহলে তো চাচার থেকে যুদ্ধকালীন তথ্য জানা যাবে।
আমি চাচার কাছে জানতে চাইলামÑ
-আপনি তো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তখনকার কোনো ঘটনা যদি বলতেন।
-অসুবিধা নেই, নিশ্চয় বলব ভাতিজা।
চাচা বলতে শুরু করলেনÑ
পাকবাহিনী যখন আমাদের নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল পঁচিশে মার্চের কালরাতে এবং অসংখ্য মানুষকে সেদিন তারা হত্যা করেছিল নারকীয় কায়দায়, তখন দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় শুরু হলো। স্বাধীনতার ডাক পড়ে গেল, সবাই যে যার মতো করে মুক্তিসংগ্রামে শরিক হলো। আমি তখন এইটে পড়ি, খুব একটা বড় না হলেও তখনকার পরিস্থিতি পুরোপুরি বুঝতে পারতাম। আমাদের স্কুলের শিক্ষকেরা দেশের চলমান অবস্থা নিয়ে বেশ কথাবার্তা বলতেন এবং আমাদেরকে দেশের জন্য সর্বদায়ই জাগ্রত থাকতে বলতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্কুল-কলেজ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
তখন আমার সাথে যারা পড়ত, তাদের অনেকেই মুক্তিসেনার খাতায় নাম লিখিয়ে ট্রেনিংয়ে চলে যায়। আমি তখনো যেতে পারিনি।
একদিন আমার এক বন্ধুর সাথে মুক্তিসেনাদের ক্যাম্পে চলে আসি। প্রথমে আমাদের দু’জনকে দেখে তারা কী করবেন দ্বিধায় পড়েন। আমাদের ভীষণ ইচ্ছে দেখে সাথে রাখবেন বলে আশ্বস্ত করলেন।
ক্যাম্পে মুক্তিসেনাদের ট্রেনিং দেখতাম এবং তারা বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন করতে যেতেন তাও শুনতাম কিভাবে পাক সেনাদের সাথে লড়াই করতেন। একদম কাছে থেকে তখন মুক্তিযুদ্ধ দেখতে পেরেছিলাম। মনে মনে ভাবতাম, যদি আমাদেরও যুদ্ধ করতে নিতেন এবং ট্রেনিং দেয়াতেন। তবে এই চাওয়া বেশি দিন অপূর্ণ থাকেনি। আমাদের ক্যাম্পের প্রধান একদিন আমাদের দু’জনকে নিয়ে বসলেন এবং কিছু কাজ বলে দিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলÑ নিয়মিত রেডিওতে খবর শোনা, তবে এ কাজ করতে হবে একদম আড়ালে গিয়ে, তারপর নিজেদের ক্যাম্পে সতর্কাবস্থায় থাকা, পাকসেনাদের ক্যাম্পে ছদ্মবেশে চোখ রাখা এবং তাদের চলাফেরার দিকে খেয়াল রাখা। আমরা আমাদের ওপর আরোপিত কাজ করে যেতে লাগলাম।
একদিন একা আমি পাক বাহিনীর একটা ক্যাম্পে দেখে আসার জন্য গেলাম (ছোট বলে ওরা আমাদের ওপর তেমন নজর দিত না।)
দেখা শেষ করে ফিরব এমন সময় এক পাক সেনার সামনে পড়ে যাই। আমাকে জিজ্ঞেস করে এখানে কী করি। আমি উত্তরে হাত দেখিয়ে বললাম, ‘দোকানে গিয়েছিলাম খরচ আনতে, কিন্তু দোকান বন্ধ পাই।’ সেদিনের মতো বেঁচে যাই।
এর কিছু দিন পর আবার পাক সেনাদের ক্যাম্পে যাই, দূর থেকে ওদের আলাপ পুরোপুরি শোনা যাচ্ছিল না। আমি আরেকটু কাছে গিয়ে আড়ি পাতলাম।
ওরা সবাই মিলে আলাপ করছিল কিভাবে বাঙালিদের শেষ করে দেবে, কিভাবে হত্যা করে, কোথায় কিভাবে অপারেশন চলছে ইত্যাদি। আলাপের একপর্যায় শুনতে পেলাম ওদের একজন বলছে, আগামীকাল তো সোনাপুর ক্যাম্পে আমাদের অপারেশন। সোনাপুর বলতে যে ক্যাম্পটায় আমি এবং আমাদের মুক্তিসেনারা অস্থায়ী বাস করছি। সোনাপুর অপারেশন করতে আসছে শুনে আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল, নিজেকে সামলে নিয়ে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে আসি। আমাদের ক্যাম্পপ্রধানের কাছে খবরটা পৌঁছে দেই। তিনি সবার সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেন, কিভাবে ওদের অপারেশন প্রতিহত করা যায়। সবার সিদ্ধান্তক্রমে আমরা খুব দ্রুত ক্যাম্প ত্যাগ করি।
ওদের অপারেশন প্রতিহত করতে আমাদের প্রস্তুতি চলতে লাগল। এ দিকে আমি ও আমার বন্ধু পাকসেনাদের ক্যাম্পে গিয়ে তাদের অবস্থা দেখে আসি।
রাত ৩টা। চার দিকে নিস্তব্ধতা। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। হঠাৎ করেই গুলির আওয়াজ এলো। বুঝতে আর বাকি নেই ওরা এসে গেছে আক্রমণ চালাতে। আমাদের অবস্থান থেকে দেখার চেষ্টা করছি। ওরা আক্রমণ করেই যাচ্ছে কিন্তু আমাদের থেকে কোনোরূপ পাল্টা আক্রমণ না পেয়ে মনে মনে বেশ খুশি হয় পাকসেনারা। ক্যাম্পের একদম কাছে এসে আক্রমণ চালাতে থাকে, তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আস্তে আস্তে ওদের গুলির আওয়াজ কমতে থাকে। আমরা তাদের অবস্থা বুঝার চেষ্টা করে এগিয়ে আসি। যখন আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না, ঠিক তখনি শুরু হয় আমাদের পক্ষ থেকে পাকসেনাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ। আকস্মিক আক্রমণে ওরা দিগি¦দিক ছুটোছুটি করতে থাকে। পেছন দিক থেকে আমাদের আক্রমণে ওরা একেবারে নাজেহাল হয়ে পড়ে। কিছু সময়ের মধ্যে পাকসেনাদের সবগুলোকে খতম করে দিতে সক্ষম হই। সেদিন ২০ থেকে ২৫ জন পাকসেনা আমাদের হাতে মারা যায়। সেদিনের কৌশলী যুদ্ধ আজো আমার মনে পড়ে, তখন গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।
শিশু সাংবাদিক 
বিডিনিউজ২৪.কম
মেজরটিলা, সিলেট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫